আপনি কি সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা এবং আপিল বিধিমালা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছেন? প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে নিজের অধিকার এবং কর্তব্যের সীমা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। মূলত সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ কার্যকর করা হয়েছে। এই বিধিমালা ১২ এপ্রিল ২০১৮ থেকে কার্যকর হয়।
আজকের লেখায় আমি বিধিমালার শাস্তি, অভিযোগের ধরন এবং আপিলের নিয়মগুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
এই বিধিমালা কাদের জন্য প্রযোজ্য?
প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত অধিকাংশ কর্মচারীর ক্ষেত্রেই এই বিধিমালা প্রযোজ্য। তবে নির্দিষ্ট কিছু বাহিনীর জন্য আলাদা কোড থাকায় তাদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হয় না। যেমন:
- রেলওয়ে সংস্থাপন কোডের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিগণ।
- মেট্রোপলিটন পুলিশের অধঃস্তন কর্মচারী এবং পুলিশ পরিদর্শকের নিচের পদের সদস্যগণ।
- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) এর অধঃস্তন কর্মকর্তা ও রাইফেলম্যান।
- বাংলাদেশ জেলের অধঃস্তন কর্মচারীগণ।
- যাদের চাকরির শর্তাবলি বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত।
‘অসদাচরণ’ বলতে কী বোঝায়?
চাকরি শৃঙ্খলার পরিপন্থি যেকোনো আচরণই অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হয়। উল্লেখযোগ্য কিছু অসদাচরণ হলো:
- ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বৈধ আদেশ অমান্য করা।
- কর্তব্যে অবহেলা প্রদর্শন।
- বিনা অনুমতিতে ৬০ দিন বা তার বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা (পলায়ন)।
- কর্তৃপক্ষের কাছে ভিত্তিহীন বা হয়রানিমূলক অভিযোগ করা।
- দুর্নীতিপরায়ণ হওয়া বা নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত হওয়া।
দণ্ডের প্রকারভেদ: লঘুদণ্ড ও গুরুদণ্ড
এই বিধিমালার অধীনে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী দুই ধরণের দণ্ড আরোপ করা যায়।
লঘুদণ্ড (Minor Penalties):
- তিরস্কার: অপরাধের জন্য মৌখিক বা লিখিত সতর্কবার্তা।
- বেতন বৃদ্ধি স্থগিত: নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি আটকে রাখা।
- ক্ষতিপূরণ আদায়: আর্থিক ক্ষতির অংশ বিশেষ বেতন বা আনুতোষিক থেকে কেটে নেওয়া।
- বেতন গ্রেড অবনমন: বেতন স্কেলের নিচের ধাপে নামিয়ে দেওয়া।
গুরুদণ্ড (Major Penalties):
- নিম্ন পদে অবনমিত করা: উচ্চ পদ থেকে নিচের পদে নামিয়ে দেওয়া।
- বাধ্যতামূলক অবসর: মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই অবসরে পাঠানো।
- চাকরি থেকে অপসারণ: এটিও একটি বড় শাস্তি, তবে পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পথে বাধা নাও হতে পারে।
- চাকরি হতে বরখাস্তকরণ: এটি চূড়ান্ত দণ্ড, যার ফলে অন্য কোনো সরকারি চাকরিতে আর আবেদন করা যায় না।
গুরুদণ্ড আরোপের তদন্ত পদ্ধতি
যদি কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসে যেখানে গুরুদণ্ড হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়:
- অভিযোগনামা দাখিল: কর্তৃপক্ষ অভিযোগের বিবরণ এবং প্রস্তাবিত দণ্ড উল্লেখ করে অভিযুক্তকে জানাবে।
- জবাব প্রদানের সময়: অভিযুক্তকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে হবে। প্রয়োজনে আরও ১০ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
- তদন্ত বোর্ড গঠন: যদি জবাব সন্তোষজনক না হয়, তবে ৩ সদস্যের তদন্ত বোর্ড গঠন করা হয়।
- শোকজ নোটিশ: তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে দণ্ড দেওয়ার আগে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর দ্বিতীয় নোটিশ দেওয়া হয়।
- কমিশনের পরামর্শ: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকারি কর্ম কমিশনের (PSC) পরামর্শ নিতে হবে।
আপিল করার নিয়ম ও সময়সীমা
যদি কোনো কর্মচারী দণ্ডপ্রাপ্ত হন, তবে তিনি শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন:
- সময়সীমা: আদেশের অনুলিপি পাওয়ার তারিখ থেকে ৩ মাসের মধ্যে আপিল করতে হবে।
- কোথায় আপিল করবেন: আদেশ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করতে হবে।
- ব্যতিক্রম: রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত কোনো আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নেই।
বিস্তারিত জানতে: সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ২০১৮ https://www.dpp.gov.bd/upload_file/gazettes/25627_27177.pdf
সাধারণ প্রশ্নাবলী
বিনা অনুমতিতে ৬০ দিন বা তার বেশি অনুপস্থিত থাকা অথবা বিদেশে অনুমোদিত সময়ের অতিরিক্ত ৬০ দিন অননুমোদিতভাবে অবস্থান করাকে পলায়ন বলে।
দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হলে কর্তৃপক্ষ তাকে লঘুদণ্ড বা বরখাস্ত পর্যন্ত যেকোনো গুরুদণ্ড দিতে পারে। তবে দুর্নীতির ক্ষেত্রে নিম্নপদে অবনমিত করার শাস্তি সাধারণত দেওয়া হয় না।
না, তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর কর্তৃপক্ষ সেটি বিবেচনা করবে এবং সুনির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজন মনে করলে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিতে পারে।
শেষকথা:
সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ২০১৮ মূলত কর্মচারীদের অধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি আইনি কাঠামো। নিজের অধিকার রক্ষা করতে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এড়াতে এই বিধিমালার নিয়মগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা বুদ্ধিমানের কাজ।
তথ্যসূত্র: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।