অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ: বাতিল বা স্থগিত হচ্ছে যেসব অধ্যাদেশ

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ বর্তমানে অনুমোদন পাচ্ছে না, অর্থাৎ এগুলো বাতিল হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু এবং ১৫টি সংশোধনীর মাধ্যমে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি।

আপনি কি জানেন, গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্ত এখন বাতিলের মুখে?

হ্যাঁ, সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি আলোচিত ও জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আর থাকছে না।

কিন্তু কোনগুলো বাতিল হচ্ছে এবং কোনগুলো টিকছে? আপনার দৈনন্দিন জীবনে বা চাকুরির ক্ষেত্রে এর কী প্রভাব পড়বে?

চলুন, দেশের বর্তমান আইনি পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় আপডেটটি সহজ ভাষায় জেনে নিই।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ: কী এবং কেন?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

সেই সময় দেশে সংসদ ছিল না। তাই জরুরি প্রয়োজন মেটাতে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করেন।

প্রায় ১৮ মাসের মেয়াদে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

সম্প্রতি (১২ মার্চ, ২০২৬) নতুন নির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এই ১৩৩টি অধ্যাদেশই সংসদে তোলা হয়েছে।

সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বাধীন বিশেষ কমিটি এগুলো যাচাই-বাছাই করে ২রা এপ্রিল তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেছে।

এখন সবার মনেই প্রশ্ন— কোন আইনগুলো বাতিল হচ্ছে? চলুন পরের সেকশনে দেখে নিই।

বাতিল বা স্থগিত হচ্ছে যেসব অধ্যাদেশ

সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট ২০টি অধ্যাদেশ আপাতত সংসদে পাস হচ্ছে না।

এর মানে হলো, সংসদের মেয়াদ শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় এগুলোর কার্যকারিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে।

এই ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি পুরোপুরি বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো:

  • জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ২০২৪
  • সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫
  • সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫
  • সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬

এছাড়া, আরও ১৬টি অধ্যাদেশকে এখনই পাস না করে, পরবর্তীতে আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন বিল আকারে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

এর ফলে আপাতত এই ১৬টি অধ্যাদেশও বাতিল বলে গণ্য হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি হলো:

  • দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫: এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুদককে সরাসরি মামলা দায়ের এবং বিদেশে আর্থিক অপরাধের তদন্ত করার বিশাল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
  • গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ: বিগত সরকারের আমলের গুমের ঘটনাগুলোর বিচার ও প্রতিকারের জন্য এটি ছিল একটি যুগান্তকারী আইন।
  • গণভোট অধ্যাদেশ: জুলাই ন্যাশনাল চার্টার বা জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য দেশে গণভোট আয়োজনের সুযোগ তৈরি করতে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
  • জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ: মানবাধিকার কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এটি আনা হয়েছিল।
  • রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) ভেঙে নীতি নির্ধারণ এবং কর আদায়—এই দুটি আলাদা বিভাগ করার প্রস্তাব ছিল এতে, যা নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল।

এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে সব আইন কিন্তু বাতিল হচ্ছে না।

তাহলে অপরিবর্তিত থাকছে কোনগুলো?

অপরিবর্তিত থাকছে কোন ৯৮টি অধ্যাদেশ?

ভালো খবর হলো, জনকল্যাণমূলক এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাথে জড়িত প্রায় ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পাস করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ
  • জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ
  • জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ: এই আইনের মাধ্যমে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো:

  • বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৪
  • বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (SSF) সংশোধন অধ্যাদেশ
  • জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ
  • বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত আইনসমূহ

এছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর করার বিষয়টি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এ ধরনের জনবান্ধব সিদ্ধান্তগুলো বহাল থাকছে।

কিন্তু যে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করা হচ্ছে, সেগুলোতে কী পরিবর্তন আসছে?

সংশোধন করে আনা হচ্ছে যে ১৫টি অধ্যাদেশ

কমিটি জানিয়েছে, ১৫টি অধ্যাদেশ সরাসরি বাতিল বা হুবহু পাস না করে, সেগুলোকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশোধন করে সংসদে তুলতে হবে।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ
  • কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ
  • আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ
  • সিভিল এভিয়েশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ

এই আইনগুলো পুরোপুরি বাতিল না হলেও, এগুলোর বেশ কিছু ধারায় পরিবর্তন আসবে।

এখন প্রশ্ন হলো, সংসদ কেন এই অধ্যাদেশগুলো নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করছে?

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ কী বলে?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে।

এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ যখন থাকে না, তখন রাষ্ট্রপতি জরুরি প্রয়োজনে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, যা সাধারণ আইনের মতোই শক্তিশালী।

কিন্তু এর একটি বড় শর্ত আছে।

নতুন সংসদ বসার পর, প্রথম অধিবেশনেই সব অধ্যাদেশ উপস্থাপন করতে হবে।

এবং সংসদ বসার ঠিক ৩০ দিনের মধ্যে যদি এগুলো অনুমোদন না পায়, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগুলো তামাদি বা বাতিল হয়ে যায়।

যেহেতু ১২ই মার্চ সংসদ বসেছে, তাই এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের আগেই এগুলো ফয়সালা করা বাধ্যতামূলক ছিল।

একটি অধ্যাদেশ কীভাবে স্থায়ী আইনে পরিণত হয়?

বাংলাদেশের আইনি কাঠামো অনুযায়ী একটি অধ্যাদেশ কীভাবে আইনে রূপান্তরিত হয়, তা নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:

  1. অধ্যাদেশ জারি: সংসদ ভেঙে গেলে বা অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে জরুরি প্রয়োজনে অধ্যাদেশ জারি হয়।
  2. সংসদে উপস্থাপন: নতুন নির্বাচিত সংসদের প্রথম দিনেই আইনমন্ত্রী সেই অধ্যাদেশগুলো সংসদে পেশ করেন।
  3. সংসদীয় কমিটির যাচাই-বাছাই: সংসদের বিশেষ কমিটি প্রতিটি অধ্যাদেশ খতিয়ে দেখে এবং কোনটি পাস হবে আর কোনটি বাতিল হবে, তার রিপোর্ট তৈরি করে।
  4. সংসদে ভোটাভুটি ও অনুমোদন: কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যরা ভোটাভুটি করেন। পাস হলে এটি স্থায়ী “বিল” বা আইনে পরিণত হয়।
  5. তামাদি বা বাতিল: সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে যদি কোনো অধ্যাদেশ অনুমোদন না পায়, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা তামাদি হয়ে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

অধ্যাদেশ বাতিল হলে আগের নেওয়া ব্যবস্থার কী হবে?

সাধারণত, কোনো অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার আগে সেই আইনের অধীনে যেসব নিয়োগ, সিদ্ধান্ত বা মামলা হয়েছে, তা বৈধ থাকে। তবে ভবিষ্যতে ওই আইনের আর কোনো কার্যকারিতা থাকে না।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর কি থাকছে?

হ্যাঁ, তরুণদের ব্যাপক দাবির প্রেক্ষিতে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সংক্রান্ত জনবান্ধব অধ্যাদেশটি বহাল থাকছে বলে জানা গেছে।

ত্রয়োদশ সংসদে কবে এই ১৩৩টি অধ্যাদেশ তোলা হয়?

গত ১২ই মার্চ, ২০২৬ তারিখে সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়।

বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো কি ভবিষ্যতে আবার আইনে পরিণত হতে পারে?

হ্যাঁ। যে ১৬টি অধ্যাদেশ আপাতত বাতিল হচ্ছে, সরকার চাইলে পরবর্তীতে সেগুলোকে নতুন বিল আকারে আবার সংসদে তুলে আইন করতে পারে।

প্র: অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ কতদিন ছিল?

উ: ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত, প্রায় ১৮ মাস এই সরকার দায়িত্ব পালন করে।

প্র: অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য গঠিত কমিটির প্রধান কে ছিলেন?

উ: সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন এই বিশেষ সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্র: জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত আইনগুলোর ভবিষ্যৎ কী?

উ: জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের কল্যাণ, স্মৃতি জাদুঘর এবং যোদ্ধাদের সুরক্ষার জন্য প্রণীত অধ্যাদেশগুলো কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পাস করা হচ্ছে।

প্র: দুর্নীতি দমন কমিশনের অধ্যাদেশ কেন আটকে দেওয়া হলো?

উ: এই অধ্যাদেশে দুদককে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সংসদীয় কমিটি মনে করছে, এটি পাস করার আগে আরও যাচাই-বাছাই ও সংশোধন প্রয়োজন।

শেষকথা

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু আইনি বিষয় নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তন।

যে ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা স্থগিত হচ্ছে— বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন এবং সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ সংক্রান্ত আইনগুলো— সেগুলো দেশের ভবিষ্যৎ সুশাসনে গভীর প্রভাব ফেলবে।

একদিকে যেমন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও যোদ্ধাদের সুরক্ষার আইনগুলো বহাল থাকছে, অন্যদিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার আটকে যাওয়ায় অনেকেই হতাশ হতে পারেন।

তবে মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো সংসদের জবাবদিহিতা।

আপনার কী মনে হয়? দুর্নীতি দমন বা গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ কি এভাবেই বাতিল হওয়া উচিত ছিল, নাকি এগুলোকে দ্রুত পাস করা উচিত ছিল?

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত আমাদের কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানাবেন। আর দেশের এই জরুরি আইনি আপডেটটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

Last Updated: ৩রা এপ্রিল, ২০২৬

তথ্যসূত্র: * বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS)

  • প্রথম আলো, দৈনিক কালের কণ্ঠ ও বনিক বার্তা (এপ্রিল ২-৩, ২০২৬-এর প্রতিবেদনসমূহ)
  • বাংলাদেশ সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ।

Leave a Comment