ঈদুল ফিতরের নামাজ ২ রাকাত, ৬টি অতিরিক্ত তাকবিরসহ পড়তে হয়। প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমার পর ৩টি এবং দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পর রুকুর আগে আরও ৩টি অতিরিক্ত তাকবির দিতে হয়। এই নামাজে আজান ও ইকামত নেই।
ঈদের নামাজ কী এবং কেন পড়তে হয়?
ঈদের নামাজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাজ ওয়াজিব অর্থাৎ, যে ব্যক্তির উপর জুমার নামাজ ফরয, তার উপর ঈদের নামাজও ওয়াজিব।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন মুসলমানদের একসাথে নামাজ পড়া উচিত।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
ঈদের নামাজ জামাতের সাথে পড়া সুন্নত। এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও আনন্দের প্রতীক।
ঈদের নামাজের সময়
ঈদুল ফিতরের নামাজের নির্দিষ্ট সময় আছে। সঠিক সময়ের বাইরে পড়লে নামাজ সহিহ হবে না।
শুরুর সময়: সূর্যোদয়ের প্রায় ১৫–২০ মিনিট পর (ইশরাকের সময়) শেষ সময়: দুপুর ১২টার আগে (যাওয়ালের আগ পর্যন্ত)
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ: ফজরের নামাজের পর থেকে সূর্য পুরোপুরি উঠে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এবং দুপুরের পর ঈদের নামাজ পড়া যাবে না।
ঈদের নামাজের শর্ত ও নিয়মাবলি
ঈদের নামাজ সহিহ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে:
- জামাত: একাকী ঈদের নামাজ পড়া যায় না; জামাতবদ্ধভাবে পড়তে হবে
- ইমাম: একজন ইমাম থাকতে হবে
- স্থান: ঈদগাহ বা মসজিদে পড়া যাবে
- আজান-ইকামত নেই: ঈদের নামাজে আজান ও ইকামত নেই
- খুতবা: নামাজের পরে ইমাম দুটি খুতবা দেবেন (এটি সুন্নত)
ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়ত
ঈদের নামাজের আগে মনে মনে নিয়ত করা ফরয। মুখে উচ্চারণ করা সুন্নত।
আরবিতে নিয়ত:
نَوَيْتُ أَنْ أُصَلِّيَ لِلَّهِ تَعَالَى رَكْعَتَيْ صَلَاةِ عِيدِ الْفِطْرِ مَعَ سِتَّةِ تَكْبِيرَاتٍ وَاجِبَةً مُقْتَدِيًا بِهَذَا الْإِمَامِ
বাংলা উচ্চারণ:
নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা রাকাআতাই সালাতি ঈদিল ফিত্রি মাআ সিত্তাতি তাকবিরাতিন ওয়াজিবাতান মুক্তাদিয়ান বিহাযাল ইমাম।
বাংলা অর্থ:
আমি এই ইমামের পিছনে ৬টি অতিরিক্ত তাকবিরসহ ঈদুল ফিতরের ২ রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করার নিয়ত করছি।
ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম
✅ প্রথম রাকাত:
ধাপ ১ — তাকবিরে তাহরিমা দুই হাত কাঁধ বা কান পর্যন্ত উঠিয়ে “আল্লাহু আকবার” বলুন এবং বুকে হাত বাঁধুন।
ধাপ ২ — সানা পড়ুন মনে মনে বা আস্তে পড়ুন:
“সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুক।”
ধাপ ৩ — ৩টি অতিরিক্ত তাকবির (তাকবিরে যাওয়াইদ) প্রতিটি তাকবিরে দুই হাত কাঁধ বা কান পর্যন্ত উঠান এবং হাত ছেড়ে দিন (হাত বাঁধবেন না)। প্রতি দুটি তাকবিরের মাঝে তিন তাসবিহ পরিমাণ বিরতি দিন।
- ১ম তাকবির → হাত ছাড়ুন
- ২য় তাকবির → হাত ছাড়ুন
- ৩য় তাকবির → এবার হাত বাঁধুন
ধাপ ৪ — কিরাত আঊযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা পড়ুন।
ধাপ ৫ — রুকু, সিজদা সাধারণ নামাজের মতোই রুকু, সিজদা এবং দ্বিতীয় সিজদা করুন।
✅ দ্বিতীয় রাকাত:
ধাপ ১ — কিরাত দ্বিতীয় রাকাতে প্রথমে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়ুন।
ধাপ ২ — ৩টি অতিরিক্ত তাকবির সূরা পড়া শেষ হলে রুকুর আগে আবার ৩টি অতিরিক্ত তাকবির দিন। প্রতিটির পর হাত ছেড়ে দিন।
- ১ম তাকবির → হাত ছাড়ুন
- ২য় তাকবির → হাত ছাড়ুন
- ৩য় তাকবির → হাত ছাড়ুন
ধাপ ৩ — রুকুর তাকবির ৩টি অতিরিক্ত তাকবিরের পর ৪র্থ তাকবির দিয়ে রুকুতে যান।
ধাপ ৪ — বাকি নামাজ সাধারণ নামাজের মতো রুকু, সিজদা, তাশাহহুদ, দরুদ, দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরান।
ঈদের তাকবির (তাকবিরে তাশরিক ও তাকবিরে যাওয়াইদ)
ঈদের নামাজে মোট দুই ধরনের তাকবির থাকে:
১. তাকবিরে তাহরিমা (প্রারম্ভিক তাকবির):
নামাজ শুরুর তাকবির — এটি ফরয।
২. তাকবিরে যাওয়াইদ (অতিরিক্ত ৬টি তাকবির):
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজে ৬টি অতিরিক্ত তাকবির দেওয়া ওয়াজিব।
তাকবিরের উচ্চারণ:
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
(এই তাকবির ঈদগাহে যাওয়ার সময় থেকে পড়তে থাকুন)
ঈদের নামাজে কোন সূরা পড়া সুন্নত?
রাসুলুল্লাহ ﷺ ঈদের নামাজে নিম্নোক্ত সূরাগুলো পড়তেন:
| রাকাত | সূরা |
|---|---|
| প্রথম রাকাত | সূরা আলা (সূরা নম্বর ৮৭) |
| দ্বিতীয় রাকাত | সূরা গাশিয়া (সূরা নম্বর ৮৮) |
অথবা:
| রাকাত | সূরা |
|---|---|
| প্রথম রাকাত | সূরা কাফ (সূরা নম্বর ৫০) |
| দ্বিতীয় রাকাত | সূরা কামার (সূরা নম্বর ৫৪) |
(সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ৮৭৮)
ঈদের নামাজের আগে কী করবেন?
ঈদুল ফিতরের দিন নামাজের আগে কিছু সুন্নত আমল করা উচিত:
- গোসল করুন — ঈদের দিন গোসল করা সুন্নত
- মিষ্টি কিছু খান — নামাজের আগে বিজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া সুন্নত (যেমন: ৩, ৫ বা ৭টি)
- নতুন বা পরিষ্কার পোশাক পরুন — সুন্দর পোশাক পরা সুন্নত
- সুগন্ধি ব্যবহার করুন
- ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করুন
- তাকবির পড়তে পড়তে ঈদগাহে যান
- এক পথে যান, ভিন্ন পথে ফিরুন — এটি সুন্নত
ঈদের নামাজের পরে কী করবেন?
- ইমামের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনুন
- মুসল্লিদের সাথে কোলাকুলি করুন এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানান
- পরিচিত ও আত্মীয়দের সাথে দেখা করুন
ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর দোয়া:
تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (আমল) কবুল করুন।
মেয়েদের ঈদের নামাজের নিয়ম
মেয়েদের জন্যও ঈদের নামাজ একইভাবে প্রযোজ্য। তবে কিছু বিষয় লক্ষণীয়:
- নামাজের নিয়ম সম্পূর্ণ একই
- পর্দার সাথে ঈদগাহে যাওয়া যায়
- ঘরে একাকী ঈদের নামাজ পড়া যাবে না (জামাত শর্ত)
- মাসিক চলাকালে ঈদের নামাজ পড়া যাবে না, তবে ঈদগাহে যেতে পারেন
ঈদের নামাজ কাযা হলে কী করবেন?
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, ঈদের নামাজের কাযা নেই। যদি জামাত ছুটে যায়, তাহলে অন্য কোনো মসজিদ বা ঈদগাহে জামাত চলমান থাকলে সেখানে যোগ দিতে পারেন।
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাজের পার্থক্য
| বিষয় | ঈদুল ফিতর | ঈদুল আযহা |
|---|---|---|
| তারিখ | ১ শাওয়াল | ১০ যিলহজ্জ |
| নামাজের আগে খাওয়া | খেজুর বা মিষ্টি খাওয়া সুন্নত | না খেয়ে থাকা এবং কোরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত |
| তাকবিরে তাশরিক | ঐচ্ছিক | ৯ যিলহজ্জ ফজর থেকে ১৩ যিলহজ্জ আসর পর্যন্ত ওয়াজিব |
| নামাজের নিয়ম | একই | একই |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: ঈদের নামাজ কি ফরয না ওয়াজিব?
উত্তর: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজ ওয়াজিব। শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব অনুযায়ী এটি সুন্নতে মুআক্কাদা বা ফরযে কিফায়া। বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন, তাই এখানে এটি ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হয়।
প্রশ্ন ২: ঈদের নামাজে কতটি তাকবির দিতে হয়?
উত্তর: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া আরও ৬টি অতিরিক্ত তাকবির (তাকবিরে যাওয়াইদ) দিতে হয় — প্রথম রাকাতে ৩টি ও দ্বিতীয় রাকাতে ৩টি।
প্রশ্ন ৩: ঈদের নামাজে কি আজান দিতে হয়?
উত্তর: না। ঈদের নামাজে কোনো আজান বা ইকামত নেই। শুধু “আস-সালাতু জামিআন” বলে মুসল্লিদের ডাকা হয়।
প্রশ্ন ৪: ঈদের নামাজের পর খুতবা কি শোনা ফরয?
উত্তর: ঈদের নামাজের পরে খুতবা শোনা সুন্নত এবং এটি ওয়াজিব নয়। তবে মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত।
প্রশ্ন ৫: বাড়িতে কি একাকী ঈদের নামাজ পড়া যায়?
উত্তর: না। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজ জামাতবদ্ধভাবে পড়তে হয়। একাকী পড়লে তা সহিহ হবে না।
প্রশ্ন ৬: ঈদের নামাজের জন্য সদকাতুল ফিতর কখন দিতে হয়?
উত্তর: নামাজের আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম। তবে ঈদের আগের রাতেও দেওয়া যায়।
প্রশ্ন ৭: ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়ত মুখে পড়তে হবে কি?
উত্তর: মনে মনে নিয়ত করাই যথেষ্ট। মুখে উচ্চারণ করা সুন্নত, কিন্তু ফরয নয়।
প্রশ্ন ৮: ঈদের নামাজে ইমাম ভুল তাকবির দিলে কী করব?
উত্তর: ইমামের অনুসরণ করুন। যদি ইমাম ভুল করেন এবং মাসবুক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সাহু সিজদা দেওয়া যাবে।
প্রশ্ন ৯: ঈদের দিন কি রোজা রাখা যাবে?
উত্তর: না। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন রোজা রাখা হারাম।
প্রশ্ন ১০: ঈদের তাকবির কখন থেকে পড়তে হয়?
উত্তর: ঈদুল ফিতরের ক্ষেত্রে ঈদের রাত থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবির পড়া মুস্তাহাব। তাকবির হলো: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।”
ঈদের নামাজ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমরা ঈদের দিন একে অপরকে ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ বলো।” — (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি)
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত: “রাসুলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতরে মিষ্টি খেয়ে বের হতেন।” — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫৩)
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
এই আর্টিকেলটি ইসলামিক ফিকহ ও হাদিস বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে লেখা হয়েছে। তথ্যগুলো হানাফি মাযহাবের বিশিষ্ট ফিকহ গ্রন্থ যেমন রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), হিদায়া, ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি এবং সহিহ বুখারি ও মুসলিম থেকে যাচাই করা হয়েছে।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।