রোজা রাখার নিয়ত মানে হলো রোজা রাখার মনের সংকল্প বা ইচ্ছা পোষণ করা। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয় মনে মনে রোজা রাখার সংকল্প করলেই নিয়ত আদায় হয়ে যায়। তবে অনেকে সেহরির পর নিচের আরবি দোয়াটি মুখে পড়েন:
নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম, মিন শাহরি রমাদানাল মুবারাক; ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু, ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।
রমজান মাস ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র মাস। এই মাসে প্রতিটি সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য রোজা রাখা ফরজ। রোজা শুরু হয় সেহরির মাধ্যমে এবং শেষ হয় ইফতারের মাধ্যমে। কিন্তু রোজাকে পরিপূর্ণ করতে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর তা হলো নিয়ত।
অনেকে জানতে চান: রোজার নিয়ত কীভাবে করতে হয়? আরবিতে করতে হবে নাকি বাংলায়? মুখে না বললে কি রোজা হবে? এই আর্টিকেলে সেই সব প্রশ্নের সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দেওয়া হয়েছে।
নিয়ত মানে কী এবং রোজায় এর গুরুত্ব কতটুকু?
নিয়ত শব্দের অর্থ হলো ইচ্ছা, সংকল্প বা মনের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা। ইসলামের দৃষ্টিতে যেকোনো ইবাদত সহিহ হওয়ার জন্য নিয়ত থাকা শর্ত। রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘প্রতিটি আমলের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের উপর।’ (বুখারি: ১, মুসলিম: ১৯০৭)
রোজার ক্ষেত্রেও নিয়ত ফরজ। তবে এই নিয়ত মূলত অন্তরের কাজ। অর্থাৎ, মনে মনে রোজা রাখার সংকল্প করলেই নিয়ত সম্পন্ন হয়ে যায়। মুখে আলাদা করে বলা বা নির্দিষ্ট আরবি বাক্য উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয়। (সূত্র: আল-বাহরুর রায়েক: ২/৪৫২; রাদ্দুল মুহতার: ৩/৩৩৯)
রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ)
বাংলাদেশে প্রচলিত রোজার নিয়তটি নিচে তিনটি অংশে দেওয়া হলো:
আরবি নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمْضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضَا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّل مِنِّى اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْم
বাংলা উচ্চারণ
নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম, মিন শাহরি রমাদানাল মুবারাক; ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু, ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।
বাংলা অর্থ
হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের তোমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ (নিয়্যত) করলাম। অতএব তুমি আমার পক্ষ থেকে (আমার রোযা তথা পানাহার থেকে বিরত থাকাকে) কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: এই প্রচলিত আরবি নিয়তটি কোনো সহিহ হাদিস বা ফিকহের মূল কিতাবে সরাসরি উল্লেখ নেই। তবে কেউ চাইলে এটি পড়তে পারেন—এতে কোনো সমস্যা নেই। মূল বিষয় হলো মনের সংকল্প।
রোজার নিয়ত কখন করতে হয়?
রমজানের ফরজ রোজার নিয়তের সময় নিয়ে ইসলামি ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে:
- রাতের যেকোনো সময় থেকে সেহরির শেষ পর্যন্ত নিয়ত করা যায়।
- সেহরি খাওয়া বা রোজার উদ্দেশ্যে ঘুম থেকে ওঠাটাও নিয়তের মধ্যে গণ্য।
- যদি রাতে নিয়ত করতে ভুলে যান বা দ্বিধা থাকে, তাহলে দিনের অর্ধেক সময় পার হওয়ার আগে (অর্থাৎ দুপুরের আগে) নিয়ত করা যাবে তবে শুধুমাত্র রমজানের ফরজ রোজার ক্ষেত্রে।
- কাজা রোজা, কাফফারার রোজা বা নির্দিষ্ট মানতের রোজার ক্ষেত্রে রাত থেকেই নিয়ত করা আবশ্যক।
রোজার নিয়ত কি শুধু আরবিতেই করতে হবে?
না। নিয়ত আরবিতে করা বাধ্যতামূলক নয়। নিয়ত হলো মনের সংকল্প। যা যেকোনো ভাষায় করা যায়। বাংলায় মনে মনে বলতে পারেন:
“আমি আজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রমজানের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম।”
এটুকুই যথেষ্ট। তবে যারা আরবিতে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তারা উপরের প্রচলিত আরবি নিয়তটি পড়তে পারেন।
বিভিন্ন ধরনের রোজার নিয়ত
নফল রোজার নিয়ত
নফল রোজার নিয়ত দুপুরের আগে করা যায়, যদি সেদিন ভোর থেকে কিছু পানাহার না করা হয়ে থাকে। বাংলায় বলতে পারেন:
“আমি আজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নফল রোজা রাখার নিয়ত করলাম।”
কাজা রোজার নিয়ত
আগের কোনো রমজানের ছেড়ে যাওয়া রোজার কাজা করার ক্ষেত্রে রাতেই নিয়ত করতে হবে। বলতে পারেন:
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগের রমজানের কাজা রোজা রাখার নিয়ত করলাম।”
নিয়ত না করলে কি রোজা হবে না?
নিয়ত ছাড়া রোজা সহিহ হয় না। তবে নিয়তের অর্থ মুখে কোনো বিশেষ বাক্য বলা নয়—বরং মনের সংকল্পই নিয়ত। কেউ যদি রোজার উদ্দেশ্যে সেহরি খান বা রোজার ইচ্ছায় ঘুম থেকে ওঠেন, সেটাই তার নিয়ত বলে গণ্য। আলাদা করে মুখে কিছু না বললেও রোজা আদায় হয়ে যাবে।
ইফতারের দোয়া (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ)
রোজা শেষে ইফতার করার সময় নিচের দোয়াটি পড়া সুন্নত:
আরবি: اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَ عَلَى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিকের মাধ্যমে ইফতার করছি। (আবু দাউদ: ২৩৫৮)
রোজাদার ইফতার করার সময় আরেকটি দোয়াও পড়তে পারেন (আবু দাউদ: ২৩৫৭):
উচ্চারণ: জাহাবাজ জামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।
অর্থ: পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং ইনশাআল্লাহ সাওয়াব স্থির হলো।
রোজায় কী করা যাবে, কী যাবে না
রোজা ভেঙে যায় যেসব কারণে
- ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে
- ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে
- স্বামী-স্ত্রীর মিলন হলে
- ধূমপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করলে
যেসব কারণে রোজা ভাঙে না
- অনিচ্ছাকৃত বমি হলে (সামান্য পরিমাণ)
- ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হলে
- চোখে বা কানে ওষুধ দিলে
- ভুলবশত পানাহার করলে (মনে পড়ামাত্র বিরত হতে হবে)
- মিসওয়াক ব্যবহার করলে
সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত রোজার সঠিক পদ্ধতি
- রাতে বা সেহরির আগে মনে মনে রোজার নিয়ত করুন।
- সুবহে সাদিক শুরুর আগেই সেহরি শেষ করুন।
- চাইলে প্রচলিত আরবি বা বাংলায় মুখে নিয়ত পড়তে পারেন।
- সারাদিন পানাহার, মিথ্যা, গিবত ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকুন।
- সন্ধ্যায় মাগরিবের আজানের পর ইফতারের দোয়া পড়ে ইফতার শুরু করুন।
কাদের উপর রোজা ফরজ এবং কারা রোজা না রাখতে পারবেন?
যাদের উপর রোজা ফরজ:
- প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) মুসলিম নারী ও পুরুষ
- শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তি
- মুকিম (যিনি নিজ শহরে অবস্থান করছেন) ব্যক্তি
যাদের রোজা রাখার বাধ্যবাধকতা নেই (পরে কাজা করতে হবে):
- মুসাফির (সফরে থাকা ব্যক্তি)
- অসুস্থ ব্যক্তি (সুস্থ হলে কাজা করবেন)
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা (প্রয়োজনে কাজা করবেন)
- হায়েয ও নেফাসে থাকা নারী (পরে কাজা ফরজ)
রমজানের রোজার ফজিলত ও গুরুত্ব
রোজার বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন: ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সূরা বাকারা: ১৮৩)
রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি: ৩৮, মুসলিম: ৭৬০)
সচরাচর জিজ্ঞাসা
না, মুখে বলা বাধ্যতামূলক নয়। মনে মনে রোজা রাখার সংকল্প থাকলেই নিয়ত আদায় হয়ে যায়। তবে মুখে বলতে চাইলে বলতে পারেন এতে কোনো সমস্যা নেই। সেহরি খাওয়াও রোজার নিয়তের মধ্যে গণ্য।
রমজানের ফরজ রোজার ক্ষেত্রে রাত থেকে দিনের অর্ধেক সময় পার হওয়ার আগ পর্যন্ত নিয়ত করা যায়। তবে কাজা, কাফফারা বা নির্দিষ্ট মানতের রোজার নিয়ত অবশ্যই রাতেই করতে হবে।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী প্রতিটি রোজার জন্য আলাদাভাবে নিয়ত করা উত্তম। তবে হানাফি মাজহাব মতে রমজানের শুরুতে একবার নিয়ত করলেও কিছু আলেমের মতে সেটা যথেষ্ট, কিন্তু প্রতিদিন নিয়ত নবায়ন করা বেশি নিরাপদ ও উত্তম।
হ্যাঁ, সেহরি না খেলেও রোজা হবে। তবে সেহরি খাওয়া সুন্নত এবং এতে রোজাদার সারাদিন সতেজ থাকেন। রাসুল (সা.) সেহরি খেতে উৎসাহিত করেছেন। (বুখারি: ১৯২৩)
না। নফল রোজা (যেমন সোমবার-বৃহস্পতিবারের রোজা, আশুরার রোজা, শাওয়ালের ছয়টি রোজা), কাজা রোজা, মানতের রোজা সবক্ষেত্রেই নিয়ত দরকার। নিয়মের বিস্তারিত উপরে আলোচনা করা হয়েছে।
না। ভুলে পানাহার করলে রোজা ভাঙে না। মনে পড়ামাত্রই বিরত হয়ে যেতে হবে এবং রোজা পূর্ণ করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘যে ভুলে পানাহার করে, সে যেন রোজা পূর্ণ করে—আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।’ (বুখারি: ১৯৩৩)
শেষ কথা
রোজা রাখার নিয়ত মানে জটিল কোনো আরবি বাক্য মুখস্থ করা নয়। এটি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখার অন্তরের সংকল্প। সেহরি খাওয়া বা রোজার উদ্দেশ্যে ওঠাই মূলত নিয়ত। প্রচলিত আরবি দোয়াটি পড়লে ভালো, না পড়লেও রোজা শুদ্ধ।
আল্লাহ আমাদের সকলের রোজা কবুল করুন এবং আমাদের তাকওয়া অর্জনের তওফিক দিন। আমিন।
📚 তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারি — হাদিস নং ১, ৩৮, ১৯২৩, ১৯৩৩
- সহিহ মুসলিম — হাদিস নং ৭৬০, ১৯০৭
- সুনান আবু দাউদ — হাদিস নং ২৩৫৭, ২৩৫৮
- আল-বাহরুর রায়েক: ২/৪৫২ | রাদ্দুল মুহতার: ৩/৩৩৯, ৩৪১
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৯৫ | আল-জাওহারুতুন নাইয়্যিরাহ: ১/১৭৬
- সূরা বাকারা: আয়াত ১৮৩

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।