বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য (MP) হওয়ার জন্য প্রধান দুটি যোগ্যতা হলো: প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স ন্যূনতম ২৫ বছর হতে হবে। এছাড়া কোনো শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে, কোনো আদালত কাউকে মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করলে, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে বা মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হলে তিনি এমপি হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। একজন এমপির মূল কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা, বাজেট ও রাষ্ট্রীয় অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাস্তাঘাট বা ব্রিজ বানানো নয়।
সংসদ সদস্য (MP) আসলে কারা এবং কেন এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ। আর জনগণ তাদের এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে একজন সংসদ সদস্য বা মেম্বার অব পার্লামেন্ট (MP) নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভোটাররা জানেন না যে একজন এমপির আসল কাজ কী। প্রার্থীরা নির্বাচনের আগে রাস্তাঘাট, ব্রিজ নির্মাণ বা চাকরি দেওয়ার যেসব প্রতিশ্রুতি দেন, তা মূলত তাদের কাজ নয়। এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অযোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচিত হন এবং জনগণ প্রতারিত হয়।
তাই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এমপি হওয়ার যোগ্যতা এবং তাদের প্রকৃত দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা (Qualifications of an MP)
বাংলাদেশের সংবিধানে এমপি হওয়ার যোগ্যতা খুব সহজ ও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মূলত দুটি প্রধান শর্ত পূরণ করলেই একজন ব্যক্তি এমপি নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেন:
- নাগরিকত্ব: প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের জন্মসূত্রে বা আইন অনুযায়ী নাগরিক হতে হবে।
- বয়সসীমা: প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা কি প্রয়োজন? সংবিধানে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য আলাদা কোনো শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতার কথা উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, অক্ষরজ্ঞানহীন বা স্বল্পশিক্ষিত যে কেউ বয়স ও নাগরিকত্বের শর্ত পূরণ করে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন।
সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্যতা (Disqualifications of an MP)
যোগ্যতার পাশাপাশি সংবিধানে কিছু অযোগ্যতার কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। নিচে উল্লেখিত কোনো কারণ থাকলে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হতে পারবেন না:
- মানসিক অক্ষমতা: কোনো উপযুক্ত আদালত যদি কাউকে মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ বা পাগল ঘোষণা করে।
- দ্বৈত নাগরিকত্ব: কোনো ব্যক্তির যদি বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকে।
- ফৌজদারি অপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ: যদি কোনো ব্যক্তি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হন বা বড় কোনো ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হন।
নোট: অনেক সময় তথ্য গোপন করে দ্বৈত নাগরিকত্ব সম্পন্ন প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়, যা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।
একজন সংসদ সদস্যের (MP) প্রকৃত কাজ কী?
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, এমপি মানেই এলাকার রাস্তা, ব্রিজ, স্কুল-কলেজ বা হাসপাতাল বানাবেন। কিন্তু সংবিধানে এমপির কাজকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সংবিধানে এমপির দায়িত্ব সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, জাতীয় সংসদের কাজের মাধ্যমেই তাদের দায়িত্ব নির্ধারিত হয়। একজন এমপির প্রধান তিনটি কাজ হলো:
আইন প্রণয়ন করা
সংসদ ছাড়া কোনো আইন পাস হতে পারে না। দেশের প্রতিরক্ষা, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলো কীভাবে চলবে, সেই বিষয়ক আইন ও নীতিমালা তৈরি করা এবং পাস করা এমপিদের প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব।
বাজেট ও রাষ্ট্রীয় অর্থ নিয়ন্ত্রণ
সরকার কোনো ধরনের কর আরোপ, বাজেট ব্যয় বা রাষ্ট্রীয় তহবিলের ব্যবহার সংসদের অনুমোদন ছাড়া করতে পারে না। এমপিরা সংসদে এই বাজেটের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিয়ে অনুমোদন দিয়ে থাকেন।
সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও সরকার সংসদের ওপর নির্ভরশীল। এমপিরা সংসদে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। সংসদ সদস্যদের সমর্থন হারালে সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়।
রাস্তাঘাট বানানো কি এমপির কাজ?
সংবিধানের কোথাও লেখা নেই যে, এমপি রাস্তা বানাবেন, ব্রিজ করবেন বা চাকরি দেবেন। এগুলো এমপির সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়।
- প্রকৃত দায়িত্ব কার? উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রশাসনিক দায়িত্ব হলো সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ (যেমন- এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ) এবং স্থানীয় সরকারের (যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা)।
- কেন এমপিরা এই প্রতিশ্রুতি দেন? ভোটাররা এমপির কাছে আইন প্রণয়নের পরিবর্তে এলাকার উন্নয়ন প্রত্যাশা করেন। তাই এমপিরাও বাস্তব রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য উন্নয়নের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন। এর ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এমপিরা এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্র: বাংলাদেশের এমপি হতে ন্যূনতম বয়স কত হতে হবে?
উ: বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য বা এমপি হতে হলে প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
প্র: এমপি হওয়ার জন্য কতটুকু শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে?
উ: বাংলাদেশের সংবিধানে এমপি হওয়ার জন্য আলাদা কোনো শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বয়স ২৫ বছর ও বাংলাদেশের নাগরিক হলেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায়।
প্র: দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে কি এমপি হওয়া যায়?
উ: না, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির যদি দ্বৈত নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) থাকে, তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
প্র: একজন এমপির মূল কাজগুলো কী কী?
উ: একজন এমপির মূল কাজ হলো সংসদে আইন প্রণয়ন করা, জাতীয় বাজেট অনুমোদন ও রাষ্ট্রীয় অর্থের তদারকি করা এবং সরকারের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। রাস্তাঘাট বা ব্রিজ বানানো সরাসরি এমপির কাজ নয়।
শেষকথা
গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে নাগরিকদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ভোট দেওয়ার সময় আমাদের উচিত প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, সততা এবং আইন প্রণয়নে তার সক্ষমতা বিবেচনা করা। তিনি এলাকার রাস্তায় কয়টি ইট বিছাবেন, তার চেয়ে বেশি জরুরি তিনি সংসদে গিয়ে দেশের স্বার্থে কতটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারবেন, তা নিশ্চিত করা।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।