সরকারি সকল রাজস্ব ও প্রাপ্তি ‘এ-চালান’ (A-Challan) এর মাধ্যমে জমাদান বাধ্যতামূলক

এ-চালান (A-Challan) কী এবং নতুন নিয়মটি কী? > এ-চালান হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যার মাধ্যমে যেকোনো সরকারি রাজস্ব, ফি ও প্রাপ্তি সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত সরকারি ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (TSA) জমা দেওয়া হয়। গত ১৮ মে ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত নতুন পরিপত্র অনুযায়ী, আগামী ০১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন থেকে সরকারি সকল প্রাপ্তি ১০০% অনলাইন ‘এ-চালান’ ব্যবস্থার মাধ্যমে জমা করা বাধ্যতামূলক এবং কোনো দপ্তর নিজস্ব বা পৃথক বাণিজ্যিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকারি অর্থ আটকে রাখতে পারবে না।

ভূমিকা: কেন এই নতুন পরিপত্র?

বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং রিয়েল-টাইম (Real-Time) করার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্র জারি করেছে। বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ৫৬ ডিজিটের কোডের মাধ্যমে এ-চালান পদ্ধতি চালু থাকলেও অনেক সরকারি দপ্তর আইন বহির্ভূতভাবে নিজস্ব নামে আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সরকারি অর্থ জমা রাখছিল।

এর ফলে সরকারের আর্থিক স্থিতির প্রকৃত হিসাব পাওয়া কঠিন হচ্ছিল এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছিল। এই সমস্যা সমাধানে এবং ঋণের সুদজনিত ব্যয় হ্রাসের জন্য সরকার ম্যানুয়াল পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছে।

এ-চালান (A-Challan) বাধ্যতামূলক করার সরকারি ৩টি মূল সিদ্ধান্ত

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট ৩টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে:

  1. ম্যানুয়াল চালান সম্পূর্ণ বন্ধ (১ জুলাই ২০২৬): আগামী ০১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে প্রচলিত সনাতন বা ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি সব রাজস্ব ও প্রাপ্তি শতভাগ ‘এ-চালান’ এর মাধ্যমে জমা করতে হবে।
  2. স্বতন্ত্র বা বিকল্প সিস্টেম বাতিল: বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা অধিদপ্তরসহ যেকোনো অধীনস্থ অফিসে নিজস্ব কোনো প্রাপ্তি আদায় বা জমার আলাদা অনলাইন বা ম্যানুয়াল সিস্টেম থাকলে, তা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
  3. বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থ স্থানান্তর (৩০ জুন ২০২৬): বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নামে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে জমা থাকা সমস্ত সরকারি অর্থ আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে আবশ্যিকভাবে ‘এ-চালান’ ও নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কোড ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত সরকারের কেন্দ্রীয় অ্যাকাউন্টে (TSA) স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে।

এ-চালান ব্যবহারের সুবিধা কী কী?

গ্রাহক এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এ-চালান ব্যবহারের প্রধান সুবিধাসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  • রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং: টাকা জমা দেওয়ার সাথে সাথে তা সরকারি কোষাগারে বা ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (TSA) ক্রেডিট হয়।
  • প্রতারণা ও জালিয়াতি রোধ: ম্যানুয়াল চালানের মতো ভুয়া সিল বা জাল রসিদ তৈরির কোনো সুযোগ নেই। বারকোড ও ভেরিফিকেশন কোডের মাধ্যমে চালানের সত্যতা তাৎক্ষণিক যাচাই করা যায়।
  • সহজ পেমেন্ট গেটওয়ে: দেশের যেকোনো সিডিউলড বাণিজ্যিক ব্যাংক, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ ইত্যাদি) এর মাধ্যমে টাকা জমা দেওয়া যায়।
  • অর্থনৈতিক কোডের সঠিক ব্যবহার: নির্দিষ্ট ৫৬ ডিজিটের অর্থনৈতিক কোড ব্যবহারের ফলে সঠিক খাতেই টাকা জমা নিশ্চিত হয়।

কিভাবে অনলাইন ‘এ-চালান’ (A-Challan) পূরণ ও জমা করবেন? (স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড)

অনলাইনে সরকারি যেকোনো ফি বা রাজস্ব জমা দেওয়ার সহজ প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:

  1. ওয়েবসাইটে প্রবেশ: প্রথমে এ-চালানের অফিসিয়াল পোর্টাল (চালান নম্বর বা কোড যাচাইয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট উইন্ডো) অথবা সরাসরি A-Challan Portal বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এ-চালান অপশনে যান।
  2. আদায়ের প্রকৃতি নির্বাচন: আপনি কোন খাতের টাকা জমা দিচ্ছেন (যেমন: পাসপোর্ট ফি, আয়কর, ভ্যাট, সরকারি পরীক্ষার ফি বা ল্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) তা সিলেক্ট করুন।
  3. কোড ও বিবরণ প্রদান: সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কোড সাবধানে ইনপুট দিন।
  4. ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ: যার নামে চালান জমা হচ্ছে তার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর এবং মোবাইল নম্বর সঠিকভাবে লিখুন।
  5. পেমেন্ট সম্পন্নকরণ: মোবাইল ব্যাংকিং, নেট ব্যাংকিং বা কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
  6. চালান ডাউনলোড: পেমেন্ট সফল হওয়ার পর সাথে সাথে কম্পিউটার বা মোবাইলে ডিজিটাল এ-চালানের কপি (PDF) ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে রাখুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর

১. ম্যানুয়াল চালান কি এখনো গ্রহণযোগ্য?

উত্তর: ১৮ মে ২০২৬ এর পরিপত্র অনুযায়ী, আগামী ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কিছু ক্ষেত্রে চললেও, ০১ জুলাই ২০২৬ থেকে ম্যানুয়াল চালান সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল বলে গণ্য হবে।

২. সরকারি ফি জমা দেওয়ার পর এ-চালান কিভাবে ভেরিফাই বা যাচাই করব?

উত্তর: এ-চালান পোর্টালের “Verify Challan” বা “চালান যাচাই” অপশনে গিয়ে চালানের ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর বা বারকোড নম্বর ইনপুট দিয়ে মুহূর্তেই চালানের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।

৩. কোনো সরকারি অফিস কি নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফি নিতে পারবে?

উত্তর: না। নতুন পরিপত্রের সিদ্ধান্ত (খ) ও (গ) অনুযায়ী, কোনো দপ্তর আলাদা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা নিজস্ব সিস্টেমে সরকারি অর্থ জমা রাখতে পারবে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকে থাকা আগের সব টাকাও ৩০ জুন ২০২৬ এর মধ্যে কেন্দ্রীয় অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে।

৪. মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কি এ-চালানের টাকা দেওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে বিকাশ, রকেট, নগদ, উপায়সহ প্রধান প্রধান মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের (MFS) মাধ্যমে এ-চালানের ফি পরিশোধ করা যায়।

শেষকথা

সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট ইকোনমি গড়ার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। ম্যানুয়াল চালানের ভোগান্তি ও জালিয়াতি দূর করে শতভাগ ‘এ-চালান’ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন দেশের সাধারণ মানুষের সময় বাঁচাবে এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। তাই যেকোনো সরকারি ফি প্রদানের ক্ষেত্রে সময় থাকতেই অনলাইন এ-চালান পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়া জরুরি।

Leave a Comment