বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা) পরিচালনার জন্য গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি গঠন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। অনেক সময় নিয়মিত কমিটি না থাকলে বা কোনো কারণে ভেঙে গেলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য সরকার ‘এডহক কমিটি’ গঠন করে দেয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এডহক কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রবিধানমালা, ২০২৪-এ কিছু সংশোধনী এনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্র জারি করেছে।
এই নিবন্ধে আমরা পরিপত্রের মূল নির্দেশনাসমূহ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব।
এডহক কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত
নতুন পরিপত্রে এডহক কমিটির সভাপতির যোগ্যতা সম্পর্কে অত্যন্ত পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি স্কুল-কলেজের স্বচ্ছতা ও গুণমান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১. স্নাতক পাস আবশ্যক
এডহক কমিটির সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে ‘স্নাতক পাস বা সমমান’। এটি একটি বড় পরিবর্তন, যা আগে নির্দিষ্ট ছিল না। এর ফলে এখন থেকে যেকোনো ব্যক্তি চাইলেই সভাপতি হতে পারবেন না, তাকে অবশ্যই উচ্চ শিক্ষিত হতে হবে।
২. বিশেষ ছাড়ের সুযোগ
তবে পরিপত্রে একটি ব্যতিক্রমী বিধান রাখা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি এমন হন যিনি স্থানীয় শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখেছেন বা তার এমন কোনো বিশেষ যোগ্যতা আছে যা প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্যবান, তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তটি শিথিল করতে পারে। এটি একটি বিশেষ বিবেচনামূলক সিদ্ধান্ত হবে।
সভাপতি মনোনয়ন ও প্যানেল তৈরির প্রক্রিয়া
সভাপতি মনোনয়নের প্রক্রিয়াটি আগের চেয়ে বেশি পদ্ধতিগত এবং স্বচ্ছ করা হয়েছে। এখন থেকে আর সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে সভাপতি মনোনীত করা যাবে না। একটি স্বচ্ছ প্যানেল তৈরির মাধ্যমে বোর্ডকে মনোনয়ন দিতে হবে।
১. তিন জনের প্যানেল তৈরি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, মেট্রোপলিটন এলাকায় বিভাগীয় কমিশনার এবং অন্যান্য জেলা বা উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) বা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ৩ জন যোগ্য ব্যক্তির নাম ও জীবনবৃত্তান্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডের নিকট প্রেরণ করবেন।
২. কারা এই প্যানেলে থাকতে পারবেন?
৩ জনের প্যানেলে নিম্নলিখিত শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করা যেতে পারে:
- সংশ্লিষ্ট জেলা বা উপজেলার সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা।
- অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ।
- স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি।
- শিক্ষা বিস্তারে আগ্রহী স্থানীয় খ্যাতিমান ব্যক্তি।
- বিশিষ্ট সমাজসেবক।
- স্থানীয় সংশ্লিষ্ট বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বা প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারী।
৩. বোর্ডের চূড়ান্ত মনোনয়ন
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড প্রস্তাবিত ৩ জন ব্যক্তির মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে যাচাই-বাছাই করে সভাপতি পদে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
এখানে ব্যবহারকারীরা প্রায়শই যে সব প্রশ্ন করে তার উত্তর দেওয়া হলো:
প্রশ্ন ১: স্নাতক পাস না হলে কি এডহক কমিটির সভাপতি হওয়া যাবে না?
উত্তর: সাধারণভাবে স্নাতক পাস না হলে এডহক কমিটির সভাপতি হওয়া যাবে না। তবে ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে, যদি কোনো ব্যক্তি শিক্ষার প্রসারে বিশেষ অবদান রাখেন, তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশেষ বিবেচনায় তার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত শিথিল করতে পারে।
প্রশ্ন ২: এডহক কমিটির সদস্য হিসেবে কারা থাকতে পারবেন?
উত্তর: এই পরিপত্রটি প্রধানত সভাপতি মনোনয়নের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়। সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্য থেকে নির্বাচন বা মনোনয়ন দেওয়া হয়, যা মূল প্রবিধানমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়।
প্রশ্ন ৩: ৩ জনের প্যানেলে কাকে রাখা যাবে?
উত্তর: সরকারি প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা – এমন ব্যক্তিদের রাখা যাবে। তবে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমান হতে হবে।
প্রশ্ন ৪: এই নিয়মটি কি মাদ্রাসার জন্যও প্রযোজ্য?
উত্তর: পরিপত্রে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ এবং ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড’ এর উল্লেখ আছে। মাদ্রাসার জন্য আলাদা শিক্ষা বোর্ড আছে। তাই এটি প্রধানত সাধারণ স্কুল-কলেজের জন্য। তবে অনেক সময় মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও অনুরূপ নির্দেশ অনুসরণ করা হয়। বিস্তারিত জানার জন্য আপনার স্থানীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সাথে যোগাযোগ করুন।
প্রশ্ন ৫: এই আদেশ কবে থেকে কার্যকর?
উত্তর: ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে জারিকৃত এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
শেষকথা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই নতুন পরিপত্র বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। সভাপতির জন্য স্নাতক পাসের শর্ত এবং একটি পদ্ধতিগত মনোনয়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ উন্নীত করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা যায়। এটি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দায়িত্বও বাড়িয়েছে। সঠিক ব্যক্তি নির্বাচন করা গেলেই প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।