বাংলাদেশে সরকারি চাকুরিজীবীদের পদমর্যাদা এবং গ্রেড নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে। বিশেষ করে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কারা এবং বর্তমানে তাদের পদবী বা গ্রেড কী এই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
২০১৫ সালের নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী, সরকার এখন আর ‘শ্রেণী’ শব্দটি ব্যবহার করে না, বরং ২০টি ‘গ্রেড’ অনুযায়ী কর্মচারীদের ভাগ করা হয়। তবে প্রচলিত জনবল কাঠামো ও সামাজিক আলোচনায় এখনও ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণী শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কারা?
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি চাকুরির ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের ৩য় শ্রেণী এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের ৪র্থ শ্রেণী বলা হয়। ৩য় শ্রেণীতে সাধারণত অফিস সহকারী ও টেকনিক্যাল পদের কর্মীরা থাকেন এবং ৪র্থ শ্রেণীতে অফিস সহায়ক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত।
সরকারি চাকুরিতে গ্রেড ভিত্তিক বর্তমান পরিচিতি
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ কার্যকরের পর থেকে শ্রেণী প্রথা বিলুপ্ত করে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে বিষয়টি সহজে বোঝানো হলো:
| পুরাতন শ্রেণী | বর্তমান গ্রেড (Grade) | প্রধান পদসমূহ (উদাহরণ) |
| ৩য় শ্রেণী | ১১ থেকে ১৬ তম গ্রেড | অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, স্টোর কিপার, ড্রাইভার (ভারী), টেকনিশিয়ান। |
| ৪র্থ শ্রেণী | ১৭ থেকে ২০ তম গ্রেড | অফিস সহায়ক (MLSS), নিরাপত্তা প্রহরী, মালি, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, রান্নাকারী। |
৩য় শ্রেণীর কর্মচারী সম্পর্কে বিস্তারিত
৩য় শ্রেণীর কর্মচারীরা মূলত দাপ্তরিক এবং প্রযুক্তিগত কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাদের কাজের ধরণ অনুযায়ী সাধারণত এইচএসসি (HSC) বা স্নাতক (Degree/Honors) পাশের যোগ্যতা প্রয়োজন হয়।
প্রধান পদসমূহ:
- অফিস সহকারী: ফাইল মেইনটেইন এবং দাপ্তরিক চিঠিপত্র দেখাশোনা করা।
- হিসাব সহকারী: অফিসের আর্থিক লেনদেনের প্রাথমিক হিসাব রাখা।
- ড্রাইভার (গ্রেড-১৫/১৬): সরকারি গাড়ির চালক।
- কম্পিউটার অপারেটর: টাইপিং এবং ডাটাবেস ম্যানেজমেন্ট।
৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী সম্পর্কে বিস্তারিত
৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা মূলত অফিসিয়াল সাপোর্টিং স্টাফ বা মাঠ পর্যায়ের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এসব পদের জন্য সাধারণত জেএসসি (JSC) বা এসএসসি (SSC) পাশের যোগ্যতা প্রয়োজন হয়।
প্রধান পদসমূহ:
- অফিস সহায়ক: পূর্বে যাদের পিয়ন বা এমএলএসএস (MLSS) বলা হতো।
- নিরাপত্তা প্রহরী: অফিস বা আবাসন পাহারা দেওয়া।
- মালি ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী: বাগান পরিচর্যা এবং অফিস পরিষ্কার রাখা।
- মেসওয়েটার: ডাইনিং বা সরকারি গেস্ট হাউসে সাহায্য করা।
৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যে পার্থক্য কী?
অনেকে মনে করেন শ্রেণীভেদে কাজ বা সুযোগ-সুবিধা অনেক আলাদা। প্রধান পার্থক্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৩য় শ্রেণীর জন্য কমপক্ষে এইচএসসি (HSC) প্রয়োজন হয়, যেখানে ৪র্থ শ্রেণীর জন্য অষ্টম শ্রেণী বা এসএসসি পাসই যথেষ্ট।
- কাজের প্রকৃতি: ৩য় শ্রেণীর কাজ অনেকটা দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক (Desk Job), আর ৪র্থ শ্রেণীর কাজ সেবামূলক বা কায়িক শ্রম নির্ভর।
- বেতন ও সুযোগ-সুবিধা: গ্রেড অনুযায়ী ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীদের মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতাদি ৪র্থ শ্রেণীর তুলনায় বেশি হয়।
- পদোন্নতি: ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (AO) পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ থাকে, যা ৪র্থ শ্রেণীর ক্ষেত্রে তুলনামূলক সীমিত।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
১. ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর পদ কি এখন উঠে গেছে?
প্রযুক্তিগতভাবে ‘শ্রেণী’ শব্দটি এখন নেই। এখন সবাই ‘গ্রেড’ দ্বারা পরিচিত। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এখনও বোঝার সুবিধার্থে অনেকে এটি উল্লেখ করেন।
২. ১১তম গ্রেড কি ৩য় শ্রেণী নাকি ২য় শ্রেণী?
সাধারণত ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডকে ৩য় শ্রেণী ধরা হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ১০ম গ্রেডকে ২য় শ্রেণী (Non-Cadre) হিসেবে গণ্য করা হয়।
৩. সরকারি সুযোগ-সুবিধার কি কোনো পার্থক্য আছে?
হ্যাঁ, ছুটি, পেনশন এবং চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে সামান্য ভিন্নতা থাকলেও অধিকাংশ সরকারি নিয়ম (যেমন: উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা) সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর।
উপসংহার:
সহজ কথায়, আপনি যদি সরকারি চাকুরির বিজ্ঞপ্তিতে ১১-২০ গ্রেডের কোনো পদ দেখেন, তবে বুঝে নেবেন সেটি ৩য় বা ৪র্থ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক স্মার্ট বাংলাদেশে এখন সব চাকুরিজীবীকে তাদের নির্দিষ্ট গ্রেড এবং পদবী দিয়ে সম্মান জানানো হয়।
তথ্যসূত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা: * বাংলাদেশ গেজেট (জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫)।
- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (MOPA) এর সার্কুলার।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।