১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২১২টি আসন জিতে সরকার গঠন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। এতে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী, ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী রয়েছেন।
কেন এই মন্ত্রিসভা ঐতিহাসিক?
প্রায় দুই দশক পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে। ২০০৬ সালের পর এই প্রথমবার বিএনপি সরকার গঠন করল। তারেক রহমান নিজেও এবারই প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
শপথ অনুষ্ঠানটি প্রথা ভেঙে বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়, যা নতুন সরকারের স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততার বার্তা দেয়।
বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রী পরিষদ ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী
| নাম | দায়িত্ব |
|---|---|
| তারেক রহমান | প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় |
পূর্ণমন্ত্রীর তালিকা ২০২৬ (২৫ জন)
| মন্ত্রীর নাম | মন্ত্রণালয় |
|---|---|
| মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর | স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় |
| আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী | অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় |
| সালাহউদ্দিন আহমদ | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| ইকবাল হাসান মাহমুদ | বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ |
| হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) | মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় |
| এ জেড এম জাহিদ হোসেন | নারী ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ |
| ড. খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট) | পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| আবদুল আওয়াল মিন্টু | পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন |
| কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ | ধর্ম মন্ত্রণালয় |
| মিজানুর রহমান মিনু | ভূমি মন্ত্রণালয় |
| নিতাই রায় চৌধুরী | সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় |
| খন্দকার আবদুল মুক্তাদির | বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট |
| আরিফুল হক চৌধুরী | শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় |
| আফরোজা খানম রিতা | বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন |
| শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি | তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় |
| আসাদুল হাবিব দুলু | স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ |
| মো. আসাদুজ্জামান | শিক্ষা মন্ত্রণালয় |
| জাকারিয়া তাহের | কৃষি মন্ত্রণালয় |
| দীপেন দেওয়ান | পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় |
| এ এন এম এহসানুল হক মিলন | মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ |
| সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন | প্রাথমিক ও গণশিক্ষা |
| ফকির মাহবুব আনাম | পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় |
| শেখ রবিউল আলম | সড়ক পরিবহন, সেতু ও রেলপথ |
| মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ (টেকনোক্র্যাট) | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি |
| জহির উদ্দিন স্বপন | গৃহায়ন ও গণপূর্ত |
নোট: মন্ত্রণালয় বণ্টন বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত এবং চূড়ান্ত গেজেটে সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।
প্রতিমন্ত্রীর তালিকা ২০২৬ (২৪ জন)
মন্ত্রিপরিষদের ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সবাই এবারই প্রথমবার এ দায়িত্ব পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
- মো. নুরুল হক নুর — গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন
- ইশরাক হোসেন — তরুণ নেতা, প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই প্রতিমন্ত্রী
- জোনায়েদ সাকি — গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী
- ববি হাজ্জাজ — ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) থেকে আসা
- মীর শাহে আলম — স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী
- এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত — বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী
- আমিনুল হক — বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
মন্ত্রিসভা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
মন্ত্রিসভার বৈশিষ্ট্য এক নজরে
- মোট সদস্য: ৫০ জন (প্রধানমন্ত্রীসহ ৫১)
- পূর্ণমন্ত্রী: ২৫ জন
- প্রতিমন্ত্রী: ২৪ জন
- টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী: ৩ জন
- শপথ তারিখ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- শপথস্থান: জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা
- শপথ পাঠ করান: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
নতুন মুখের সংখ্যা বেশি কেন?
২৫ জন পূর্ণমন্ত্রীর মধ্যে মাত্র ৯ জন আগে মন্ত্রী ছিলেন। বাকি ১৬ জন এবারই প্রথমবার এই দায়িত্ব পেয়েছেন। ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সবাই একেবারে নতুন।
এই কৌশলের পেছনে রয়েছে তিনটি কারণ:
১. প্রজন্মগত পরিবর্তন আনা — পুরনো ও নতুন প্রজন্মের নেতাদের একসাথে কাজ করানো ২. আন্দোলনের মুখেদের পুরস্কৃত করা — যারা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রেখেছিলেন ৩. জোট শরিকদের অন্তর্ভুক্ত করা — বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা
টেকনোক্র্যাট কোটায় কারা এলেন?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নন এমন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকেও মন্ত্রী করা যায়। এবার তিনজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী নিয়োগ পেয়েছেন:
১. ড. খলিলুর রহমান — পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
২. মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ — বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
৩. মো. আমিনুল হক — প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট)
কোন মন্ত্রণালয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এই মন্ত্রিসভায় কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টন বিশেষভাবে নজর কেড়েছে:
অর্থ ও পরিকল্পনা: আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দেওয়া হয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ জোড়া মন্ত্রণালয়। দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখন তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পররাষ্ট্র: টেকনোক্র্যাট ড. খলিলুর রহমানকে এই মন্ত্রণালয় দেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে নতুন সরকার কূটনৈতিক দক্ষতাকে রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সড়ক পরিবহন, সেতু ও রেলপথ: শেখ রবিউল আলমকে একই সাথে তিনটি বড় মন্ত্রণালয় দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে — তবে একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাধিক বিষয় রাখা প্রশাসনিক সমন্বয়ের জন্য করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ সম্পর্কে যা জানা দরকার
মন্ত্রিপরিষদ কীভাবে কাজ করে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির কাছে মন্ত্রীদের নাম সুপারিশ করেন এবং রাষ্ট্রপতি তাঁদের নিয়োগ দেন। মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ।
পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পার্থক্য কী?
- পূর্ণমন্ত্রী: মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তি। নীতিনির্ধারণ ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে অংশ নেন।
- প্রতিমন্ত্রী: পূর্ণমন্ত্রীর অধীনে কাজ করেন, বা স্বতন্ত্র দায়িত্বে থাকেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত।
মন্ত্রিসভা আপনার জীবনে কী প্রভাব ফেলবে?
সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে এই মন্ত্রিসভার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা যাক:
অর্থনীতি ও বাজার: নতুন অর্থমন্ত্রীর নীতি নির্ধারণের উপর নির্ভর করবে দ্রব্যমূল্য, টাকার মান ও বিনিয়োগ পরিবেশ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: নতুন শিক্ষামন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নীতি সরাসরি প্রভাব ফেলবে শিক্ষার্থী ও রোগীদের উপর।
কর্মসংস্থান: শ্রম মন্ত্রণালয়ের নতুন নেতৃত্ব শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মসংস্থানের পরিবেশ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
যোগাযোগ ও পরিবহন: সড়ক, সেতু ও রেল মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রী নিলেও যোগাযোগ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না, তা সময় বলবে।
সাধারণত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর
তারেক রহমান। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনি একই সাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি একই সাথে অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।
ড. খলিলুর রহমান। তিনি একজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন।
পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে একজন নারী আছেন- আফরোজা খানম রিতা, যিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন।
হ্যাঁ। মো. নুরুল হক নুর (ভিপি নুর) প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি।
বিএনপি সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় ছিল। প্রায় ২০ বছর পর তারা আবার সরকার গঠন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের প্রধান দুটি অগ্রাধিকার।
শেষকথা
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নতুন মন্ত্রী পরিষদ একটি বৈচিত্র্যময় ও বড় আকারের মন্ত্রিসভা। এতে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, তরুণ নেতা, টেকনোক্র্যাট এবং জোট শরিকদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জড়তা কাটিয়ে দ্রুত কার্যকর শাসন নিশ্চিত করা।
সূত্রসমূহ:
- প্রথম আলো (১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- TBS News Bangla (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- The Daily Star Bangla (১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- বাংলাদেশ প্রতিদিন (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাংলাদেশ — cabinet.gov.bd
এই আর্টিকেলের তথ্য সর্বশেষ প্রকাশিত গেজেট ও বিশ্বস্ত গণমাধ্যম সূত্রের উপর ভিত্তি করে তৈরি। মন্ত্রণালয় বণ্টনে সরকারি গেজেটের সাথে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।