এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতার হিসাব

আপনি কি একজন এমপিওভুক্ত (MPO) শিক্ষক বা কর্মচারী? অবসরে যাওয়ার পর ঠিক কত টাকা পাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন? এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য অবসর ও কল্যাণ ভাতা হলো জীবনের শেষ সম্বল। কিন্তু জটিল হিসাবের কারণে অনেকেই বুঝতে পারেন না তাদের প্রাপ্য টাকার পরিমাণ কত।

এই আর্টিকেলে আমরা খুব সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায়, উদাহরণসহ দেখাবো কীভাবে আপনার কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা এবং অবসর সুবিধা বোর্ডের টাকা নিখুঁতভাবে হিসাব করবেন।

একনজরে: অবসর ও কল্যাণ ভাতার মূল সূত্র

সহজ কথায়, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের মোট পাওনা দুটি অংশ নিয়ে গঠিত: ১. কল্যাণ ভাতা এবং ২. অবসর ভাতা

দ্রুত হিসাব করার জন্য নিচের সূত্র দুটি মনে রাখুন:

  • কল্যাণ ভাতা (Welfare Benefit): সর্বশেষ মূল বেতন (Basic Pay) × মোট চাকরির বছর।
  • অবসর ভাতা (Retirement Benefit): সর্বশেষ মূল বেতন (Basic Pay) × নির্ধারিত চার্ট অনুযায়ী প্রাপ্ত মাস (যা চাকরির মেয়াদের ওপর নির্ভর করে)।

নোট: এই সুবিধা পেতে হলে একজন শিক্ষক বা কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত অবস্থায় ন্যূনতম ১০ বছর চাকরি করতে হবে।

কল্যাণ ভাতা বের করার নিয়ম

কল্যাণ ভাতার হিসাবটি বেশ সোজা। আপনি যতদিন চাকরি করেছেন (এমপিওভুক্ত কাল), সেই সংখ্যা দিয়ে আপনার সর্বশেষ মূল বেতনকে গুণ করতে হবে।

সূত্র:

$$\text{অবসর ভাতা} = \text{সর্বশেষ মূল বেতন} \times \text{চার্ট অনুযায়ী প্রাপ্ত মাস}$$

বাস্তব উদাহরণ ১ (দীর্ঘমেয়াদী চাকরি):

ধরি, জনাব রফিক একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক। অবসরে যাওয়ার সময় তার তথ্যাদি নিম্নরূপ:

  • সর্বশেষ মূল বেতন: ২৩,৬৪০ টাকা (১০ম গ্রেড)
  • মোট চাকরির মেয়াদ: ২৯ বছর

হিসাব:

তিনি কল্যাণ ভাতা পাবেন = ২৩,৬৪০ × ২৯ = ৬,৮৫,৫৬০ টাকা

বাস্তব উদাহরণ ২ (মধ্যমেয়াদী চাকরি):

ধরি, জনাবা সুমি ২০ বছর চাকরি করার পর অবসরে যাচ্ছেন।

  • সর্বশেষ মূল বেতন: ২৩,৬৪০ টাকা
  • মোট চাকরির মেয়াদ: ২০ বছর

হিসাব:

তিনি কল্যাণ ভাতা পাবেন = ২৩,৬৪০ × ২০ = ৪,৭২,৮০০ টাকা

অবসর ভাতা বের করার নিয়ম ও চার্ট

অবসর ভাতার হিসাবটি একটু ভিন্ন। এটি সরাসরি চাকরির বছরের সাথে গুণ হয় না, বরং সরকার নির্ধারিত একটি চার্ট বা ছক অনুযায়ী গুণ করতে হয়। আপনার চাকরির বয়সের ওপর ভিত্তি করে আপনি কত মাসের মূল বেতরের সমপরিমাণ টাকা পাবেন, তা নির্ধারিত থাকে।

সূত্র:

$$\text{অবসর ভাতা} = \text{সর্বশেষ মূল বেতন} \times \text{চার্ট অনুযায়ী প্রাপ্ত মাস}$$

বাস্তব উদাহরণ ১:

জনাব রফিক ২৯ বছর চাকরি করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরি করলে ৭৫ মাসের মূল বেতন পাওয়া যায়।

  • হিসাব: ২৩,৬৪০ × ৭৫ = ১৭,৭৩,০০০ টাকা

বাস্তব উদাহরণ ২:

জনাবা সুমি ২০ বছর চাকরি করেছেন। চার্ট অনুযায়ী ২০ বছর চাকরির জন্য ৪৭ মাসের মূল বেতন পাওয়া যায়।

  • হিসাব: ২৩,৬৪০ × ৪৭ = ১১,১১,০৮০ টাকা

চাকরির মেয়াদ ও প্রাপ্য মাসের চার্ট

আপনার সুবিধার জন্য সম্পূর্ণ চার্টটি নিচে দেওয়া হলো। এটি দেখে আপনি নিজেই নিজের প্রাপ্য মাস বের করতে পারবেন।

চাকরির মেয়াদ (বছর)প্রাপ্ত আর্থিক সুবিধা (কত মাসের বেতন)
১০ বছর বা তদূর্ধ্ব ১১ বছরের কম১০ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১১ বছর বা তদূর্ধ্ব ১২ বছরের কম১৩ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১২ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৩ বছরের কম১৬ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১৩ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৪ বছরের কম১৯ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১৪ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৫ বছরের কম২২ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৬ বছরের কম২৫ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১৬ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৭ বছরের কম২৯ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১৭ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৮ বছরের কম৩৩ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৯ বছরের কম৩৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
১৯ বছর বা তদূর্ধ্ব ২০ বছরের কম৪২ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
২০ বছর বা তদূর্ধ্ব ২১ বছরের কম৪৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
২১ বছর বা তদূর্ধ্ব ২২ বছরের কম৫২ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
২২ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৩ বছরের কম৫৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
২৩ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৪ বছরের কম৬৩ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
২৪ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৫ বছরের কম৬৯ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ
২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব (সর্বোচ্চ)৭৫ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: ১০ বছরের কম চাকরি করলে কি কোনো ভাতা পাওয়া যাবে?

উত্তর: না। এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধা পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো ন্যূনতম ১০ বছর এমপিওভুক্ত পদে নিরবচ্ছিন্নভাবে চাকরি করা।

প্রশ্ন: চাঁদা বাবদ কত টাকা কর্তন করা হয়?

উত্তর: বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন থেকে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য যথাক্রমে ৬% ও ৪% মোট ১০% হারে চাঁদা কর্তন করা হয়। (তবে এটি সরকারি আদেশের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তন হতে পারে)।

প্রশ্ন: আবেদনের কতদিন পর টাকা পাওয়া যায়?

উত্তর: বর্তমানে আবেদনের পর টাকা পেতে বেশ সময় লাগে। ফান্ড সংকট ও সিরিয়াল জটের কারণে সাধারণত ৩ থেকে ৪ বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। তবে অনলাইন আবেদনের মাধ্যমে এখন নিজের আবেদনের অবস্থা (Status) ট্র্যাক করা যায়।

প্রশ্ন: মৃত্যুবরণ করলে কি টাকা পাওয়া যাবে?

উত্তর: জি, চাকরি অবস্থায় বা অবসরের পর আবেদন করার আগে কোনো শিক্ষক মৃত্যুবরণ করলে, তার নমিনি বা বৈধ ওয়ারিশগণ একই নিয়ম অনুযায়ী সমুদয় টাকা পাবেন।

শেষ কথা

অবসরে যাওয়ার পর যেন হয়রানির শিকার না হতে হয়, সেজন্য চাকরিরত অবস্থাতেই আপনার সার্ভিস বুক (Service Book), নিয়োগপত্র, যোগদানের কপি এবং এমপিও শিটগুলো যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করুন। অনলাইনে আবেদন করার সময় সঠিক তথ্য ও মোবাইল নম্বর দিন, যাতে স্ট্যাটাস আপডেট পেতে পারেন।

আপনার যদি কোনো নির্দিষ্ট গ্রেড বা চাকরির বয়স নিয়ে হিসাব বুঝতে সমস্যা হয়, তবে নিচে কমেন্ট করুন। আমাদের এক্সপার্ট টিম আপনাকে সাহায্য করবে।

তথ্যসূত্র: বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্টের নির্দেশিকা।

Leave a Comment