সরকারি চাকরিতে ‘প্রেষণ’ বা ‘Deputation’ একটি অতি পরিচিত শব্দ। এটি মূলত একজন কর্মচারীকে তার নিজস্ব পদ বা কর্মবিভাগ থেকে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ীভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়। এতে কর্মচারীর কাজের অভিজ্ঞতা যেমন বাড়ে, তেমনি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন সহজ হয়।
প্রেষণ (Deputation) কী?
সহজ ভাষায়, ‘প্রেষণ’ হলো কোনো সরকারি কর্মচারীকে তার নিজস্ব পদ বা নিয়মিত পদায়নযোগ্য কর্মবিভাগ থেকে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সরকারি বিভাগে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া । এই নিয়োগ সম্পূর্ণ অস্থায়ী এবং সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হয়ে থাকে।
কারা প্রেষণে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য?
প্রেষণে যাওয়ার জন্য সকল সরকারি কর্মচারী যোগ্য নন। বিধিমালার ৪ নম্বর বিধি অনুযায়ী এর জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত রয়েছে:
- শুধুমাত্র সরকারের স্থায়ী পদে নিয়োজিত কর্মচারীরাই প্রেষণে যেতে পারেন ।
- প্রেষণে যাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো কর্মচারীর চাকরি অবশ্যই স্থায়ী হতে হবে ।
প্রেষণে নিয়োগযোগ্য প্রতিষ্ঠানসমূহ
সরকারি কর্মচারী প্রেষণ বিধিমালা, ২০২০ অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মচারীকে নিম্নোক্ত স্থানগুলোতে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে:
- সরকারি সংস্থা, দপ্তর, অধিদপ্তর বা পরিদপ্তর ।
- সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কর্পোরেশন ।
- স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ।
- আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং কোম্পানি আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ।
- জনস্বার্থে গৃহীত সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প এবং বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনসমূহ ।
প্রেষণ পদের গ্রেড ও সময়কাল সংক্রান্ত নিয়ম
প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে পদমর্যাদা এবং মেয়াদের ব্যাপারে কড়াকড়ি নিয়ম রয়েছে:
- মেয়াদ: একজন সরকারি কর্মচারীকে একাধারে একই পদে সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বছরের জন্য প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া যায় ।
- উচ্চতর গ্রেড: কোনো কর্মচারীকে তার নিজ বেতন গ্রেডের চেয়ে এক ধাপ উচ্চ পদ বা গ্রেডে স্ববেতনে প্রেষণে পাঠানো যেতে পারে ।
- নিম্নতর গ্রেড: বিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীকে তার নিজস্ব গ্রেডের চেয়ে নিচে বা নিম্নতর গ্রেডে প্রেষণে পাঠানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ।
প্রেষণে থাকাকালীন সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা
প্রেষণে থাকাকালীন কর্মচারীর সুযোগ-সুবিধা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে:
- নিজস্ব পদে কর্মরত থাকলে যে সকল সুবিধা পাওয়া যেত, প্রেষণে থাকা অবস্থায় তা অব্যাহত থাকবে ।
- প্রকল্প বা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে থাকলে প্রতিষ্ঠানের বিধান অনুযায়ী অতিরিক্ত প্রকল্প বা প্রশিক্ষণ ভাতা বা কর্মপ্রেরণা ভাতা পাওয়া যেতে পারে ।
বিশেষ অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রসমূহ
কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রেষণে পদায়নে বিশেষ যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়:
১. প্রকল্পের ক্ষেত্রে: প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর মৌলিক প্রশিক্ষণ বা উচ্চতর ডিগ্রিধারী এবং সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় ।
২. প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে: উচ্চতর বৈদেশিক ডিগ্রি, ভালো একাডেমিক রেজাল্ট এবং সুনামের অধিকারী কর্মচারীরা অগ্রাধিকার পান । তবে যাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক বা বিভাগীয় ব্যবস্থা চলমান রয়েছে, তারা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন পাবেন না ।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বিধিমালার ৮ নম্বর বিধি অনুযায়ী একই পদে একাধারে ৫ বছরের বেশি প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া যাবে না । তবে বিশেষ প্রয়োজনে বা জনস্বার্থে সরকার বিধি শিথিল করতে পারে।
না, বিধিমালার স্পষ্ট শর্ত হলো কর্মচারীর চাকরি অবশ্যই স্থায়ী হতে হবে ।
প্রেষণে নিয়োগ ও পদায়ন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপর ন্যস্ত থাকে ।
উপসংহার
সরকারি কর্মচারী প্রেষণ বিধিমালা একজন কর্মচারীর ক্যারিয়ার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি যেমন পেশাদার দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়, তেমনি সুশাসনের স্বার্থে বিভিন্ন সংস্থাকে অভিজ্ঞ জনবল দিয়ে সহায়তা করে। সঠিক নিয়ম ও তথ্য জেনে প্রেষণে পদায়ন আপনার পেশাগত জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তাবিত ও প্রেরিত ‘সরকারি কর্মচারী প্রেষণ বিধিমালা, ২০২০’ ।
- সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ ।
সর্বশেষ আপডেট: ১ জানুয়ারি, ২০২৬

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।