সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রিক রিসোর্স পুল হলো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) কর্তৃক গৃহীত একটি বিশেষ উদ্যোগ, যার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি সাময়িক শিক্ষক প্যানেল বা পুল তৈরি করা হয়। বিভিন্ন কারণে নিয়মিত শিক্ষকরা দীর্ঘমেয়াদী ছুটিতে (যেমন: মাতৃত্বকালীন, চিকিৎসা বা প্রশিক্ষণ ছুটি) থাকলে, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি দূর করতে এবং মানসম্মত পাঠদান অব্যাহত রাখতে এই রিসোর্স পুলের সদস্যরা খণ্ডকালীন বা প্রয়োজনভিত্তিক ক্লাস নেবেন। প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ৫ জন যোগ্য অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের তালিকা তৈরি করে উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে অধিদপ্তরে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রিসোর্স পুল গঠনের পটভূমি: কেন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সারা বছরই কোনো না কোনো শিক্ষক আবশ্যিক বা নৈমিত্তিক ছুটিতে থাকেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (DPE) মার্চ ও এপ্রিল ২০২৬ সালের মাসিক সমন্বয় সভার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূলত নিচের কারণগুলোতে বিদ্যালয়ে সাময়িক শিক্ষক স্বল্পতা দেখা দেয়:
- উচ্চশিক্ষা বা স্টাডি লিভ (শিক্ষা ছুটি)
- মাতৃত্বকালীন ছুটি (Maternity Leave)
- দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ছুটি (Medical Leave)
- বিনা বেতনে ছুটি (Leave Without Pay)
- বাধ্যতামূলক পেশাগত প্রশিক্ষণ (যেমন: BTPT Training)
শিক্ষকদের এই অনুপস্থিতির কারণে বিদ্যালয়ের নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং উপস্থিত শিক্ষকদের ওপর কাজের অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যে শিখন ঘাটতি (Learning Gap) তৈরি হয়, তা নিরসন করতেই পরিকল্পিতভাবে এই ‘রিসোর্স পুল’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কারা হতে পারবেন রিসোর্স পুলের সদস্য? (যোগ্যতা ও শর্তাবলী)
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের স্মারক (নং: ৩৮.০১.০০০০.১৪৫.৯৯.০১৫.২৬-৫৬৪/০৯) অনুযায়ী, রিসোর্স পারসন হিসেবে যুক্ত হতে হলে প্রার্থীদের আবশ্যিকভাবে নিম্নলিখিত ৪টি শর্ত পূরণ করতে হবে:
- শিক্ষকতা পেশার অভিজ্ঞতা: প্রার্থীকে অবশ্যই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় অথবা মাদ্রাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হতে হবে।
- স্থায়ী বাসিন্দা: সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের নির্ধারিত ক্যাচমেন্ট এরিয়ার (Catchment Area) স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- আগ্রহ ও মানসিকতা: শিশুদের পাঠদানে এবং রিসোর্স পারসন হিসেবে কাজ করার স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ থাকতে হবে।
- একাডেমিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ: প্রার্থীকে অবশ্যই পেশাগতভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। যেমন: সিইনএড (C-in-Ed), বিএড (B.Ed) অথবা এমএড (M.Ed) ডিগ্রিধারী হতে হবে।
রিসোর্স পুল গঠনের বাছাই প্রক্রিয়া
অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিচে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো:
১. বিদ্যালয় পর্যায় থেকে প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত
প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্র্তৃক তাদের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার যোগ্য অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ ৫ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা (নির্ধারিত ছক অনুযায়ী) প্রস্তুত করা হবে।
২. সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের যাচাই-বাছাই
বিদ্যালয় কর্তৃক প্রস্তুতকৃত তালিকাটি সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (AUEO) সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করবেন এবং সঠিকতা নিশ্চিত করে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নিকট দাখিল করবেন।
৩. উপজেলা শিক্ষা অফিসার কর্তৃক চূড়ান্তকরণ
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (UEO) প্রাপ্ত তালিকাগুলো পুনরায় নিরীক্ষণ করে উপজেলার একটি সমন্বিত ও চূড়ান্ত রিসোর্স পুল তালিকা প্রস্তুত করবেন এবং তা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নিকট প্রেরণ করবেন।
৪. জেলা অফিস থেকে অধিদপ্তরে প্রেরণ
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (DPEO) জেলার আওতাধীন সকল উপজেলার তালিকাটি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (DPE) প্রেরণ করবেন। অধিদপ্তরের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অনুযায়ী ১০ মে ২০২৬ তারিখের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব
এই যুগান্তকারী পদক্ষেপটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশ কিছু কাঠামোগত ও গুণগত পরিবর্তন আসবে:
- নিরবচ্ছিন্ন পাঠদান: কোনো শিক্ষক দীর্ঘ ছুটিতে গেলেও ক্লাস রুটিনে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।
- অভিজ্ঞতার কাজে লাগানো: প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে পুনরায় দেশের সেবায় এবং শিশুদের মানসিক বিকাশে কাজে লাগানো যাবে।
- শিক্ষকদের চাপ লাঘব: বিদ্যালয়ে উপস্থিত নিয়মিত শিক্ষকদের ওপর প্রক্সি ক্লাসের অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপ কমবে।
- মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চয়তা: সঠিক সময়ে সিলেবাস সম্পন্ন করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিখন দক্ষতা মজবুত হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাস্য
প্র: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রিক রিসোর্স পুল কী? উ: এটি অবসরপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একটি প্যানেল, যা নিয়মিত শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদী অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শিখন ঘাটতি পূরণে সাময়িকভাবে কাজ করবে।
প্র: একটি বিদ্যালয় থেকে কতজন শিক্ষককে রিসোর্স পুলে রাখা যাবে? উ: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ৫ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের তালিকা তৈরি করা যাবে।
প্র: সাধারণ বা অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কি এই পুলে যুক্ত হতে পারবেন? উ: না। কেবল প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা মাদ্রাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, যাদের সিইনএড (C-in-Ed), বিএড (B.Ed) বা এমএড (M.Ed) প্রশিক্ষণ রয়েছে, তারাই যুক্ত হতে পারবেন।
প্র: তালিকার জন্য শিক্ষকদের আবেদন কোথায় জমা দিতে হবে? উ: আগ্রহী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সরাসরি নিজ এলাকার (ক্যাচমেন্ট এরিয়ার) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। প্রধান শিক্ষক যাচাই করে তালিকা ওপরের দপ্তরে পাঠাবেন।
প্র: রিসোর্স পুল গঠনের পরিপত্রটি কবে জারি করা হয়? উ: পরিপত্রটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) খাদিজা পারভীন স্বাক্ষরিত হয়ে ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হয়।
🔗 তথ্যসূত্র
- সরকারি আদেশ: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, সেকশন-২, মিরপুর, ঢাকা কর্তৃক জারিকৃত অফিস আদেশ
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE)

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।