প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ১০টি সরকারি সুবিধা

আপনি কি জানেন, বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের (Persons with Disabilities) জীবনমান উন্নয়নে শুধু মাসিক ভাতা নয়, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা, এবং কর্মসংস্থানেও বিশাল সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে? সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই এই সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হন। আজকের এই গাইডে আমরা জানবো একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা “সুবর্ণ নাগরিক” সরকারের কাছ থেকে ঠিক কী কী সুবিধা পেতে পারেন।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য মূল সরকারি সুবিধাসমূহ

একজন নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা সুবর্ণ নাগরিক কার্ডধারীরা মূলত যে সুবিধাগুলো পান:

১. মাসিক ভাতা: ৮৫০ টাকা (বাজেট অনুযায়ী পরিবর্তনযোগ্য)।

২. শিক্ষা উপবৃত্তি: প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত ৭৫০ থেকে ১৩০০ টাকা পর্যন্ত।

৩. বিনামূল্যে চিকিৎসা: দেশের ১০৩টি কেন্দ্রে ফিজিওথেরাপি ও স্পিচ থেরাপি।

৪. সহায়ক উপকরণ: বিনামূল্যে হুইলচেয়ার, হিয়ারিং এইড ও সাদা ছড়ি।

৫. ঋণ সুবিধা: ৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ।

আপনি কী কী সুবিধা পাবেন?

সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের “বোঝা” নয়, বরং “সম্পদ” হিসেবে গড়ে তুলতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বহুমুখী সেবা দিচ্ছে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. মাসিক প্রতিবন্ধী ভাতা (Disability Allowance)

সবচেয়ে জনপ্রিয় সুবিধা হলো মাসিক ভাতা। অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে মাসিক ৮৫০ টাকা করে ভাতা প্রদান করা হয়। এই টাকা এখন সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) এর মাধ্যমে পৌঁছে যায়।

২. শিক্ষা উপবৃত্তি (Stipend for Students)

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য ৪টি স্তরে মাসিক উপবৃত্তি দেওয়া হয়:

  • প্রাথমিক স্তর (১ম-৫ম শ্রেণি): ৭৫০ টাকা
  • মাধ্যমিক স্তর (৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণি): ৮০০ টাকা
  • উচ্চ মাধ্যমিক স্তর (১১শ-দ্বাদশ): ৯০০ টাকা
  • উচ্চতর স্তর (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর): ১৩০০ টাকা

৩. সুদমুক্ত ঋণ ও কর্মসংস্থান

নিজেদের স্বাবলম্বী করতে সরকার ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ৫,০০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ পাওয়া যায়।

  • চাকরি কোটা: সরকারি ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির চাকরিতে প্রতিবন্ধী ও এতিমদের জন্য ১০% কোটা সংরক্ষিত রয়েছে।

৪. বিনামূল্যে চিকিৎসা ও থেরাপি সেবা

দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র (Disability Service and Help Centre) থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আধুনিক চিকিৎসা পাওয়া যায়। এখানে যেসব সেবা মেলে:

  • ফিজিওথেরাপি: স্ট্রোক, প্যারালাইসিস বা বাত ব্যথার রোগীদের জন্য।
  • স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি: যারা কথা বলতে বা শুনতে পারে না তাদের জন্য।
  • কাউন্সেলিং: মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম বিষয়ক পরামর্শ।
  • টেস্ট: হিয়ারিং টেস্ট (শ্রবণ পরীক্ষা) ও অপটোমেট্রিক টেস্ট (দৃষ্টি পরীক্ষা)।

৫. বিনামূল্যে সহায়ক উপকরণ (Assistive Devices)

আর্থিক সামর্থ্য নেই এমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের সুবিধার্থে সরকার বিনামূল্যে দামী উপকরণ সরবরাহ করে:

  • হুইলচেয়ার (Wheelchair) ও ট্রাইসাইকেল।
  • ক্রাচ ও ওয়াকিং ফ্রেম।
  • সাদা ছড়ি (দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য)।
  • হিয়ারিং এইড বা কানে শোনার যন্ত্র।
  • বিশেষ চশমা।

টিপস: এই উপকরণগুলো পেতে আপনার নিকটস্থ প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে আবেদন করতে হবে।

৬. যাতায়াত ও পরিবহন সুবিধা

২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, গণপরিবহনে (বাস, ট্রেন, লঞ্চ) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য:

  • নির্দিষ্ট আসন (Reserved Seats) সংরক্ষিত থাকবে।
  • ভাড়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে।

৭. বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসন

দৃষ্টি, শ্রবণ ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে বিশেষায়িত স্কুল রয়েছে।

  • আবাসিক সুবিধা: অনেক স্কুলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।
  • ব্রেইল বই: দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য বিনামূল্যে ব্রেইল বই ও শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়।

৮. ফ্যামিলি পেনশন সুবিধা (Family Pension)

কোনো সরকারি চাকরিজীবী মারা গেলে এবং তার যদি কোনো প্রতিবন্ধী সন্তান থাকে, তবে সেই সন্তান তার বাবা বা মায়ের অবর্তমানে আজীবন পেনশন সুবিধা ভোগ করবেন।

📝 এই সুবিধাগুলো পেতে আপনার কী লাগবে?

এই সকল সুবিধা পাওয়ার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো “সুবর্ণ নাগরিক কার্ড” (Suborno Nagorik Card) বা প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র থাকা।

  1. নিবন্ধন: স্থানীয় সমাজসেবা অফিসে গিয়ে বা অনলাইনে সুবর্ণ নাগরিক কার্ডের জন্য আবেদন করুন।
  2. ডাক্তারি পরীক্ষা: সিভিল সার্জনের অফিস বা নির্ধারিত কেন্দ্র থেকে প্রতিবন্ধিতার ধরণ নির্ণয় করতে হবে।
  3. কার্ড সংগ্রহ: সমাজসেবা অফিস থেকে কার্ডটি সংগ্রহ করুন।

❓ সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য কোথায় আবেদন করবো?

উত্তর: আপনি অনলাইনে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পোর্টালে অথবা সরাসরি আপনার ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা সমাজসেবা অফিসে গিয়ে আবেদন করতে পারেন।

প্রশ্ন: আমি কি একই সাথে বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতা পাবো?

উত্তর: না, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তি সাধারণত একটির বেশি ভাতা (যেমন বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা) একসাথে পান না। তবে শিক্ষা উপবৃত্তির সাথে ভাতার বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।

প্রশ্ন: সুদমুক্ত ঋণ পেতে কী জামানত লাগে?

উত্তর: সমাজসেবা অধিদপ্তরের ক্ষুদ্র ঋণের জন্য সাধারণত বড় কোনো জামানতের প্রয়োজন হয় না, তবে স্থানীয় জামিনদার বা সুপারিশ প্রয়োজন হতে পারে।

শেষকথা

প্রতিবন্ধিতা কোনো অভিশাপ নয়, সঠিক যত্ন আর সরকারি সুবিধার সদ্ব্যবহার করলে তারাও সমাজের মূল স্রোতে অবদান রাখতে পারে। আপনার পরিবারে বা পরিচিত কেউ যদি এই সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হয়, তবে আজই তাকে স্থানীয় সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করতে বলুন।

তথ্যসূত্র: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশিকা ।

Leave a Comment