দাখিল পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা ২০২৬

দাখিল পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা ২০২৬ হলো বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক জারি করা অফিসিয়াল নির্দেশিকা । এই নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষা পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে, পূর্ণ সময়ে এবং পূর্ণ নম্বরে অনুষ্ঠিত হবে । পরীক্ষার্থীদের বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর হতে হবে এবং পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট পূর্বে নিজ আসনে বসতে হবে । পরীক্ষার হলে কোনো ধরনের মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা প্রোগ্রামিংযোগ্য ক্যালকুলেটর আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড প্রতি বছরের মতো এবারও দাখিল পরীক্ষার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য “দাখিল পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা-২০২৬” প্রকাশ করেছে । আপনি যদি একজন পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, কক্ষপ্রত্যবেক্ষক বা কেন্দ্র সচিব হয়ে থাকেন, তবে এই নীতিমালার খুঁটিনাটি জানা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক।

এই আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় এবং ধাপে ধাপে দাখিল পরীক্ষা ২০২৬-এর নতুন নিয়মাবলি, হলে প্রবেশের নিয়ম, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরেছি।

পরীক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার আবেদন ও বয়সের নিয়মাবলি

দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে বোর্ড কর্তৃক কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে:

  • বয়সসীমা: পরীক্ষা বছরের ১ জানুয়ারি তারিখে পরীক্ষার্থীর বয়স ন্যূনতম ১৪ বছর হতে হবে । নিয়মিত পরীক্ষার্থীর বেলায় সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২০ বছর ।
  • রেজিস্ট্রেশন: বোর্ডের রেজিস্ট্রেশনধারী শিক্ষার্থীরাই কেবল অনলাইনে পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারবে । রেজিস্ট্রেশন বিহীন কোনো শিক্ষার্থীর আবেদন ফরম বোর্ড গ্রহণ করবে না ।

পরীক্ষা শুরুর সময় এবং পরীক্ষার্থীর প্রবেশ

পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ:

  • কেন্দ্র খোলা: পরীক্ষার প্রথম দিন পরীক্ষা আরম্ভ হবার এক ঘণ্টা পূর্বে এবং পরবর্তী দিনগুলোতে ৪৫ মিনিট পূর্বে পরীক্ষা ভবনের দরজা খুলে দেওয়া হবে ।
  • আসন গ্রহণ: প্রত্যেক দিন পরীক্ষা আরম্ভ হবার ৩০ মিনিট পূর্বে পরীক্ষার্থীদের নিজ নিজ আসন গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে ।
  • দেরিতে প্রবেশ: পরীক্ষা আরম্ভ হবার ১৫ মিনিট পরে কোনো পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশের অনুমতি বা প্রশ্নপত্র দেয়া যাবে না । তবে বিশেষ ও যৌক্তিক কারণে কেন্দ্রসচিব এই সময়সীমা আধা ঘণ্টা পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারবেন ।

পরীক্ষার হলে যা নেওয়া যাবে এবং মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা

  • প্রয়োজনীয় সামগ্রী: প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশপত্র, রেজিস্ট্রেশন কার্ড, কলম, কাঠ পেন্সিল এবং ইরেজার (Eraser) অবশ্যই সাথে আনতে হবে ।
  • ক্যালকুলেটর ব্যবহার: গণিত বা অনুরূপ বিষয়ের জন্য পরীক্ষার্থীরা সাধারণ সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর (Non Programmable) ব্যবহার করতে পারবে ।
  • নিষেধাজ্ঞা: প্রোগ্রামিং আছে এমন কোনো ক্যালকুলেটর, কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা মোবাইল ফোন কোনোভাবেই পরীক্ষা কেন্দ্রে আনা যাবে না ।

প্রশ্নপত্র গ্রহণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা (কেন্দ্রের জন্য)

প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষায় কেন্দ্র কমিটিকে কঠোর নিয়ম মানতে হয়:

  • কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সীলগালাকৃত প্রশ্নপত্রের ট্রাংক নিরাপদ হেফাজতে ট্রেজারিতে রাখবেন ।
  • প্রশ্নপত্র বাছাই করার পর ‘মেঘনা’ সেটের প্রশ্ন অবশ্যই মেঘনা সেটের ট্রাংকে এবং ‘যমুনা’ সেটের প্রশ্ন অবশ্যই যমুনা সেটের ট্রাংকে রাখতে হবে । কোনোভাবেই এক সেটের প্রশ্ন অন্য সেটের ট্রাংকে রাখা যাবে না ।
  • প্রতিদিন পরীক্ষা আরম্ভ হবার আধা ঘণ্টা পূর্বে ঐ দিনের প্রশ্নপত্র কেন্দ্রসচিব গ্রহণ করবেন । শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রেরিত সেটকোড অনুসরণ করে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলতে হবে ।

কেন্দ্র সচিব এবং কক্ষপ্রত্যবেক্ষকের প্রধান দায়িত্ব

  • আসন বিন্যাস: প্রতি ৫/৬ ফুট লম্বা বেঞ্চে ২ জন এবং ৪ ফুট লম্বা বেঞ্চে ১ জনের আসন ব্যবস্থা করতে হবে । একই মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পরস্পরের সন্নিকটে বসানো যাবে না ।
  • দেহ তল্লাশি: নকলমুক্ত পরীক্ষা গ্রহণের জন্য পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রধান ফটকে পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি করে কেন্দ্রে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে । ছাত্রীদের ক্ষেত্রে মহিলা শিক্ষিকা দ্বারা দেহ তল্লাশি করতে হবে ।
  • কক্ষপ্রত্যবেক্ষকের কাজ: পরীক্ষা আরম্ভ হবার ১৫ মিনিট পূর্বে কক্ষপ্রত্যবেক্ষক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল ও নৈর্ব্যক্তিক (MCQ) উত্তরপত্র বিতরণ করবেন এবং বৃত্তভরাটের নিয়মাবলি ভালোভাবে বুঝিয়ে দেবেন ।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা

  • দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী: যাদের হাত নেই বা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, তারা অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শ্রুতিলেখক (স্ক্রাইব) সাথে নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে । তাদের জন্য বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় দেওয়া যাবে ।
  • অটিস্টিক বা ডাউন সিনড্রোম: বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (অটিস্টিক, ডাউন সিনড্রোম বা সেরিব্রাল পালসি) পরীক্ষার্থীদের মোট সময়ের ১০% (৩ ঘণ্টার পরীক্ষায় ৩০ মিনিট) অতিরিক্ত সময় প্রদান করা হবে । তারা শিক্ষক, অভিভাবক বা সাহায্যকারীর সহায়তায় পরীক্ষা দিতে পারবে ।

পরীক্ষার্থীদের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (Disciplinary Actions)

পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে:

  • ঐ বছরের পরীক্ষা বাতিল (‘ক’ শাস্তি): পরীক্ষা কক্ষে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলা, নকল করা, অথবা ডেস্কে বা শরীরে কোনো উত্তর লিখে আনলে ঐ বছরের পরীক্ষা বাতিল করা হবে ।
  • ঐ বছরের পরীক্ষা বাতিল এবং ১ বছরের জন্য নিষিদ্ধ (‘খ’ শাস্তি): মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস সাথে রাখলে এবং তাতে উত্তরের সংগতিপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলে, অথবা উত্তরপত্র বাইরে পাচার করলে এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে ।
  • ঐ বছরের পরীক্ষা বাতিল এবং ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ (‘গ’ শাস্তি): রোল নম্বর পরিবর্তন করলে, মূল উত্তরপত্রের পাতা পরিবর্তন করলে, অথবা শিক্ষক/কর্মকর্তাকে আক্রমণ বা ভীতি প্রদর্শন করলে এই সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে ।

ফলাফল ও উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণ (Board Challenge)

  • ফলাফল লেটার গ্রেডিং (GPA) পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হবে এবং কোনো মেধা তালিকা বা স্টার মার্ক থাকবে না ।
  • পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরের দিন থেকে ৭ (সাত) দিনের মধ্যে উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের জন্য নির্ধারিত ফিসহ অনলাইনে SMS এর মাধ্যমে আবেদন করা যাবে । পুনঃনিরীক্ষণে মূলত যোগফল এবং বৃত্ত ভরাট যাচাই করা হয়, পরীক্ষকের দেওয়া নম্বর পরিবর্তন করা হয় না ।

সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি

প্রশ্ন ১: ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষা কি শর্ট সিলেবাসে হবে? উত্তর: না, দাখিল পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা অনুযায়ী ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষা পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে, পূর্ণ সময়ে ও পূর্ণ নম্বরে অনুষ্ঠিত হবে

প্রশ্ন ২: দাখিল পরীক্ষায় হলে ঢোকার শেষ সময় কখন? উত্তর: পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট পূর্বে নিজ আসনে বসতে হবে । পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১৫ মিনিট পর সাধারণত কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না, তবে বিশেষ কারণে কেন্দ্রসচিব সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট পর্যন্ত সময় দিতে পারেন

প্রশ্ন ৩: দাখিল পরীক্ষার হলে কি ঘড়ি বা ক্যালকুলেটর নেওয়া যাবে? উত্তর: হ্যাঁ, পরীক্ষার্থীরা সাধারণ ঘড়ি এবং সাধারণ সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর (Non Programmable) ব্যবহার করতে পারবে । তবে স্মার্টওয়াচ, মোবাইল বা প্রোগ্রামিং করা যায় এমন ডিভাইস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

প্রশ্ন ৪: ভুল বৃত্ত ভরাট করলে বা ফ্লুইড ব্যবহার করলে কী হবে? উত্তর: বৃত্ত ভরাটে ভুল হলে তা ইরেজার দ্বারা ঘষামাজা না করে বা ব্লেড দ্বারা না মুছে বা সাদা ফ্লুইড না লাগিয়ে সঠিক বৃত্তটি ভরাট করতে হবে । একাধিক বৃত্ত ভরাট করা থাকলে বা ফ্লুইড ব্যবহার করলে উত্তরপত্র বাতিল বা মূল্যায়নে সমস্যা হতে পারে

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত অফিসিয়াল দাখিল পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা-২০২৬ ।

Leave a Comment