বাংলাদেশে ডিভোর্স দিতে মূলত যা লাগে (১) বিবাহের কাবিননামা/নিকাহনামার ফটোকপি, (২) স্বামী ও স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, (৩) দুইজন পুরুষ সাক্ষীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, (৪) ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবর লিখিত তালাকের নোটিশ, এবং (৫) পাসপোর্ট সাইজ ছবি (যদি আইনজীবী দিয়ে হলফনামা করা হয়)।
বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্স বাংলাদেশের অনেকের জীবনে একটি কঠিন বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সঠিক তথ্য না জানলে এই আইনি প্রক্রিয়াটি আরও জটিল ও কষ্টকর মনে হয়। এই গাইডটিতে বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ডিভোর্স দিতে কি কি কাগজ লাগে, কীভাবে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, কত সময় লাগে এবং কত খরচ হতে পারে সব কিছু সহজ ভাষায় বলা হয়েছে।
ডিভোর্স দিতে কি কি কাগজপত্র লাগে
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নিচের কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন:
সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক কাগজপত্র:
- বিবাহের কাবিননামা বা নিকাহনামার ফটোকপি (মূল কপি সংরক্ষণ করুন)
- স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর ফটোকপি
- দুইজন পুরুষ সাক্ষীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি
- তালাকের লিখিত নোটিশ (যা চেয়ারম্যান বা মেয়রকে পাঠাতে হবে)
অতিরিক্ত কাগজ (প্রয়োজন অনুযায়ী):
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি ১ কপি (আইনজীবীর মাধ্যমে হলফনামা করলে)
- কোর্টের মাধ্যমে ডিভোর্স হলে আবেদনপত্র ও কোর্ট ফি
- দেনমোহর পরিশোধের প্রমাণপত্র বা নিকাহনামায় উশুল সংক্রান্ত তথ্য
- সন্তান থাকলে সন্তানের জন্ম নিবন্ধন সনদের কপি (হেফাজত সংক্রান্ত বিষয়ের জন্য)
গুরুত্বপূর্ণ: কাগজপত্র ফটোকপি করার আগে সব মূল কপি নিজের কাছে সুরক্ষিত রাখুন। কাবিননামার মূল কপি হারিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট কাজীর অফিস থেকে সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে পারবেন।
স্বামী কীভাবে ডিভোর্স দেবেন
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী স্বামী স্ত্রীকে মৌখিক বা লিখিতভাবে তালাক দিতে পারেন। তবে তালাক দেওয়ার পরপরই চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
ধাপ ১: তালাকের ঘোষণা
স্বামী মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে তালাক ঘোষণা করতে পারেন। তবে শুধু মুখে ‘তালাক’ বললেই চূড়ান্ত হয় না পরবর্তী ধাপগুলো অবশ্যই পালন করতে হবে।
ধাপ ২: লিখিত নোটিশ পাঠানো
তালাকের ঘোষণার পরপরই দুটি জায়গায় নিবন্ধিত ডাকযোগে (Registered Post) লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে:
- স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবর
- স্ত্রীকে (নোটিশের একটি কপি)
এই নোটিশ না পাঠালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭(২) ধারা অনুযায়ী ১ বছরের কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ধাপ ৩: সালিশি পরিষদের সভা
নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান বা মেয়র একটি সালিশি পরিষদ গঠন করবেন। এই পরিষদ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলনের চেষ্টা করবে। উভয় পক্ষকে এই সভায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকে।
ধাপ ৪: ৯০ দিন অপেক্ষা
চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে ৯০ দিন না পেরোলে তালাক কার্যকর হয় না। এই সময়ের মধ্যে স্বামী চাইলে তালাক প্রত্যাহার করতে পারেন। তালাক প্রত্যাহার করলে আগের মতোই সংসার করা যাবে — নতুন করে বিয়ে করার প্রয়োজন নেই।
বিশেষ নিয়ম: তালাকের সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে নোটিশের ৯০ দিন বা সন্তান প্রসব, যেটি পরে হবে সেই সময়ের আগে তালাক কার্যকর হবে না।
ধাপ ৫: ডিভোর্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ
৯০ দিন পার হলে এবং তালাক প্রত্যাহার না করলে বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়। এরপর নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে তালাক নিবন্ধন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে।
স্ত্রী কীভাবে ডিভোর্স দেবেন
ক) কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে অধিকার থাকলে
বিয়ে নিবন্ধনের সময় নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার দেওয়া থাকে, তাহলে স্বামীর মতো একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্ত্রী তালাক দিতে পারবেন।
খ) কাবিননামায় অধিকার না থাকলে
নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে অধিকার না থাকলে স্ত্রীকে পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে হবে। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ অনুযায়ী স্ত্রী নিচের কারণগুলোতে আদালতে ডিভোর্স চাইতে পারবেন:
- স্বামী ২ বছর ধরে ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হলে
- স্বামী ৭ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে
- স্বামী কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া ৩ বছর দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে
- মুসলিম পারিবারিক আইন লঙ্ঘন করে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া অতিরিক্ত বিয়ে করলে
- বিয়ের সময় স্বামী পুরুষত্বহীন থাকলে এবং তা অব্যাহত থাকলে
- স্বামী ২ বছর ধরে উন্মাদগ্রস্ত বা কুষ্ঠ বা গুরুতর যৌন রোগে ভুগলে
- স্বামী শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করলে
- অভিভাবকের দ্বারা ১৮ বছরের আগে বিয়ে হলে এবং ১৯ বছরের আগে তা প্রত্যাখ্যান করলে
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা: স্ত্রী তালাক দিলে দেনমোহর পাবেন না এই ধারণা ভুল। বিবাহবিচ্ছেদ যেভাবেই হোক, স্ত্রী অবশ্যই দেনমোহরের প্রাপ্য অংশ পাবেন।
পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ
স্বামী-স্ত্রী উভয়ে যদি ডিভোর্সে রাজি থাকেন, তাহলে মিউচুয়াল ডিভোর্স বা পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ করা যায়। এই প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ এবং দ্রুত।
মিউচুয়াল ডিভোর্সের ধাপ:
- উভয় পক্ষ দেনমোহর, ভরণপোষণ ও সন্তানের অভিভাবকত্ব বিষয়ে একমত হন
- বিবাহ নিবন্ধকের সামনে স্বামী-স্ত্রী এবং ২ জন সাক্ষী স্বাক্ষর করেন
- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়
- ৯০ দিন পর তালাক চূড়ান্ত হয়
মিউচুয়াল ডিভোর্সে আইনজীবীর খরচ তুলনামূলক কম হয় এবং প্রক্রিয়াটি অনেকটা কম জটিল।
ডিভোর্সে কত সময় লাগে?
সাধারণভাবে ডিভোর্সের ন্যূনতম সময়:
- নোটিশ পাঠানো থেকে তালাক চূড়ান্ত হতে: ৯০ দিন (৩ মাস)
- আদালতের মাধ্যমে স্ত্রীর ডিভোর্সের ক্ষেত্রে: ৩ মাস থেকে ১-২ বছর পর্যন্ত লাগতে পারে
- মিউচুয়াল ডিভোর্সের ক্ষেত্রে: সালিশি পরিষদ গঠনের পর ৯০ দিন
ডিভোর্স দিতে কত টাকা খরচ হয়?
সরকারি নির্ধারিত ফি তুলনামূলকভাবে কম, তবে বাস্তবে মোট খরচ পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে:
| খরচের ধরন | পরিমাণ |
| তালাক নিবন্ধন ফি (সরকারি) | ১,০০০ টাকা (২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী) |
| নকল প্রাপ্তি ফি | ৫০ টাকা |
| যাতায়াত ফি (প্রতি কিলোমিটার) | ১০ টাকা |
| আইনজীবীর ফি (পরামর্শ ও পরিচালনা) | ৫,০০০ – ৩০,০০০ টাকা (পরিস্থিতি অনুযায়ী) |
| আদালতের মাধ্যমে (জটিল মামলায়) | ৩০,০০০ – ১,০০,০০০+ টাকা পর্যন্ত হতে পারে |
দ্রষ্টব্য: ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা সংশোধনী অনুযায়ী তালাক নিবন্ধন রেজিস্ট্রেশন ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি ফি জানতে স্থানীয় কাজী অফিসে যোগাযোগ করুন।
ডিভোর্সের পর দেনমোহর ও ভরণপোষণ
দেনমোহর
বিবাহবিচ্ছেদ যেভাবেই হোক স্বামী দিক বা স্ত্রী দিক স্ত্রী তাঁর প্রাপ্য দেনমোহর পাবেন। নিকাহনামায় যদি কিছু ‘উশুল’ (পূর্ব পরিশোধিত) থাকে, তবে বকেয়া অংশ পাবেন।
ভরণপোষণ
৯০ দিনের ইদ্দতকাল পর্যন্ত স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। সন্তান থাকলে সন্তানের ভরণপোষণ আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
সন্তানের হেফাজত (Custody)
সাধারণত ছেলে শিশু ৭ বছর পর্যন্ত এবং মেয়ে শিশু বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের হেফাজতে থাকে। তবে পারিবারিক আদালত সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: মুখে তালাক দিলেই কি বিচ্ছেদ হয়ে যায়?
না। শুধু মুখে ‘তালাক’ বললে বা ‘বায়েন তালাক’ বললে সঙ্গে সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হয় না। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত নোটিশ পাঠানো বাধ্যতামূলক এবং ৯০ দিন অপেক্ষা করতে হয়।
প্রশ্ন: স্ত্রী কি কাবিননামা ছাড়া ডিভোর্স দিতে পারবেন?
কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে অধিকার না থাকলে স্ত্রীকে পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে হবে। আদালত মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ অনুযায়ী ডিক্রি দিলে ৯০ দিন পর তালাক চূড়ান্ত হয়।
প্রশ্ন: তালাকনামা কোথায় রেজিস্ট্রি করতে হয়?
তালাকনামা স্থানীয় নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হয়। ৯০ দিন পর চূড়ান্ত তালাক হলে তখন রেজিস্ট্রেশন করিয়ে সার্টিফিকেট নেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা কীভাবে ডিভোর্স দেন?
বাংলাদেশে হিন্দু আইনে স্ত্রী বা স্বামী চাইলে সরাসরি ডিভোর্স দেওয়ার কোনো প্রচলিত বিধান নেই। তবে পারিবারিক আদালতে আবেদন করা যায়। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: খ্রিষ্টান দম্পতি কীভাবে ডিভোর্স করবেন?
খ্রিষ্টান দম্পতিকে ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯ অনুযায়ী জেলা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করতে হয়। প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে জটিল এবং আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন: ডিভোর্সের পর আবার বিয়ে করা যাবে কখন?
তালাক চূড়ান্ত হওয়ার (৯০ দিন পর) পর এবং ইদ্দতকাল শেষ হলে উভয়পক্ষ পুনরায় বিয়ে করতে পারবেন। তবে প্রথম দুটি তালাক (রজ্জী তালাক) চূড়ান্ত না হলে একই স্বামী-স্ত্রী আবার একসাথে থাকতে পারেন।
প্রশ্ন: ডিভোর্সের নোটিশ না পাঠালে কি তালাক বাতিল হয়?
না। নোটিশ না পাঠালে তালাক বাতিল হয় না — তালাক কার্যকর হয়। তবে নোটিশ না পাঠানো একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রশ্ন: বিদেশে থাকলে কীভাবে ডিভোর্স দেওয়া যায়?
বিদেশে থাকলে আইনজীবীকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে ডিভোর্সের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে নিবন্ধিত ডাকে নোটিশ পাঠানো যায়।
লেখক পরিচিতি ও তথ্যসূত্র
এই আর্টিকেলটি বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১; মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪; মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯; এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ (সংশোধনী ২০২৬)-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি। তথ্য সংগ্রহে বাংলাপিডিয়া, প্রথম আলো, Counsels Law Partners, ও সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
দ্রষ্টব্য: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে। ব্যক্তিগত আইনি সমস্যার জন্য সর্বদা একজন যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।