রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অধ্যাদেশ ২০২৬

ঢাকা, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ কিংবা গাজীপুরে আপনার কি জমি বা বাড়ি আছে? অথবা আপনি কি নতুন ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করছেন? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর রয়েছে। ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরকার “রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬” জারি করেছে

১৯৫৩ সালের পুরনো আইন বাতিল করে এই নতুন আইনটি করা হয়েছে, যা আপনার সম্পত্তির ব্যবহার, ইমারত নির্মাণ এবং জমি কেনাবেচায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে । আসুন, সহজ বাংলায় জেনে নিই এই আইনের খুঁটিনাটি এবং আপনার করণীয়।

নতুন এই আইনে কী আছে?

রাজউক অধ্যাদেশ ২০২৬ হলো ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য প্রণীত নতুন আইন। এর মূল লক্ষ্য হলো অপরিকল্পিত নগরায়ন রোধ করা এবং পরিবেশ রক্ষা করা। এই আইনের আওতায় “এক পরিবার, এক প্লট” নীতি চালু করা হয়েছে , জলাশয় ভরাটে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং “উৎকর্ষ সাধন ফি” বা Betterment Fee নামে নতুন ফি চালু করা হয়েছে । এখন থেকে নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণ করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল বা ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে

এই আইন কোথায় কোথায় প্রযোজ্য হবে?

অনেকেই মনে করেন রাজউকের নিয়ম শুধু ঢাকা সিটির ভেতরে। কিন্তু নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী এর আওতা অনেক বিশাল। এটি প্রযোজ্য হবে:

  • ঢাকা মহানগরী
  • ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ ও সাভার উপজেলা
  • নারায়ণগঞ্জ জেলা
  • গাজীপুর জেলা
  • সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে অন্য কোনো এলাকা নির্ধারণ করলে সেখানেও ।

আপনার জন্য ৫টি বড় পরিবর্তন

নতুন অধ্যাদেশে বেশ কিছু আধুনিক ধারণা ও কঠোর নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে।

১. এক ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য একাধিক প্লট নিষিদ্ধ

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে। সরকারি সংস্থা থেকে কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবার একবারের বেশি প্লট বা ফ্ল্যাট পাবেন না

  • তথ্য গোপন করে একাধিক প্লট নিলে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে ।
  • দরিদ্র, ভূমিহীন এবং প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা প্লট বরাদ্দে অগ্রাধিকার পাবেন ।

২. উৎকর্ষ সাধন ফি (Betterment Fee) দিতে হবে

যদি কোনো এলাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প (যেমন মেট্রো রেল বা বড় রাস্তা) হওয়ার কারণে আপনার জমির দাম বেড়ে যায়, তবে রাজউক আপনার কাছে “উৎকর্ষ সাধন ফি” আদায় করতে পারবে । এটি জমির মালিকদের জন্য নতুন একটি খরচ।

৩. জলাশয় ও নিচু জমি ভরাটে কঠোর নিষেধাজ্ঞা

পরিবেশ রক্ষায় এবার আইন অত্যন্ত কঠোর। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো নিচু জমি ভরাট করা যাবে না। প্রাকৃতিক জলাধারের পানি প্রবাহে বাধা দিলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে

  • শাস্তি: প্রথমবার অপরাধে ২ বছরের জেল বা ২ লক্ষ টাকা জরিমানা। পরবর্তী প্রতিবার অপরাধের জন্য ১০ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে ।

৪. ডেভেলপমেন্ট রাইটস ট্রান্সফার (TDR)

এটি একটি আধুনিক ধারণা। যদি আপনার জমিটি “সংরক্ষিত এলাকা” (যেমন পার্ক বা হেরিটেজ জোন) হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং সেখানে নির্মাণ কাজ নিষিদ্ধ থাকে, তবে আপনি সেই জমির “উন্নয়ন স্বত্ব” (Development Rights) অন্য এলাকায় বিক্রি বা স্থানান্তর করতে পারবেন । অর্থাৎ, জমির মালিকানা থাকলেও সেখানে ভবন না বানিয়ে সেই সুবিধা অন্য জায়গায় নেওয়া যাবে।

৫. ল্যান্ড রি-ডেভেলপমেন্ট ও রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট

পুরান ঢাকা বা অপরিকল্পিত এলাকার জন্য “ভূমি পুনঃউন্নয়ন” এবং “ভূমি পুনর্বিন্যাস” পদ্ধতি আনা হয়েছে।

  • এলাকার ৬০% জমির মালিক একমত হলে জমিগুলো একীভূত করে নতুন পরিকল্পনায় প্লট ভাগ করা হবে ।
  • এর ফলে সরু রাস্তার সমস্যা দূর হবে এবং নাগরিক সুবিধা বাড়বে ।

ইমারত নির্মাণ ও নকশা অনুমোদন

বাড়ি করার সময় এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

  • অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ নিষেধ: রাজউক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটির অনুমোদন ছাড়া কোনো ইমারত নির্মাণ বা অপসারণ করা যাবে না ।
  • ড্যাপ (DAP) মানা বাধ্যতামূলক: বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP)-এ যে এলাকার জন্য যে নির্দেশনা আছে (যেমন আবাসিক বা বাণিজ্যিক), তা মেনেই ভবন করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটালে তা অপরাধ ।
  • ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি পরিবর্তন: আপনি চাইলেই আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিক করতে পারবেন না। এর জন্য যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে হবে এবং বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে ।

অপরাধ ও শাস্তির তালিকা (জরিমানা ও জেল)

আইন না মানলে কী হতে পারে, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

অপরাধের ধরনসম্ভাব্য শাস্তি
নকশা বহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ২ বছর জেল বা ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়
জলাশয়/নিচু জমি ভরাট (১ম বার)২ বছর জেল বা ২ লক্ষ টাকা জরিমানা
জমি ব্যবহারের উদ্দেশ্য পরিবর্তন২ বছর জেল বা ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা
নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে রাস্তা বন্ধ/নিরাপত্তা বেষ্টনী সরানো১ বছর জেল বা ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা
কর্তৃপক্ষের সীমানা প্রাচীর অপসারণ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা

সতর্কতা: এই অপরাধগুলো আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও এর বিচার করা যাবে

ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার ও ক্ষতিপূরণ

উন্নয়ন কাজের জন্য যদি কাউকে উচ্ছেদ হতে হয়, তবে এই আইনে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

  • ক্ষতিপূরণ: প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ বা পেশা হারানো ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে ।
  • পুনর্বাসন: ক্ষতিগ্রস্তদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হবে ।
  • আপত্তি জানানোর সুযোগ: কোনো প্রকল্প বা পরিকল্পনার বিষয়ে জনগনের আপত্তি থাকলে তা ৬০ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানানো যাবে এবং গণশুনানি হবে ।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. আমার জমিটি যদি ‘সংরক্ষিত এলাকা’য় পড়ে, আমি কি ক্ষতিপূরণ পাবো?

উত্তর: কৌশলগত পরিকল্পনায় কোনো জমি সংরক্ষিত ঘোষণা করা হলে (যেমন পার্ক বা জলাধার), মালিক সরাসরি ক্ষতিপূরণ নাও পেতে পারেন । তবে, আপনি “উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময়” (TDR) সুবিধার মাধ্যমে সেই জমির নির্মাণের অধিকার অন্য জায়গায় বিক্রি বা স্থানান্তর করতে পারবেন

২. আমি কি নিজের জমিতে ইচ্ছামতো ভবন করতে পারব?

উত্তর: না। আপনাকে অবশ্যই রাজউকের অনুমোদিত নকশা এবং বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP) মেনে চলতে হবে। আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন বা নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি ভবন করা যাবে না

৩. আগের আইনে করা কাজের কী হবে?

উত্তর: ১৯৫৩ সালের আইনে যা কিছু করা হয়েছে (যেমন আগের প্লট বরাদ্দ বা অনুমোদিত নকশা), তা এই নতুন আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে বৈধ বলে গণ্য হবে

৪. রাজউকের বিরুদ্ধে কি মামলা করা যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, যাবে। তবে মামলা করার অন্তত ১ মাস আগে রাজউককে লিখিত নোটিশ দিতে হবে, যেখানে অভিযোগের কারণ স্পষ্ট করতে হবে

আপনার করণীয়

রাজউক অধ্যাদেশ ২০২৬ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি যেমন কঠোর, তেমনি পরিকল্পিত নগরীর জন্য প্রয়োজনীয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার করণীয়:

  1. জমি কেনার আগে সেটি ড্যাপ (DAP) অনুযায়ী কোন জোনে পড়েছে তা যাচাই করুন।
  2. বাড়ি করার সময় নকশার কোনো ব্যত্যয় ঘটাবেন না।
  3. জলাশয় ভরাটের সাথে যুক্ত থাকবেন না।
  4. জমির মূল্য বাড়লে উৎকর্ষ ফি দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি রাখুন।

আপনার যদি এই আইন নিয়ে আরও কোনো প্রশ্ন থাকে বা আইনি জটিলতায় পড়েন, তবে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬।

Leave a Comment