| বাংলাদেশে বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তি ভাগ হয় ধর্মীয় আইন অনুযায়ী। মুসলিম পরিবারে শরিয়া (ফারায়েজ) আইন প্রযোজ্য। ছেলে পায় মেয়ের দ্বিগুণ অংশ, স্ত্রী পান ১/৮ ভাগ (সন্তান থাকলে), মা পান ১/৬ ভাগ। হিন্দু পরিবারে দায়ভাগ পদ্ধতিতে পুত্রই মূল উত্তরাধিকারী। সম্পত্তি ভাগের আগে বাবার সকল ঋণ ও দেনা পরিশোধ করতে হয়। |
বাবা মারা গেলে পরিবারে সম্পত্তি নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কে কতটুকু পাবে? মেয়ে কি পাবে? জামাই কি পাবে? জীবিত বাবা কি নিজের মত ভাগ করতে পারবেন? এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতেই এই গাইডটি তৈরি করা হয়েছে।
২০২৬ সালেও বাংলাদেশে বাবার সম্পত্তি ভাগের মূল আইনি কাঠামো একই মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং শরিয়া আইন (ফারায়েজ)। নতুন কোনো সংসদীয় সংশোধন না হলেও ই-নামজারি ও অনলাইন ভূমি সেবার কারণে প্রক্রিয়াটি এখন অনেক সহজ হয়েছে।
বাবার সম্পত্তি ভাগের আইনি ভিত্তি কী?
বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক উত্তরাধিকার আইন প্রচলিত। অর্থাৎ আপনি কোন ধর্মের মানুষ, সেটার উপর নির্ভর করে আপনার বাবার সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে।
| ধর্ম / সম্প্রদায় | প্রযোজ্য আইন |
| মুসলিম | মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ + শরিয়া (ফারায়েজ) |
| হিন্দু | হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (দায়ভাগ পদ্ধতি) |
| খ্রিস্টান | সাকসেশন অ্যাক্ট ১৯২৫ |
| বৌদ্ধ | হিন্দু আইন অনুযায়ী (রীতি অনুসরণ) |
| আদিবাসী / নৃ-গোষ্ঠী | নিজস্ব প্রথা ও রীতি |
মুসলিম পরিবারে বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম ২০২৬
বাংলাদেশের মুসলিম পরিবারে বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তি ভাগ হয় ফারায়েজ বা ইসলামি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী। এই আইনের মূল ভিত্তি কুরআনের সূরা নিসার ১১-১২ নম্বর আয়াত।
সম্পত্তি ভাগের আগে কী কী করতে হবে?
সম্পত্তি বণ্টনের আগে নিচের কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে এটা বাধ্যতামূলক:
- বাবার জানাজা ও দাফনের খরচ মেটাতে হবে
- বাবার সমস্ত ঋণ ও দেনা পরিশোধ করতে হবে (স্ত্রীর মোহরানাসহ)
- বাবা কোনো উইল (ওসিয়ত) করে গেলে মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ অংশ পর্যন্ত সেটি কার্যকর হবে
- উপরের সব কাজের পরে যা অবশিষ্ট থাকে, তাই ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে
কে কত অংশ পাবেন? (মুসলিম আইনে নির্ধারিত ভাগ)
| উত্তরাধিকারী | প্রাপ্য অংশ |
| স্ত্রী (সন্তান থাকলে) | ১/৮ অংশ |
| স্ত্রী (সন্তান না থাকলে) | ১/৪ অংশ |
| মা (সন্তান বা ভাই-বোন থাকলে) | ১/৬ অংশ |
| মা (সন্তান বা ভাই-বোন না থাকলে) | ১/৩ অংশ |
| পিতা (পুত্র থাকলে) | ১/৬ অংশ |
| পিতা (পুত্র না থাকলে) | ১/৬ + অবশিষ্টাংশ |
| এক কন্যা (পুত্র না থাকলে) | ১/২ অংশ |
| একাধিক কন্যা (পুত্র না থাকলে) | ২/৩ অংশ সমানভাবে |
| ছেলে ও মেয়ে একসাথে | ছেলে : মেয়ে = ২ : ১ অনুপাতে অবশিষ্টাংশ |
সহজ ভাষায়: ছেলেরা মেয়েদের দ্বিগুণ পায় এটাই ইসলামি আইনের মূল নিয়ম। কারণ ছেলেদের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয়, মেয়েরা সেই দায়িত্বমুক্ত।
উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক:
| উদাহরণ: করিম সাহেব মারা গেছেন। তিনি রেখে গেছেন ১ স্ত্রী, ২ ছেলে, ১ মেয়ে। |
| মোট সম্পত্তি: ৩০ শতাংশ জমি (ঋণ ও দেনা পরিশোধের পর)। |
| → স্ত্রী পাবেন: ৩০ × ১/৮ = ৩.৭৫ শতাংশ |
| → বাকি ২৬.২৫ শতাংশ ছেলে-মেয়ের মধ্যে ২:১ অনুপাতে ভাগ হবে। |
| → প্রতিটি ছেলে পাবে: ২/৫ × ২৬.২৫ = ১০.৫ শতাংশ |
| → মেয়ে পাবে: ১/৫ × ২৬.২৫ = ৫.২৫ শতাংশ |
মৃত ছেলে/মেয়ের সন্তানরা কি দাদার সম্পত্তি পাবে?
হ্যাঁ, এটি মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৪ অনুযায়ী সম্ভব। এই নীতিকে বলা হয় ‘প্রতিনিধিত্ব নীতি’।
| নিয়ম: বাবার সম্পত্তি বণ্টনের আগে যদি কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা যায়, তবে সেই মৃত ছেলে/মেয়ের সন্তানরা মিলে ঐ পরিমাণ সম্পত্তি পাবে, যা তাদের বাবা/মা জীবিত থাকলে পেতেন। |
| অর্থাৎ, নাতি-নাতনি দাদার সম্পত্তিতে তাদের মৃত বাবা/মায়ের ভাগটুকু পাওয়ার অধিকার রাখে। |
জামাই কি বাবার সম্পত্তি পাবে?
না। মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে জামাই কোনো অংশ পান না। মেয়ে তার নিজের ভাগটুকু পাবেন, কিন্তু জামাই সে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নন।
হিন্দু পরিবারে বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম
বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য দায়ভাগ পদ্ধতিতে সম্পত্তি ভাগ হয়। এই পদ্ধতিতে মূলত পুরুষ উত্তরাধিকারীরাই অগ্রাধিকার পান।
অগ্রাধিকারের ক্রম নিম্নরূপ:
- পুত্র
- পুত্রের পুত্র (নাতি)
- পুত্রের পুত্রের পুত্র (প্রনাতি)
- বিধবা স্ত্রী (জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ করতে পারেন, হস্তান্তর করতে পারেন না)
- কন্যা (উপরের কেউ না থাকলে — কুমারী কন্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়)
হিন্দু আইনে পুত্র থাকলে কন্যা সাধারণত সম্পত্তি পান না। তবে বিধবা মা মৃত স্বামীর সম্পত্তি জীবদ্দশায় ভোগ করতে পারেন।
খ্রিস্টান পরিবারে সম্পত্তি ভাগের নিয়ম
বাংলাদেশের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য সাকসেশন অ্যাক্ট ১৯২৫ প্রযোজ্য। এই আইনে ছেলে ও মেয়ে সমান অংশ পান। তবে বাবা যদি উইল করে যান, তাহলে উইল অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টিত হবে।
বাবার সম্পত্তি ভাগ করতে কোন কোন কাগজপত্র লাগে?
সম্পত্তি ভাগ করতে এবং নামজারি করতে নিচের কাগজপত্র প্রয়োজন:
- মৃত্যু সনদ (ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশন থেকে)
- ওয়ারিশ সনদ (উত্তরাধিকারী সনদ) — ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র স্বাক্ষরিত
- বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পুরনো ভোটার কার্ড
- জমির মূল দলিল (মালিকানা দলিল)
- খতিয়ান ও পর্চা (RS, BS, CS — প্রযোজ্য অনুযায়ী)
- নামজারির জন্য আবেদন ফর্ম (DC অফিস বা ই-নামজারি পোর্টাল — land.gov.bd)
- সকল উত্তরাধিকারীর NID কপি ও সম্মতি পত্র
🪜 ধাপে ধাপে বাবার সম্পত্তি ভাগ করার প্রক্রিয়া
- ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করুন — স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে
- মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করুন
- জমির খতিয়ান ও দলিল যাচাই করুন
- সকল ওয়ারিশ মিলে আলোচনা করুন এবং ভাগ নির্ধারণ করুন
- আপোষ বণ্টননামা দলিল তৈরি করুন ও রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশন করুন
- ই-নামজারির জন্য land.gov.bd পোর্টালে আবেদন করুন
- নামজারি সম্পন্ন হলে নতুন খতিয়ান পাবেন
গুরুত্বপূর্ণ: যদি কোনো ওয়ারিশ সম্মত না হন, তাহলে দেওয়ানি আদালতে ‘বণ্টনের মামলা’ দায়ের করতে হবে। আদালতের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, তাই পারিবারিকভাবে সমাধান করা সব সময় ভালো।
বাবার সম্পত্তি নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণা
| ভুল ধারণা | সঠিক তথ্য |
| মেয়েরা বাবার সম্পত্তি পায় না | মুসলিম আইনে মেয়েরা ছেলেদের অর্ধেক পায়, এটি বাধ্যতামূলক অধিকার |
| বাবা চাইলেই একজনকে সব দিতে পারেন | উইল করলে মাত্র ১/৩ অংশ দিতে পারেন ওয়ারিশ-বহির্ভূতকে |
| বিবাহিত মেয়ে সম্পত্তি পায় না | বিবাহিত হোক বা না হোক, মেয়ে সম্পত্তির অধিকারী |
| জামাই সম্পত্তির ভাগ পাবেন | না, জামাই উত্তরাধিকারী নন |
| নামজারি না করলে সমস্যা নেই | নামজারি না করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হয় |
| গর্ভস্থ শিশু সম্পত্তি পাবে না | গর্ভস্থ সন্তানকে জীবিত হিসেবে গণ্য করে সম্পত্তি রাখতে হবে |
বাবার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভাগ করা কি সম্ভব?
হ্যাঁ, বাবা জীবিত থাকতেও সম্পত্তি ভাগ করে দিতে পারেন এটাকে ‘হেবা’ (দান) বলে। তবে কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে:
- হেবা করতে হলে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে
- দানের সময় বাবা মানসিকভাবে সুস্থ ও স্বেচ্ছায় দান করছেন — এটি প্রমাণ রাখতে হবে
- মৃত্যুশয্যায় দান করলে সেটি উইল হিসেবে গণ্য হয় এবং মাত্র ১/৩ অংশই কার্যকর হয়
- জীবদ্দশায় দান করলে ওয়ারিশদের কেউ আইনিভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না (সাধারণত)
পিতার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার
মুসলিম আইনে নারীর সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত এবং বাধ্যতামূলক। কাউকে বঞ্চিত করা শরিয়া মতে গুনাহ এবং দেওয়ানি আইনে অপরাধ।
| মেয়েরা যে ভাগ পাওয়ার অধিকারী: |
| → এক মেয়ে (পুত্র না থাকলে): মোট সম্পত্তির ১/২ অংশ |
| → একাধিক মেয়ে (পুত্র না থাকলে): একত্রে ২/৩ অংশ, সমানভাবে |
| → ছেলে ও মেয়ে একসাথে: ২:১ অনুপাতে (ছেলে দ্বিগুণ) |
| → মা (সন্তান থাকলে): ১/৬ অংশ |
| → স্ত্রী (সন্তান থাকলে): ১/৮ অংশ |
কেউ যদি মেয়েকে তার ন্যায্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে, সেই মেয়ে পারিবারিক আদালত বা দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে পারবেন।
পাঠকদের সাধারণ প্রশ্নোত্তর
মুসলিম আইনে মেয়েরা ছেলেদের অর্ধেক পায়। তবে হিন্দু আইনে সাধারণত পুত্রই অগ্রাধিকার পান, আর খ্রিস্টান আইনে ছেলে-মেয়ে সমান পায়।
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছ থেকে (গ্রামাঞ্চলে) অথবা পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ পাওয়া যায়।
হ্যাঁ, সম্ভব। সকল ওয়ারিশ মিলে আলোচনা করে আপোষ বণ্টননামা দলিল তৈরি করতে পারেন এবং রেজিস্ট্রি করে নামজারি করলেই হয়। আদালতের দরকার নেই যদি সবাই একমত থাকেন।
হ্যাঁ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৪ অনুযায়ী মৃত ছেলে বা মেয়ের সন্তানরা তাদের মৃত বাবা/মায়ের ভাগটুকু পাওয়ার অধিকারী।
হ্যাঁ, বড় সমস্যা আছে। নামজারি না করলে আপনি সরকারিভাবে জমির মালিক হিসেবে স্বীকৃত পাবেন না। ভবিষ্যতে বিক্রি, বন্ধক বা হস্তান্তরে আইনি জটিলতা তৈরি হবে।
হ্যাঁ! বাংলাদেশ সরকারের উত্তরাধিকার অ্যাপ (উত্তরাধিকার.বাংলা) ব্যবহার করে সহজেই অনলাইনে হিসাব করা যায়। ওয়ারিশদের তথ্য দিলেই কার কত অংশ তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হয়ে আসে।
হ্যাঁ, পাওয়া যাবে। তবে ওকালতনামা (Power of Attorney) দিয়ে দেশে কাউকে আইনি প্রতিনিধি করতে হবে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ওকালতনামা সত্যায়িত করা যায়।
সম্পত্তি বিরোধ হলে কোথায় যাবেন?
পারিবারিকভাবে সমাধান না হলে নিচের পথগুলো অনুসরণ করুন:
- স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ / পৌরসভায় সালিশী কাউন্সিলে আবেদন
- জেলা আইনি সহায়তা কমিটিতে (বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ পাওয়া যায়)
- পারিবারিক আদালতে বণ্টনের মামলা দায়ের
- জাতীয় আইনি সহায়তা সংস্থা (National Legal Aid Services Organization) — হটলাইন: ১৬৪৩০
📚 তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (bdlaws.minlaw.gov.bd)
- সাকসেশন অ্যাক্ট, ১৯২৫
- বাংলাদেশ ভূমি মন্ত্রণালয় — land.gov.bd
- বাংলাপিডিয়া — মুসলিম পরিবার আইন অধ্যাদেশ
- National Legal Aid Services Organization — www.nlaso.gov.bd

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।