ট্রেড লাইসেন্স করতে কি কি কাগজ লাগে

ট্রেড লাইসেন্স করতে সাধারণত যেসব কাগজ লাগে: নির্ধারিত আবেদন ফরম (‘কে’ ফরম), মালিকের ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, দোকান বা অফিসের ভাড়ার চুক্তিপত্র (ভাড়াটিয়া হলে) অথবা মালিকের ইউটিলিটি বিল ও হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ, ব্যাংকে ফি জমার রশিদ। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজও লাগতে পারে।

ট্রেড লাইসেন্স কী এবং কেন দরকার?

ট্রেড লাইসেন্স হলো বাংলাদেশে যেকোনো ব্যবসা পরিচালনার জন্য সরকার প্রদত্ত আইনি অনুমতিপত্র। এটি ছাড়া দেশে ব্যবসা করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

সিটি কর্পোরেশন [কর] বিধি ২০০৯-এর আওতায় এই লাইসেন্সের প্রচলন শুরু হয়। স্থানীয় সরকার অর্থাৎ সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ এই লাইসেন্স ইস্যু করে থাকে।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা: ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক

টেন্ডার ও সরকারি কাজ: সরকারি টেন্ডার ও নিবন্ধনে ট্রেড লাইসেন্স আবশ্যক

আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্স: IRC/ERC পেতে ট্রেড লাইসেন্স প্রয়োজন হয়

আইনি সুরক্ষা: লাইসেন্স না থাকলে প্রথমবার ৫,০০০ টাকা জরিমানা

সতর্কতা: ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করলে প্রথমবার ৫,০০০ টাকা এবং এরপর প্রতিদিন ৫০০ টাকা জরিমানা হতে পারে।

ট্রেড লাইসেন্স করতে সাধারণত যে কাগজগুলো লাগে

ব্যবসার ধরন যাই হোক, নিচের মূল কাগজপত্রগুলো প্রায় সবক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয়:

  • নির্ধারিত আবেদন ফরম (‘কে’ ফরম) — সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার আঞ্চলিক অফিস থেকে অথবা অনলাইনে বিনামূল্যে সংগ্রহ করা যায়
  • মালিকের ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি — সদ্য তোলা, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড হলে ভালো
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধনপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি — আবেদনকারীকে অবশ্যই ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী হতে হবে
  • দোকান বা অফিসের ভাড়ার চুক্তিপত্রের সত্যায়িত কপি — ভাড়া থাকলে; মালিক হলে হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের রশিদ ও ইউটিলিটি বিল
  • ব্যাংকে ট্রেড লাইসেন্স ফি জমার রশিদ (চালান) — নির্ধারিত ব্যাংকে ভ্যাটসহ ফি জমা দেওয়ার পর রশিদটি আবেদনের সাথে জমা দিতে হয়
  • হোল্ডিং নম্বর বা ঠিকানার প্রমাণ — ব্যবসার নির্দিষ্ট স্থান ও ঠিকানা থাকা বাধ্যতামূলক
  • নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপার (১৫০–৩০০ টাকার) — অনাপত্তিপত্র বা অঙ্গীকারপত্রের জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে

গুরুত্বপূর্ণ টিপস

সব কাগজপত্র প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর দ্বারা সত্যায়িত করাতে হবে। সত্যায়ন ছাড়া আবেদন গ্রহণ নাও হতে পারে।

ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

ব্যবসার ক্যাটাগরি ভেদে কিছু অতিরিক্ত কাগজ দরকার হয়। নিচে ট্যাব থেকে আপনার ব্যবসার ধরন বেছে নিন: একক মালিকানাঅংশীদারিলিমিটেড কোম্পানিবিশেষ ব্যবসা

একক মালিকানা ব্যবসার জন্য কাগজপত্র (Sole Proprietorship)

  • নির্ধারিত ‘কে’ ফরমে পূরণ করা আবেদনপত্র
  • মালিকের ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি
  • জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত ফটোকপি
  • দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্র ও ভাড়ার রশিদ (ভাড়া হলে)
  • মালিক হলে: হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের রশিদ ও ইউটিলিটি বিল
  • ব্যাংকে ফি জমার চালান রশিদ (ভ্যাটসহ)

অংশীদারি ব্যবসার জন্য কাগজপত্র (Partnership)

  • একক মালিকানার সব কাগজ
  • পার্টনারশিপ ডিড (অংশীদারি চুক্তিপত্র) — নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারাইজড
  • সকল অংশীদারের NID কপি ও ছবি
  • ফার্ম রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)

লিমিটেড কোম্পানির জন্য কাগজপত্র (Limited Company)

  • একক মালিকানার মূল কাগজসমূহ
  • মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস (MOA) এর সত্যায়িত কপি
  • সার্টিফিকেট অব ইনকর্পোরেশন এর কপি (RJSC থেকে প্রাপ্ত)
  • পরিচালকমণ্ডলীর তালিকা ও NID কপি
  • ১৫০ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারপত্র

বিশেষ ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত কাগজ

  • ক্লিনিক/হাসপাতাল: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমোদনপত্র
  • ছাপাখানা ও আবাসিক হোটেল: জেলা প্রশাসকের অনুমতিপত্র
  • রিক্রুটিং এজেন্সি: মানবসম্পদ রপ্তানি ব্যুরোর লাইসেন্স
  • ট্রাভেল এজেন্সি: সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের অনুমতি
  • ওষুধ ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসা: ড্রাগ লাইসেন্সের কপি
  • অস্ত্র ও গোলাবারুদ: অস্ত্রের লাইসেন্স
  • সিএনজি স্টেশন/দাহ্য পদার্থ: বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি
  • কারখানা/ফ্যাক্টরি: পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন

ট্রেড লাইসেন্স করার ধাপ-বাই-ধাপ পদ্ধতি

নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া অনেক সহজ হবে:

স্থানীয় সরকার নির্ধারণ করুন

আপনার ব্যবসা কোথায় হবে সেটি ঠিক করুন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা নাকি ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে। ঢাকায় হলে উত্তর বা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্দিষ্ট আঞ্চলিক অফিসে যেতে হবে।

আবেদন ফরম সংগ্রহ করুন

সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে ‘কে’ ফরম সংগ্রহ করুন। অনলাইনেও ডাউনলোড করে প্রিন্ট করা যায়। ফরমের মূল্য মাত্র ১০ টাকা।

কাগজপত্র প্রস্তুত ও সত্যায়ন করুন

সব প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর দ্বারা সত্যায়িত করুন।

নির্ধারিত ব্যাংকে ফি জমা দিন

ফরমে উল্লিখিত ব্যাংকে (সাধারণত সোনালী ব্যাংক) ট্রেড লাইসেন্স ফি, সাইনবোর্ড ফি এবং ১৫% ভ্যাট জমা দিয়ে চালান রশিদ সংগ্রহ করুন।

অফিসে আবেদন জমা দিন

সব কাগজপত্র ও চালান রশিদসহ আবেদন ফরম আঞ্চলিক অফিসে জমা দিন।

পরিদর্শন ও লাইসেন্স গ্রহণ

লাইসেন্স সুপারভাইজার সরেজমিনে ব্যবসাস্থল পরিদর্শন করবেন। সব ঠিক থাকলে ৫–৭ কর্মদিবসের মধ্যে ট্রেড লাইসেন্স পাবেন।

ট্রেড লাইসেন্স ফি ও খরচ

ব্যবসার ধরন ও এলাকা ভেদে ফি আলাদা। নিচে সাধারণ একটি ধারণা দেওয়া হলো:

খরচের ধরনপৌরসভা/ইউপিসিটি কর্পোরেশন
আবেদন ফরম১০ টাকা১০ টাকা
লাইসেন্স বই৫০ টাকা৫০ টাকা
নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপার১৫০–৩০০ টাকা১৫০–৩০০ টাকা
ট্রেড লাইসেন্স ফি (ব্যবসার ধরন অনুযায়ী)২০০ – ২৬,০০০ টাকা১,০০০ – ৬০,০০০ টাকা
সাইনবোর্ড ফি (আকার অনুযায়ী)প্রযোজ্যপ্রযোজ্য
ভ্যাট (মোট ফি-র উপর ১৫%)প্রযোজ্যপ্রযোজ্য
নবায়নের সময় উৎসকরকম৩,০০০ টাকা

মনে রাখুন

সিটি কর্পোরেশন আদর্শ কর তফসিল ২০১৬ অনুযায়ী ফি নির্ধারিত হয়। মোট ২৯৪টি ক্যাটাগরিতে ফি আলাদা। সঠিক ফি জানতে সংশ্লিষ্ট অফিস বা লাইসেন্স বই দেখুন।

অনলাইনে ই-ট্রেড লাইসেন্স করার নিয়ম

বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ অনেক পৌরসভায় ই-ট্রেড লাইসেন্স পদ্ধতি চালু আছে। এতে সময় ও ঝামেলা অনেক কমে যায়।

ওয়েবসাইটে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলুন

ঢাকা উত্তর সিটির জন্য: erevenue.dncc.gov.bd | ঢাকা দক্ষিণের জন্য: erevenue.dscc.gov.bd

ডিজিটাল কাগজপত্র আপলোড করুন

মালিকের ছবি (JPG), NID কপি, ভাড়ার চুক্তিপত্র স্ক্যান করে আপলোড করুন।

অনলাইনে ফি পরিশোধ করুন

ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি দেওয়া যায়।

অনুমোদনের পর ডাউনলোড করুন

অনুমোদন হলে প্রোফাইল থেকে ট্রেড লাইসেন্স ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিন।

অনলাইন পদ্ধতির সুবিধা

সময় কম লাগে, অফিসে বারবার যেতে হয় না, লাইসেন্সের তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকে এবং নবায়নও অনলাইনেই করা সম্ভব।

ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করার নিয়ম

ট্রেড লাইসেন্স প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে জরিমানা দিতে হতে পারে।

নবায়নের জন্য যা লাগবে:

  • পুরনো ট্রেড লাইসেন্সের মূল কপি
  • নবায়ন ফি জমার চালান রশিদ (ব্যাংকে জমা করতে হবে)
  • হালনাগাদ ছবি ও NID কপি (প্রয়োজনে)

নবায়ন ফি নতুন লাইসেন্সের সমান। সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে নবায়নে ৩,০০০ টাকা উৎসকর অতিরিক্ত দিতে হয়। সোনালী ব্যাংকে ফি জমা দেওয়ার পর ১ কর্মদিবসের মধ্যে নবায়ন হয়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

ট্রেড লাইসেন্স পেতে কত দিন লাগে?

সাধারণত আবেদন জমা দেওয়ার ৫ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া যায়।

ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ কত বছর?

প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ ১ বছর। প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়।

এক লাইসেন্সে কি একাধিক ব্যবসা করা যায়?

না। একটি ট্রেড লাইসেন্স শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি ব্যবসার জন্য প্রযোজ্য। নতুন ব্যবসায় নতুন লাইসেন্স লাগবে।

ট্রেড লাইসেন্স কি অন্য ব্যক্তিকে দেওয়া যায়?

না, ট্রেড লাইসেন্স হস্তান্তরযোগ্য নয়। এটি শুধু লাইসেন্সধারী ব্যক্তির নামেই থাকে।

ট্রেড লাইসেন্স না থাকলে কী হয়?

প্রথমবার ৫,০০০ টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতিদিন ৫০০ টাকা জরিমানা হতে পারে। ব্যবসাও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স করা যায়?

হ্যাঁ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ অনেক এলাকায় ই-ট্রেড লাইসেন্স পদ্ধতি চালু আছে।

ট্রেড লাইসেন্স করতে TIN সার্টিফিকেট কি লাগে?

সাধারণত সাধারণ ব্যবসার ক্ষেত্রে TIN বাধ্যতামূলক নয়। তবে বড় ব্যবসা বা কোম্পানির ক্ষেত্রে TIN থাকলে ভালো। ব্যাংক লোন বা সরকারি কাজে অবশ্যই TIN লাগে।

ঘর থেকে ব্যবসা করলেও কি ট্রেড লাইসেন্স লাগে?

হ্যাঁ, ঘর থেকে পরিচালিত যেকোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্যও ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া উচিত। ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে ফি কম হয়।

ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ঠিকানা পরিবর্তন করলে কী করতে হবে?

ঠিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন ঠিকানার স্থানীয় সরকার অফিসে নতুন ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। পুরনো লাইসেন্স নতুন ঠিকানায় কার্যকর হবে না।

লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও কি ব্যবসা চালু রাখা যাবে?

আইনত না। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে ব্যবসা করলে জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে। তাই প্রতি বছর সময়মতো নবায়ন করুন।

অনলাইন ব্যবসার জন্যও কি ট্রেড লাইসেন্স দরকার?

হ্যাঁ। ফেসবুক শপ, ই-কমার্স বা যেকোনো অনলাইন ব্যবসার জন্যও ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া উচিত। বিশেষ করে পেমেন্ট গেটওয়ে ও ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য এটি বাধ্যতামূলক।

Leave a Comment