সরকারি অফিসে কাজের গতিশীলতা বাড়াতে এবং আসন্ন ঈদুল আযহার দীর্ঘ ছুটির সাথে কর্মঘণ্টা সমন্বয় করতে সরকার শনিবারের ছুটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ঈদুল আযহা উপলক্ষে ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত টানা ৭ দিন সরকারি ছুটি থাকবে। এই দীর্ঘ ছুটি সমন্বয়ের লক্ষ্যে ঈদের আগে ২৩ মে (শনিবার) সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে, অর্থাৎ ওইদিন সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্বাভাবিক নিয়মে অফিস করতে হবে। এছাড়া, জ্বালানি পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় এবং প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে স্থায়ীভাবে শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে ছুটি কেবল ১ দিন (শুক্রবার) করার বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পরিকল্পনা চলছে।
কেন সাময়িকভাবে শনিবারের ছুটি বাতিল করা হলো?
সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক বৈঠকে সরকারি ছুটির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষে টানা ৭ দিনের (২৫ মে থেকে ৩১ মে, ২০২৬) ছুটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
যেহেতু ২৮ মে সম্ভাব্য ঈদুল আযহার দিন ধরে দীর্ঘ এই ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাই কাজের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং কর্মঘণ্টার ভারসাম্য বজায় রাখতে ২৩ মে শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে ২৪ মে রবিবার শেষ অফিস করে সরকারি চাকরিজীবীরা টানা সাত দিনের দীর্ঘ ছুটিতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির বিবর্তন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
অনেকেই মনে করছেন, সাময়িক এই সমন্বয় মূলত স্থায়ীভাবে শনিবারের ছুটি বাতিল করার প্রথম পদক্ষেপ। স্বাধীন বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির কাঠামো বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। নিচে এর একটি ধারাবাহিক ও ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরা হলো:
- ১৯৭২ সাল: স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শুরুতে রবিবারকে সাপ্তাহিক ছুটি হিসেবে পালন করা হতো।
- ১৯৮৩ সাল: প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রথমবারের মতো শুক্র ও শনিবার—এই দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি চালু করা হয়।
- ১৯৮৫ সাল: দুই দিনের ছুটি পরিবর্তন করে আবারও সপ্তাহে শুধু শুক্রবার ১ দিন ছুটি নির্ধারণ করা হয়।
- ১৯৯৮ সাল: সরকার পুনরায় দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটিতে ফিরে যায়, যা ২০০১ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল।
- ২০০১ সাল: বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসে শনিবারের ছুটি বাতিল করে দেয় এবং পুনরায় এক দিনের ছুটিতে ফিরে যায়।
- ২০০৭ সাল: দেশব্যাপী তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সেসময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরায় শুক্র ও শনিবার দুই দিনের ছুটি চালু করে।
- বর্তমান পরিস্থিতি (গত ১৯ বছর): ২০০৭ সালের পর থেকে দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে শুক্র ও শনিবার দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটির প্রথা চলে আসছিল।
স্থায়ীভাবে শনিবারের ছুটি বাতিলের নেপথ্য কারণ
ভিডিও বিশ্লেষণ ও উচ্চ পর্যায়ের সূত্র থেকে জানা যায়, স্থায়ীভাবে শনিবারের ছুটি বাতিল করার পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত ও বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে:
১. প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি: নতুন সরকারের কাজগুলো দ্রুত দৃশ্যমান করতে এবং মন্ত্রণালয়গুলোর ঝুলে থাকা কার্যক্রমে গতি আনতে কর্মদিবস বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
২. জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল হওয়া: অতীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিস বন্ধ রাখার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি চলায় জ্বালানির দাম ও সরবরাহ বেশ স্থিতিশীল রয়েছে। তাই বাড়তি ছুটির আর তেমন প্রয়োজন নেই।
৩. জনগণের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করা: সপ্তাহে ছয় দিন অফিস খোলা থাকলে সাধারণ মানুষ সরকারি দপ্তরগুলো থেকে দ্রুত সেবা পাবেন এবং কাজের দীর্ঘসূত্রতা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর
সরকারি চাকরিজীবীদের শনিবারের ছুটি কি চিরতরে বাতিল হচ্ছে?
বর্তমানে ২৩ মে ২০২৬ তারিখের শনিবারের ছুটিটি সুনির্দিষ্টভাবে ঈদুল আযহার ৭ দিনের ছুটির সাথে সমন্বয়ের জন্য বাতিল করা হয়েছে। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রমতে, ঈদের পর কাজের গতি বাড়াতে স্থায়ীভাবে শনিবারের ছুটি বাতিল করে কর্মদিবস ৬ দিন করার বিষয়ে জোরালো পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬ সালের ঈদুল আযহার ছুটি কত দিন এবং কবে থেকে শুরু?
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের ঈদুল আযহার ছুটি মোট ৭ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ছুটি ২৫ মে থেকে শুরু হয়ে ৩১ মে পর্যন্ত চলবে।
শনিবার অফিস খোলা রাখলে সাধারণ মানুষের কী সুবিধা হবে?
সপ্তাহে মাত্র একদিন ছুটি থাকলে সরকারি অফিসগুলোতে কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সাধারণ নাগরিকরা তাদের আটকে থাকা ফাইল, লাইসেন্স, পাসপোর্ট বা অন্যান্য দাপ্তরিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারবেন, যা সামগ্রিকভাবে দেশের সেবাখাতের মান উন্নত করবে।
২৩ মে ২০২৬ (শনিবার) কি সরকারি অফিস খোলা থাকবে?
হ্যাঁ, মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৩ মে শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ওইদিন সব সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিস স্বাভাবিক নিয়মে খোলা থাকবে।
বাংলাদেশে শুক্র-শনিবার দুই দিনের ছুটি কবে থেকে চলছে?
২০০৭ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুক্র ও শনিবার দুই দিনের ছুটি চালু করেছিল, যা গত ১৯ বছর ধরে চলমান রয়েছে।
তথ্যসূত্র: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ (বাংলাদেশ সচিবালয়)

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।