মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫

বাংলাদেশের সমাজ জীবনে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। এতদিন অনেক ক্ষেত্রে মসজিদ পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট কাঠামোর অভাব ছিল। সেই অভাব পূরণে সরকার ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে “মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫” গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে

এই নতুন নীতিমালায় ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন জাতীয় স্কেলে নির্ধারণ, কমিটি গঠনে স্বচ্ছতা এবং মসজিদের আয়-ব্যয়ের অডিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আপনি যদি মসজিদ কমিটির সদস্য, ইমাম, মুয়াজ্জিন বা সাধারণ মুসল্লি হন, তবে এই পরিবর্তনের খুঁটিনাটি জানা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

নতুন নীতিমালায় কী আছে?

মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫ হলো সরকারি মসজিদ ব্যতীত দেশের সকল মসজিদের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রণীত একটি আইনি কাঠামো । এর মূল বিষয়গুলো হলো:

  • বেতন কাঠামো: খতীব ও ইমামদের বেতন এখন থেকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী (গ্রেড ৫ থেকে গ্রেড ৯) নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।
  • কমিটি গঠন: মসজিদ কমিটিতে ১৫ জন সদস্য থাকবেন এবং এর মেয়াদ হবে ৩ বছর ।
  • নিয়োগ প্রক্রিয়া: পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ও ৭ সদস্যের বাছাই কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জনবল নিয়োগ দিতে হবে ।
  • বাধ্যতামূলক সঞ্চয়: ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতনের ৫% কেটে সমপরিমাণ অর্থ মসজিদ তহবিল থেকে দিয়ে ব্যাংকে জমা রাখতে হবে (প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো) ।

মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি

মসজিদ পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা এখন “মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির” হাতে থাকবে। তবে চাইলেই যে কেউ কমিটিতে থাকতে পারবেন না।

কমিটির আকার ও পদবী

একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে মোট ১৫ জন সদস্য থাকবেন । পদগুলো হলো:

  • সভাপতি: ১ জন
  • সহ-সভাপতি: ২ জন
  • সাধারণ সম্পাদক: ১ জন
  • সহ-সাধারণ সম্পাদক: ১ জন
  • অর্থ সম্পাদক: ১ জন
  • মসজিদ পাঠাগার ও দ্বীনি দাওয়াত সম্পাদক: ১ জন
  • শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক: ১ জন
  • নির্বাহী সদস্য (প্রধান ইমামসহ): ৭ জন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: মসজিদের প্রধান ইমাম পদাধিকারবলে কমিটির নির্বাহী সদস্য হবেন, তবে নিজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সভায় তিনি থাকতে পারবেন না

কমিটির মেয়াদ ও নির্বাচন

  • মেয়াদ: কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। তবে সাধারণ সভার সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ ১ বছর বাড়ানো যাবে ।
  • নির্বাচন: মুসল্লিদের তৈরি করা ভোটার তালিকার মাধ্যমে নির্বাচন হবে। এটি প্রস্তাব-সমর্থন বা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে হতে পারে ।

ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বেতন ও পদমর্যাদা

এই নীতিমালার সবচেয়ে বড় চমক হলো বেতন কাঠামো। আর্থিক স্বচ্ছলতা অনুযায়ী মসজিদগুলোকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে

পদের নামবেতন গ্রেড (জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫)মন্তব্য
খতীবচুক্তিভিত্তিকআলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত
সিনিয়র পেশ ইমামগ্রেড-৫
পেশ ইমামগ্রেড-৬
ইমামগ্রেড-৯
প্রধান মুয়াযযিনগ্রেড-১০
মুয়াযযিনগ্রেড-১১
প্রধান খাদিমগ্রেড-১৫
খাদিমগ্রেড-১৬

নোট: পাঞ্জেগানা মসজিদ বা আর্থিকভাবে অসচ্ছল মসজিদের ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করা যাবে । এছাড়া বছরে দুটি ঈদে ১ মাসের মূল বেতনের সমান উৎসব ভাতা পাওয়া যাবে

জনবল নিয়োগ ও যোগ্যতা

এখন থেকে পরিচিত কাউকে চাইলেই ইমাম বা মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

  • বাছাই কমিটি: নিয়োগের জন্য ৭ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি থাকবে, যেখানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি ও একজন মুফতী থাকবেন ।
  • বিজ্ঞপ্তি: স্থানীয় বা জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে এবং অন্তত ১৫ দিন সময় দিতে হবে ।
  • পরীক্ষা: লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা তালিকা করতে হবে। খতীব ও ইমামদের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পরীক্ষা (তিলাওয়াত, খুতবা) বাধ্যতামূলক ।

আর্থিক সুবিধা ও নিরাপত্তা

মসজিদে কর্মরতদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কিছু চমৎকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে:

  1. মাসিক সঞ্চয়: কর্মচারীর বেতন থেকে ৫% এবং মসজিদ তহবিল থেকে ৫%—মোট ১০% অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হবে। চাকরি শেষে বা অবসরে এই টাকা পাওয়া যাবে ।
  2. এককালীন সম্মাননা: অবসরের পর কর্মরত ব্যক্তি যত বছর চাকরি করেছেন, তত মাসের মূল বেতনের সমান টাকা এককালীন পাবেন ।
  3. ছুটি: বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি এবং প্রতি ১২ দিনে ১ দিন অর্জিত ছুটি পাওয়া যাবে। অসুস্থতায় ৩০ দিন পর্যন্ত ছুটি নেওয়া যাবে ।

বিরোধ নিষ্পত্তি ও নিবন্ধন

মসজিদ নিয়ে কোনো ঝামেলা হলে আদালতের আগে স্থানীয়ভাবে সমাধানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

  • বিরোধ নিষ্পত্তি: কোনো কর্মচারী বা কমিটির সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে ৩০ দিনের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) বা সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আপিল করা যাবে ।
  • নিবন্ধন: দেশের সব মসজিদকে কেন্দ্রীয় ডাটাবেইজে নিবন্ধিত হতে হবে। এটি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন করবে ।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. খতীব হওয়ার যোগ্যতা কী?

উত্তর: খতীব পদে নিয়োগের জন্য কামিল (২য় শ্রেণি), দাওরায়ে হাদীস (২য় শ্রেণি) অথবা ইসলামী বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি থাকতে হবে। সাথে ইমাম হিসেবে ১০ বছর বা শিক্ষকতার ৮ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন

২. মসজিদ কমিটির কেউ দুর্নীতি করলে কী হবে?

উত্তর: যদি কোনো সদস্য মসজিদের স্বার্থবিরোধী কাজ করেন বা দুর্নীতি করেন, তবে তাকে পদচ্যুত করা যাবে। তবে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে

৩. মসজিদের টাকা কোথায় জমা রাখতে হবে?

উত্তর: মসজিদের নামে শরীয়াহভিত্তিক কোনো ব্যাংকে হিসাব খুলতে হবে। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও অর্থ সম্পাদকের মধ্যে যেকোনো দুইজনের যৌথ স্বাক্ষরে এই হিসাব পরিচালিত হবে

৪. ইমাম বা মুয়াজ্জিনকে কি হুট করে ছাঁটাই করা যাবে?

উত্তর: না। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ছাঁটাই করা যাবে না। তবে অতিরিক্ত জনবল কমানোর প্রয়োজনে ৬ মাসের অগ্রিম বেতন দিয়ে ছাঁটাই করা যেতে পারে

আপনার করণীয়

মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি বাস্তবায়িত হলে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবনমান উন্নয়ন হবে এবং মসজিদ পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরবে।

  • আপনার এলাকার মসজিদটি নিবন্ধিত কিনা খোঁজ নিন।
  • কমিটি গঠনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মুসল্লিদের সচেতন করুন।
  • ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা তাদের ন্যায্য পাওনা পাচ্ছেন কিনা তা তদারকি করুন।

মসজিদ আল্লাহর ঘর, এর পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা রক্ষা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬; ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

Leave a Comment