চাকরি জীবনের অন্যতম আনন্দদায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো নতুন কর্মস্থলে যোগদান। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রথম কাজটিই হলো যথাযথ নিয়ম মেনে একটি যোগদান পত্র (Joining Letter) জমা দেওয়া।
অনেক সময় সঠিক নিয়ম না জানার কারণে যোগদান পত্রে ছোটখাটো ভুল থেকে যায়, যা ভবিষ্যতে এমপিও (MPO) বা সার্ভিস বুকে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এই আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে জানাবো কিভাবে নির্ভুলভাবে একটি প্রফেশনাল যোগদান পত্র লিখতে হয়।
এক নজরে: যোগদান পত্রে কী কী থাকতে হবে?
একটি আদর্শ যোগদান পত্রে অবশ্যই নিচের বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে থাকতে হবে:
- তারিখ: যে দিন যোগদান করবেন (সাধারণত যেদিন স্কুলে উপস্থিত হবেন)।
- বরাবর: উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পদবী (প্রাথমিকের ক্ষেত্রে উপজেলা শিক্ষা অফিসার, হাইস্কুলের ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক/সুপার)।
- মাধ্যম (Via): যার মাধ্যমে চিঠিটি পাঠাবেন (সাধারণত প্রতিষ্ঠান প্রধান)।
- বিষয়: সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান প্রসঙ্গে।
- সূত্র (Reference): আপনার নিয়োগপত্রের স্মারক নম্বর ও তারিখ।
- মূল বক্তব্য: যোগদানের সময় হিসেবে ‘পূর্বাহ্ণ’ (Forenoon) উল্লেখ করা।
সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান পত্র লেখার নিয়ম
একটি ফরমাল যোগদান পত্র লেখার সময় আবেগের চেয়ে তথ্যের সটিিকতা বেশি জরুরি। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
১. প্রাপক নির্বাচন
- প্রাথমিক বিদ্যালয়: সরকারি প্রাথমিকের ক্ষেত্রে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস হলেও, যোগদান পত্র লিখতে হয় উপজেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর।
- উচ্চ বিদ্যালয়/মাদ্রাসা (NTRCA): এক্ষেত্রে সাধারণত প্রধান শিক্ষক বা সুপার বরাবর সরাসরি লিখতে হয়।
২. সঠিক মাধ্যম
সরকারি চাকরিতে চেইন অব কমান্ড খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি সরাসরি বড় অফিসারের কাছে চিঠি দিতে পারেন না।
- প্রাথমিকে লিখবেন: মাধ্যম: প্রধান শিক্ষক (আপনার নতুন স্কুলের)।
- হাইস্কুল/মাদ্রাসায় সরাসরি প্রধানের কাছে লিখলে মাধ্যমের প্রয়োজন নেই।
৩. সূত্র বা রেফারেন্স
এটি যোগদান পত্রের প্রাণ। আপনাকে যে নিয়োগপত্রটি ইস্যু করা হয়েছে, তার ওপরে একটি দীর্ঘ স্মারক নম্বর (Memo No) এবং তারিখ থাকে। এটি হুবহু উল্লেখ করতে হবে।
৪. যোগদানের সময় (পূর্বাহ্ণ vs অপরাহ্ণ)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি চাকরিতে দিনের প্রথমার্ধে (দুপুর ১২টার আগে) জয়েন করলে লিখতে হয় ‘পূর্বাহ্ণ’। কখনোই ‘সকাল’ বা ‘দুপুর’ লিখবেন না।
সহকারী শিক্ষক যোগদান পত্রের নমুনা
নিচে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং NTRCA কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য আলাদা দুটি ফরম্যাট দেওয়া হলো। আপনি আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী কপি করে নিতে পারেন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নমুনা
তারিখ: [আজকের তারিখ]
বরাবর,
উপজেলা শিক্ষা অফিসার
[উপজেলার নাম], [জেলার নাম]।
মাধ্যম: প্রধান শিক্ষক, [বিদ্যালয়ের নাম], [উপজেলা ও জেলা]।
বিষয়: সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান প্রসঙ্গে।
সূত্র: জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, [জেলার নাম]-এর স্মারক নং- [নিয়োগপত্রের স্মারক নম্বর], তারিখ: [নিয়োগপত্রের তারিখ]।
জনাব,
যথাবিহীত সম্মান প্রদর্শন পূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, গত [নিয়োগপত্রের তারিখ] তারিখে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরবর্তীতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, [জেলার নাম]-এর ইস্যুকৃত নিয়োগপত্র (সূত্রোক্ত স্মারক) মোতাবেক আমি অদ্য [আজকের তারিখ] রোজ [আজকের বার] পূর্বাহ্ণে আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন [স্কুলের নাম] বিদ্যালয়ে ‘সহকারী শিক্ষক’ পদে যোগদান করলাম।
এমতাবস্থায়, মহোদয়ের নিকট আকুল আবেদন, আমার উক্ত যোগদান পত্রটি গ্রহণ করে আমাকে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের সুযোগ দানে বাধিত করবেন।
বিনীত,
(আপনার স্বাক্ষর)
[আপনার নাম]
সহকারী শিক্ষক (নবনিয়োজিত)
রোল নম্বর: [আপনার রোল নম্বর]
মোবাইল: [আপনার নম্বর]
উচ্চ বিদ্যালয় বা দাখিল মাদ্রাসার জন্য নমুনা (NTRCA)
(আপনার আপলোড করা ইমেজের রেফারেন্স অনুযায়ী)
তারিখ: [আজকের তারিখ]
বরাবর
সুপার/প্রধান শিক্ষক
[প্রতিষ্ঠানের নাম]
[ঠিকানা, যেমন: হাটখোলা, বরিশাল সদর, বরিশাল]।
বিষয়: সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি/আপনার বিষয়) পদে যোগদানের জন্য আবেদন।
জনাব,
যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী [নিয়োগপত্রের তারিখ] ইং তারিখে আপনার প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক ([আপনার বিষয়]) পদে নিয়োগের জন্য NTRCA থেকে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়ে বিগত [নিয়োগপত্রের প্রাপ্তি তারিখ] ইং তারিখে আপনার প্রদত্ত নিয়োগপত্রের মর্মে আজ [আজকের তারিখ] ইং তারিখ সহকারী শিক্ষক ([আপনার বিষয়]) পদে যোগদান করলাম।
সেমতে, মহোদয়ের সমীপে প্রার্থনা আমার যোগদান পত্র গ্রহণ পূর্বক যোগদানের পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহনে জনাবের নিকট মর্জি হয়।
বিনীত নিবেদক
(আপনার স্বাক্ষর)
[আপনার নাম]
সুপারিশ প্রাপ্ত শিক্ষক [কত তম?] গণবিজ্ঞপ্তি
ব্যাচ নং- [আপনার ব্যাচ]
রোল নং- [আপনার রোল]
মোবাইল: [আপনার নম্বর]
যোগদান পত্রের সাথে যেসব কাগজপত্র জমা দিতে হয়
শুধু যোগদান পত্র দিলেই হবে না, এর সাথে সাধারণত ১ সেট কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হয়। ফাইলের ওপরে একটি সূচিপত্র বা Checklist রাখা ভালো।
- নিয়োগপত্রের মূল কপি ও ফটোকপি।
- NTRCA বা পিএসসি’র সুপারিশপত্রের কপি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
- সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের সত্যায়িত কপি।
- জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) কপি।
- নাগরিকত্ব সনদ ও চারিত্রিক সনদ।
- স্বাস্থ্যগত ফিটনেস সনদ (সিভিল সার্জন কর্তৃক প্রদত্ত)।
- পুলিশ ভেরিফিকেশন ফর্মের কপি (যদি হাতে থাকে)।
সাধারণ কিছু ভুল যা এড়িয়ে চলবেন
অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, নতুন শিক্ষকরা প্রায়ই নিচের ভুলগুলো করেন:
- স্বাক্ষরে অমিল: আবেদন ফর্মে যে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন, যোগদান পত্রেও হুবহু সেই স্বাক্ষর দিন।
- সময়ে ভুল: দুপুর ১২টার পর স্কুলে পৌঁছালে টেকনিক্যালি সেটি ‘অপরাহ্ণ’ হয়ে যায়। তাই চেষ্টা করবেন সকাল ১০টা-১১টার মধ্যে স্কুলে উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষর করতে এবং ‘পূর্বাহ্ণ’ লিখতে।
- স্মারক নম্বর ভুল করা: নিয়োগপত্রের স্মারক নম্বরের একটি ডিজিট ভুল হলেও ভবিষ্যতে বেতন হতে সমস্যা হতে পারে। একাধিকবার মিলিয়ে নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন: যোগদান পত্রে কি কম্পিউটার টাইপ বাধ্যতামূলক নাকি হাতে লেখা যাবে?
উত্তর: এটি হাতে লেখা এবং কম্পিউটার টাইপ উভয়ই গ্রহণযোগ্য। তবে বর্তমান সময়ে কম্পিউটারে টাইপ করে এফোর (A4) সাইজের কাগজে প্রিন্ট করাটাই বেশি প্রফেশনাল এবং মার্জিত।
প্রশ্ন: ‘পূর্বাহ্ণ’ মানে কী?
উত্তর: পূর্বাহ্ণ মানে হলো দিনের প্রথম ভাগ (Before Noon)। সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় এটি লিখতে হয় কারণ এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে আপনি ওই দিনের পূর্ণ কর্মঘণ্টা বা তার সিংহভাগ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রশ্ন: যোগদানের পর আমার করণীয় কী?
উত্তর: যোগদানের পর প্রধান শিক্ষক আপনার যোগদান পত্রটি গ্রহণ করে সিল ও স্বাক্ষর দেবেন। এরপর এটি উপজেলা শিক্ষা অফিসে পাঠাতে হবে। নিজের কাছে অবশ্যই রিসিভ কপি (Receive Copy) সংরক্ষণ করবেন।
শেষকথা
সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান আপনার জীবনের একটি নতুন অধ্যায়। এই যোগদান পত্রটি হলো সেই অধ্যায়ের প্রথম দলিল। তাই তাড়াহুড়ো না করে, ওপরের নিয়ম ও নমুনা অনুসরণ করে সতর্কতার সাথে পত্রটি তৈরি করুন। আপনার শিক্ষকতা জীবন সফল ও আনন্দময় হোক!
এই আর্টিকেলটি কি আপনার উপকারে এসেছে? যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, কমেন্ট করে জানাতে পারেন।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।