সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে “ফিডিং কর্মসূচি” প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহকৃত খাবারের (বনরুটি, ডিম, কলা, দুধ, বিস্কুট) মান নিশ্চিত করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৩ মে ২০২৬ তারিখে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। পচা ও নিম্নমানের খাবার সরবরাহ রোধে প্রধান শিক্ষকদের খাবার গ্রহণের পূর্বেই কঠোরভাবে গুণগত মান, প্যাকেজিং, মেয়াদ এবং নির্দিষ্ট ওজন (যেমন- বনরুটি ১২০ গ্রাম) যাচাই করতে বলা হয়েছে। নিম্নমানের খাবার গ্রহণ করলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের মাঝে সরবরাহ করা খাবারের মান নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ ওঠে। এর প্রেক্ষিতে কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় (mopme.gov.bd) একটি কঠোর পরিপত্র জারি করেছে।
আপনি যদি একজন শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হয়ে থাকেন, তবে এই নতুন নির্দেশিকাগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। চলুন, এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
কেন এই নতুন নির্দেশনা জারি করা হলো?
“সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন উপজেলা থেকে অভিযোগ আসে যে, শিক্ষার্থীদের মাঝে পচা বনরুটি, পচা ডিম, আকারে ছোট এবং দাগযুক্ত পচা কলা বিতরণ করা হচ্ছে।
এ ধরনের নিম্নমানের ও মানহীন খাদ্য সরবরাহের ফলে একদিকে যেমন সরকারের মহৎ এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কোমলমতি শিশুদের মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই খাবারের মান নিশ্চিতে প্রধান শিক্ষকদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করে নতুন নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে।
প্রধান শিক্ষকদের করণীয় ও খাবার যাচাইয়ের নিয়মাবলি
খাবার গ্রহণ ও বিতরণের পূর্বে সরবরাহকারীর দেওয়া খাবারের মান ও পরিমাণ স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক আছে কিনা, তা প্রধান শিক্ষককে নিশ্চিত করতে হবে। যাচাইয়ের প্রধান বিষয়গুলো নিচে ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো:
১. বনরুটি বা পাউরুটি যাচাইয়ের নিয়ম
- তাজাত্ব ও অবস্থা: বনরুটি অবশ্যই তাজা, নরম এবং সঠিকভাবে মোড়কজাত হতে হবে।
- প্যাকেজিং: প্যাকেজিং সম্পূর্ণ অক্ষত, ছিঁড়ে যাওয়া বা আর্দ্রতা মুক্ত হতে হবে। কোনোভাবেই পচন, ফাঙ্গাস বা দুর্গন্ধযুক্ত রুটি গ্রহণ করা যাবে না।
- ওজন ও মেয়াদ: প্যাকেটের গায়ে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বনরুটির নেট ওজন অবশ্যই ১২০ গ্রাম হতে হবে।
২. ডিম ও কলা যাচাইয়ের নিয়ম
- ডিম: ডিমের ক্ষেত্রে ফাটা, দুর্গন্ধযুক্ত, পিচ্ছিলতা বা কোনো ধরনের দৃশ্যমান দূষণ আছে কিনা তা ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
- কলা: কলা হতে হবে দাগহীন ও পোকামুক্ত। অতিরিক্ত পাকা, আকারে খুব ছোট বা পচা কলা কোনোভাবেই গ্রহণ বা শিশুদের মাঝে বিতরণ করা যাবে না।
৩. দুধ ও ফর্টিফাইড বিস্কুট যাচাইয়ের নিয়ম
- ইউএইচটি (UHT) মিল্ক এবং ফর্টিফাইড বিস্কুটের ক্ষেত্রে প্যাকেজিং সম্পূর্ণ অক্ষত থাকতে হবে।
- প্যাকেটের গায়ে উৎপাদন তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নির্দিষ্ট নেট ওজন উল্লেখ আছে কিনা তা সতর্কতার সাথে যাচাই করে নিতে হবে।
সঠিক সময়ে বিতরণ ও সংরক্ষণ
খাবার শুধু ভালো হলেই হবে না, তা সঠিক নিয়মে বিতরণ ও সংরক্ষণও করতে হবে:
- কার্যাদেশ বা কল অফ অনুযায়ী নির্ধারিত তারিখ ও সময়েই খাবার গ্রহণ এবং বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে।
- খাদ্যদ্রব্যের ধরন অনুযায়ী বিদ্যালয় পর্যায়ে উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে দীর্ঘক্ষণ রাখলেও খাবারের গুণগত মান ঠিক থাকে।
নিয়ম অমান্য করলে বা নিম্নমানের খাবার পেলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
সরবরাহকৃত খাদ্যসামগ্রী যাচাই না করে কোনোভাবেই গ্রহণ করা যাবে না। যদি কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বা ত্রুটিপূর্ণ খাবার সরবরাহ করে, তবে:
- সেই খাবার তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং কোনোভাবেই গ্রহণ করা যাবে না।
- বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।
- খাবার যাচাই ও গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও কোনো প্রকার গাফিলতি, শৈথিল্য ও অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় মামলা ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফিডিং কর্মসূচির খাবার কারা যাচাই করবেন?
ফিডিং কর্মসূচির আওতায় সরবরাহকৃত খাবার বিদ্যালয়ে গ্রহণের পূর্বে তা সঠিকভাবে যাচাই করার মূল দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের ওপর অর্পণ করা হয়েছে।
২. প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরবরাহকৃত বনরুটির ওজন কত হতে হবে?
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, প্যাকেটের গায়ে উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখসহ বনরুটির নেট ওজন অবশ্যই ১২০ গ্রাম উল্লেখ থাকতে হবে এবং ওজনে সঠিক হতে হবে।
৩. স্কুলে পচা বা নিম্নমানের খাবার দিলে কী করণীয়?
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের খাবার দিলে তা গ্রহণ করা যাবে না এবং প্রধান শিক্ষককে সাথে সাথেই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
- আর্টিকেল আপডেট তারিখ: ১৬ মে, ২০২৬
- তথ্যসূত্র: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা-১ শাখা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার (www.mopme.gov.bd)।
- লেখক: কন্টেন্ট ডেস্ক, অভিজ্ঞ এসইও ও তথ্য বিশ্লেষক দল।
(এই আর্টিকেলটি সরকারি পরিপত্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সহজ ভাষায় লেখা হয়েছে।)

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।