সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি (GPMS) কী?
সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি বা GPMS (Governance Performance Monitoring System) হলো বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক প্রণীত একটি নিয়মিত, কাঠামোবদ্ধ ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা । সরকারের বিভিন্ন অফিসের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের সংযোগ স্থাপন এবং লক্ষ্যভিত্তিক ফলাফল অর্জন নিশ্চিত করাই এর মূল কাজ । ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এটি প্রথম প্রবর্তিত হয় এবং ২০২৬-২০২৭ অর্থবছর থেকে মন্ত্রণালয়/বিভাগের পাশাপাশি দপ্তর, সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের অফিসসমূহে (বিভাগ, জেলা ও উপজেলা) এটি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে ।
GPMS নির্দেশিকা ২০২৬-২৭ এর মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য GPMS-এ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছে:
- ৩ বছর মেয়াদি আবর্তক পরিকল্পনা: প্রত্যেক সরকারি অফিসকে একটি বাস্তবসম্মত ৩ (তিন) বছর মেয়াদি আবর্তক (Rolling) পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্রতি অর্থবছরের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকবে ।
- ধারাবাহিকতা রক্ষা: প্রতি অর্থবছরের শুরুতে আগের পরিকল্পনার সাথে নতুন একটি অর্থবছরের পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে ।
- ক্লাস্টারভিত্তিক মূল্যায়ন: মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে তাদের কাজের ধরন অনুযায়ী ৭টি গুচ্ছ বা ক্লাস্টারে ভাগ করে মূল্যায়ন করা হবে ।
- মাঠ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্তি: ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে উপজেলা পর্যায়ের অফিসসমূহের জন্যও একটি সরলীকৃত GPMS কাঠামো প্রবর্তন করা হয়েছে ।
GPMS-এর মূল কাঠামো এবং মানবণ্টন (Marks Distribution)
একটি পূর্ণাঙ্গ GPMS মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। এর মূল কাঠামোটি ৩টি সেকশনে বিভক্ত:
১. সেকশন ১: ভিশন, মিশন এবং ৩ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা (মান- ১০) এই সেকশনে সংশ্লিষ্ট অফিসের ভিশন ও মিশন উল্লেখ থাকে। নির্বাচনী ইশতেহার এবং সরকারি নীতির আলোকে আগামী ৩ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই পরিকল্পনার মূল্যায়নের জন্য ১০ নম্বর বরাদ্দ থাকে ।
২. সেকশন ২: কর্মসম্পাদন পরিকল্পনা (মান- ৮০) এটি হলো বিবেচ্য অর্থবছরের (যেমন: ২০২৬-২৭) মূল কর্মপরিকল্পনা । এর মান ৮০ এবং এটি ৪টি কর্মসম্পাদন ক্ষেত্রে বিভক্ত:
- সেবা প্রদান (Service Delivery) [মান ১০-৩০]
- নীতি ও সংস্কার কার্যক্রম (Policy and Reform Activity) [মান ১০-৩০]
- প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা (Institutional Capacity and Efficiency) [মান ১০-৩০]
- উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট ও অন্যান্য কার্যক্রম (Development Related and Other Activities) [মান ১০-৩০]
(নোট: ৪টি ক্ষেত্রের মোট মান কোনোভাবেই ৮০-এর বেশি হবে না ।)
৩. সেকশন ৩: কৌশলগত প্রতিবেদন বা Strategic Report (মান- ১০) বছর শেষে প্রতিটি অফিসকে তাদের গুণগত অর্জন, চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের সেবার মানোন্নয়ন নিয়ে একটি কৌশলগত প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। এটি সাধারণত ২০০০ থেকে ২২০০ শব্দের মধ্যে হয়ে থাকে । এর জন্য বরাদ্দকৃত মান ১০ ।
মাঠ পর্যায়ে (বিভাগ, জেলা ও উপজেলা) GPMS কীভাবে কাজ করবে?
২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে মাঠ প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
- GPMS টিম গঠন: উপজেলা ব্যতীত বিভাগীয়, আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ের প্রতিটি অফিসে একটি GPMS টিম থাকবে। টিমে একজন টিম লিডার এবং একজন ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকবেন ।
- উপজেলা পর্যায়ের সরলীকৃত কাঠামো: উপজেলার অফিসগুলোর জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ করা হয়েছে। সেখানে মূল্যায়ন সম্পূর্ণভাবে ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে বিবেচ্য অর্থবছরের কর্মসম্পাদন পরিকল্পনার বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে ।
- অনলাইন রিপোর্টিং: ত্রৈমাসিক ও ষান্মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদনসমূহ নিয়মিতভাবে ঊর্ধ্বতন অফিসে প্রেরণ করতে হবে ।
বিস্তারিত/মূল ফাইলটি দেখুন: GPMS-2026-27 Nirdeshika.pdf
সাধারণ জিজ্ঞাসাসমূহ
GPMS এর পূর্ণরূপ কী? GPMS-এর পূর্ণরূপ হলো Governance Performance Monitoring System, যার বাংলা অর্থ ‘সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি’ ।
GPMS-এর সেকশন ২-এ মোট কত নম্বর থাকে? GPMS-এর সেকশন ২ (কর্মসম্পাদন পরিকল্পনা)-এ মোট ৮০ নম্বর বরাদ্দ থাকে, যা ৪টি ভিন্ন ভিন্ন কর্মসম্পাদন ক্ষেত্রে বিভক্ত করে মূল্যায়ন করা হয় ।
কৌশলগত প্রতিবেদন (Strategic Report) কত শব্দের মধ্যে লিখতে হয়? মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং দপ্তর/সংস্থার জন্য কৌশলগত প্রতিবেদনটি ২০০০ থেকে ২২০০ শব্দের মধ্যে লিখতে হয় । তবে মাঠ পর্যায়ের অফিসের জন্য এটি ১০০০ থেকে ১২০০ শব্দের মধ্যে হতে হয় ।
উপজেলা পর্যায়ের GPMS-এর মানবণ্টন কেমন? উপজেলা পর্যায়ের GPMS-এর জন্য সেকশন ১ বা ৩ নেই। সেখানে ১০০ নম্বরের সম্পূর্ণ মূল্যায়নটি বিবেচ্য অর্থবছরের কর্মসম্পাদন পরিকল্পনার (সেকশন ২-এর অনুরূপ) ওপর ভিত্তি করে করা হয় ।
লেখকের মন্তব্য: সরকারি সেবা প্রদানে গতিশীলতা আনতে GPMS একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নির্দিষ্ট ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা ও নিয়মিত মূল্যায়নের ফলে এই পদ্ধতি বাংলাদেশের সরকারি সেবার মানকে আরও জনবান্ধব করে তুলবে।
তথ্যসূত্র: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ‘সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি (GPMS) প্রণয়ন, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন নির্দেশিকা, ২০২৬-২০২৭’।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।