ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে মোট ৪৯ জন নারী সংরক্ষিত মহিলা আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি জোট ৩৬ জন, জামায়াত-এনসিপি জোট ১২ জন এবং স্বতন্ত্র জোট ১ জন। ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করেছে।
সংরক্ষিত নারী আসন কী? বাংলাদেশে এটি কীভাবে কাজ করে?
অনেকেই জানতে চান — সংরক্ষিত নারী আসন বলতে আসলে কী বোঝায়? সহজ কথায় বলতে গেলে, জাতীয় সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৫০টি আসন কেবলমাত্র নারীদের জন্য সংরক্ষিত।
এই আসনগুলো সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয় না। বরং সাধারণ নির্বাচনে দল বা জোট যে আনুপাতিক হারে আসন পায়, সেই অনুপাতে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। প্রতি ৬ জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন পাওয়া যায়।
কীভাবে ভোট হয়? সংসদের সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্যরা সংরক্ষিত আসনের সদস্য নির্বাচনে ভোট দেন। তবে সাধারণত দল বা জোট তাদের বরাদ্দ পাওয়া আসনের সমান সংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন দেয় — ফলে ভোটের প্রয়োজনই পড়ে না।
২০২৬ সালে সংরক্ষিত আসনের বণ্টন কেমন হলো?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আসন বণ্টনের চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| দল/জোট | সাধারণ আসন | সংরক্ষিত নারী আসন |
|---|---|---|
| বিএনপি ও জোট | ২১৫+ | ৩৬টি |
| জামায়াত-এনসিপি ১১ দলীয় জোট | ৭৭ | ১২টি |
| স্বতন্ত্র জোট | ৬ | ১টি |
| মোট | ২৯৮ | ৪৯টি |
দ্রষ্টব্য: মোট ৫০টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ৪৯টি পূর্ণ হয়েছে। একটি আসনের (এনসিপির মনিরা শারমিন) প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় সেটি পেন্ডিং রয়েছে।
বিএনপি জোটের ৩৬ জন নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের তালিকা ২০২৬
বিএনপি ও জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন গেজেটে নিম্নলিখিত ৩৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে:
১. সেলিমা রহমান — বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য; এর আগে দুবার সংরক্ষিত আসনের এমপি ও ২০০১-০৬ মেয়াদে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী
২. শিরীন সুলতানা — বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী; কেন্দ্রীয় কমিটির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক
৩. রাশেদা বেগম হীরা — প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক
৪. রেহানা আক্তার রানু — সহপ্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক
৫. নেওয়াজ হালিমা আরলী — বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা
৬. মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন
৭. বিলকিস ইসলাম — মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক
৮. সাকিলা ফারজানা — সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কন্যা
৯. হেলেন জেরিন খান — সহশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক
১০. নিলোফার চৌধুরী মনি
১১. নিপুণ রায় চৌধুরী — সাবেক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর কন্যা; ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক
১২. জীবা আমিনা খান
১৩. মাহমুদা হাবীবা — বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য
১৪. মোছা. সাবিরা সুলতানা — ত্রয়োদশ নির্বাচনে যশোর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন
১৫. সানসিলা জেবরিন — শেরপুর-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন
১৬. সানজিদা ইসলাম তুলি — মায়ের ডাকের সমন্বয়ক; ঢাকা-১৪ আসনে লড়েছিলেন
১৭. সুলতানা আহমেদ — মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক
১৮. ফাহমিদা হক
১৯. আন্না মিনুজ
২০. সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর)
২১. শামীম আরা বেগম স্বপ্না
২২. মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার — সহস্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক
২৩. ফেরদৌসী আহমেদ — ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক
২৪. বীথিকা বিনতে হোসাইন — প্রয়াত নেতা শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী
২৫. মোসা. সুরাইয়া জেরিন
২৬. মানসুরা আক্তার — জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক; এই সংসদের সর্বকনিষ্ঠ এমপি
২৭. জহরত আদিব চৌধুরী — বাংলালিংকের সাবেক সিইও; প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরীর কন্যা
২৮. মমতাজ আলো
২৯. ফাহিমা নাসরিন
৩০. আরিফা সুলতানা
৩১. মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন
৩২. নাদিয়া পাঠান পাপন
৩৩. শওকত আরা আক্তার
৩৪. মাধবী মার্মা
৩৫. সেলিনা সুলতানা
৩৬. রেজেকা সুলতানা
জামায়াত-এনসিপি ১১ দলীয় জোটের ১২ জন নির্বাচিত
গেজেট অনুযায়ী জামায়াত জোটের ১২ জন নারী এমপি হলেন:
১. নূরুন্নিসা সিদ্দীকা (জামায়াত) ২. মারজিয়া বেগম (জামায়াত) ৩. সাবিকুন্নাহার মুন্নী (জামায়াত) ৪. মোসা. নাজমুন নাহার নীলু (জামায়াত) ৫. মাহফুজা হান্নান (জামায়াত) ৬. সাজেদা সামাদ (জামায়াত) ৭. শামছুন্নাহার বেগম (জামায়াত) ৮. ইঞ্জি. মারদিয়া মমতাজ (জামায়াত) ৯. রোকেয়া বেগম — জুলাই শহীদ পরিবার থেকে মনোনীত ১০. ডা. মাহমুদা আলম মিতু (এনসিপি) ১১. তাসমিয়া প্রধান ১২. ইঞ্জি. মাহবুবা হাকিম
স্বতন্ত্র জোট থেকে নির্বাচিত
- সুলতানা জেসমিন জুঁই — ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি; স্বতন্ত্র ৬ সংসদ সদস্যের জোট থেকে মনোনীত
নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও প্রক্রিয়া
- মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ: ২১ এপ্রিল ২০২৬
- মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই: ২২-২৩ এপ্রিল ২০২৬
- আপিলের সুযোগ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬
- আপিল নিষ্পত্তি: ২৭-২৮ এপ্রিল ২০২৬
- প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬
- গেজেট প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬
- নির্ধারিত ভোটের তারিখ: ১২ মে ২০২৬ (তবে একক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন পড়েনি)
এবারের নির্বাচনে বিশেষ কী কী ঘটল?
নতুন মুখের আধিক্য
বিএনপির ৩৬ জন মনোনীতের মধ্যে ২৬ জনই সম্পূর্ণ নতুন মুখ। অভিজ্ঞ নেত্রীদের পাশাপাশি তরুণ ও পেশাজীবীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে — যা দলটির জন্য ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ।
সর্বকনিষ্ঠ এমপি
মানসুরা আক্তার (ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক) এই সংসদের সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য হওয়ার পথে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন
যেহেতু প্রতিটি দল ও জোট তাদের বরাদ্দ পাওয়া আসনের সমান প্রার্থী দিয়েছে, তাই ১২ মের নির্ধারিত ভোটের কোনো প্রয়োজন ছিল না। ৪৯ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচন থেকে বাদ পড়লেও সংসদে ফিরলেন যারা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে হেরেও সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন তিনজন: সানজিদা ইসলাম তুলি, সাবিরা সুলতানা ও সানসিলা জেবরিন।
সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা
সুবর্ণা সিকদার বিতর্ক
বিএনপির তালিকায় সুবর্ণা সিকদার ঠাকুরের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দলের ভেতরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে, তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।
মনিরা শারমিনের আপিল খারিজ
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয় এবং তার আপিলও নির্বাচন কমিশন খারিজ করে দেয়। ফলে জামায়াত জোট ১৩টির বদলে ১২টি আসন পেয়েছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহ
❓ সংরক্ষিত মহিলা আসন মোট কতটি?
জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। তবে ২০২৬ সালে ৪৯টিতে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
❓ বিএনপি কতটি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছে?
বিএনপি ও তাদের জোট মিলিয়ে মোট ৩৬টি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছে।
❓ জামায়াত কতটি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছে?
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট মিলিয়ে ১২টি আসন পেয়েছে।
❓ সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট কখন হবে?
ভোটের তারিখ ছিল ১২ মে ২০২৬। কিন্তু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৯ জন নির্বাচিত হওয়ায় ভোট অনুষ্ঠানের প্রয়োজন হয়নি।
❓ সংরক্ষিত নারী আসনের গেজেট কবে প্রকাশ হয়েছে?
৩০ এপ্রিল ২০২৬ (বৃহস্পতিবার, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩) তারিখে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করেছে।
❓ সংরক্ষিত আসনে কীভাবে আসন বণ্টন হয়?
প্রতি ৬ জন সাধারণ সংসদ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন দেওয়া হয়। এটি জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী নির্ধারিত।
❓ এই সংসদে সর্বকনিষ্ঠ নারী সংসদ সদস্য কে?
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আক্তার ত্রয়োদশ সংসদের সর্বকনিষ্ঠ এমপি হচ্ছেন।
কোন আইনে সংরক্ষিত আসন নির্ধারিত?
সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচন পরিচালিত হয় জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪-এর ধারা ৪ ও ধারা ২৬(২) অনুযায়ী। রাজনৈতিক দল ও জোটের অনুকূলে বরাদ্দ করা আসনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত প্রার্থীদের “সংসদ সদস্য” হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে।
সূত্র ও রেফারেন্স
- বাংলাদেশ গেজেট
- নির্বাচন কমিশন
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
এই আর্টিকেলটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক গেজেট, নির্ভরযোগ্য জাতীয় দৈনিক এবং সংবাদ সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। সকল তথ্য ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত আপডেট করা হয়েছে। নতুন কোনো তথ্য পরিবর্তন হলে পাঠকদের সরাসরি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট (www.ecs.gov.bd) বা বাংলাদেশ গেজেট (www.bgpress.gov.bd) যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।