এমপিও (MPO) শিটে মুদ্রিত ভুল জন্মতারিখ সংশোধনের জন্য নতুন “এমপিও শিটে মুদ্রিত জন্মতারিখ পরিবর্তন/সংশোধন নীতিমালা-২০২৬” অনুযায়ী আবেদন করা যাবে। দাখিল/এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার সনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) তথ্যের ভিত্তিতে এই সংশোধন করা হয়। সংশোধনের জন্য শিক্ষক বা কর্মচারীকে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ মহাপরিচালক, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর বরাবর সরাসরি বা অনলাইনে আবেদন করতে হবে।
শিক্ষক ও কর্মচারীদের এমপিও (MPO) শিটে জন্মতারিখ ভুল এন্ট্রি হওয়া একটি সাধারণ কিন্তু বেশ জটিল সমস্যা। বিশেষ করে অবসরে যাওয়ার সময় এই ভুলের কারণে অনেক শিক্ষককে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আগে এই ভুল সংশোধনের সুস্পষ্ট কোনো বিধান না থাকায় জটিলতা আরও বাড়তো।
তবে, শিক্ষকদের এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ “এমপিও শিটে মুদ্রিত জন্মতারিখ পরিবর্তন/সংশোধন নীতিমালা-২০২৬” প্রকাশ করেছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে জানব কীভাবে আপনি বৈধ উপায়ে আপনার এমপিও শিটের জন্মতারিখ সংশোধন করতে পারবেন।
এমপিও শিটে জন্মতারিখ সংশোধনের প্রধান শর্তাবলি
সংশোধনের আবেদন করার আগে নীতিমালার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন:
- ভিত্তি প্রমাণপত্র: প্রথম এমপিও আবেদনের সময় দাখিলকৃত এসএসসি/দাখিল/সমমান পরীক্ষার সনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে (NID) উল্লেখিত জন্মতারিখের ওপর ভিত্তি করে সংশোধন করা হবে।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: যেসব কর্মচারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা দাখিল বা সমমানের নিচে (যেমন: অষ্টম শ্রেণি পাস), তাদের বয়স বা জন্মতারিখ সংশোধন করা যাবে না।
- করণিক ভুল হিসেবে গণ্য: জন্মতারিখ সংশোধনের এই আবেদনটি মূলত এমপিও শিটে “করণিক ভুল (Clerical Mistake) এন্ট্রি সংশোধন” হিসেবেই বিবেচিত হবে।
- অবসরের সময়সীমা: কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীকে অবসরে গমনের কমপক্ষে এক বছর (১ বছর) পূর্বে সঠিক জন্মতারিখ অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে হবে। শেষ মুহূর্তে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।
- নতুন শিক্ষকদের জন্য: নতুন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রথম এমপিও পাওয়ার পর শিটে ভুল দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের আবেদন করতে হবে।
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদন করার সময় অবশ্যই নিচের ডকুমেন্টসগুলোর সত্যায়িত কপি সংযুক্ত করতে হবে:
১. ভুল জন্মতারিখ যুক্ত বর্তমান এমপিও (MPO) কপি।
২. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধন সনদের কপি।
৩. দাখিল/এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার মূল সনদের কপি।
৪. প্রথম চাকরিতে যোগদানের নিয়োগপত্র ও যোগদানপত্র।
৫. এমপিও নীতিমালা (২০১৮) অনুযায়ী অন্যান্য প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র।
৬. অঙ্গীকারনামা: বয়স বাড়লে বকেয়া দাবি না করার বিষয়ে ৩০০/- (তিনশত) টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি অঙ্গীকারনামা।
জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন পদ্ধতি
- ধাপ ১: প্রথমে সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং প্রমাণক সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ফাইল তৈরি করুন।
- ধাপ ২: আপনার স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান প্রধানের (সুপার/অধ্যক্ষ) সুপারিশসহ আবেদনপত্র প্রস্তুত করুন।
- ধাপ ৩: ফাইলটি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের দপ্তরে জমা দিন। তিনি যাচাই করে তা ফরোয়ার্ডিং করবেন।
- ধাপ ৪: উপজেলা অফিসারের মাধ্যম হয়ে আবেদনটি সরাসরি অথবা অনলাইনে মহাপরিচালক, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর (Directorate of Madrasah Education) বরাবর পৌঁছাবে।
- ধাপ ৫: মহাপরিচালক একটি কমিটি গঠন করে আপনার সনদ যাচাই-বাছাই করবেন। সব ঠিক থাকলে সংশোধনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে এবং ৭ দিনের মধ্যে আপনাকে বা প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিভিন্ন ধরণের ভুল এবং সংশোধনের নিয়ম
নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের ভুলের জন্য আলাদা কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে:
- সার্টিফিকেট ও এনআইডি-তে ভিন্নতা: যদি এসএসসি/দাখিল সনদ এবং এনআইডি-তে জন্মতারিখ আলাদা থাকে, তবে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্থাৎ এসএসসি/দাখিল সনদকেই ভিত্তি হিসেবে ধরে সংশোধন করা হবে।
- অযৌক্তিক বয়স বা ভুল এন্ট্রি: নীতিমালা জারির আগের নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগদানের সময় বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর বিবেচনা করা হবে। ১৮ বছর পূর্তির তারিখ এবং সনদ অর্জনের তারিখের মধ্যে যেটি আগে, সেটিকে ভিত্তি ধরা হবে।
- প্রথম এমপিও সঠিক, পরেরটিতে ভুল: যদি আপনার প্রথম এমপিও শিট এবং সনদের বয়স একই থাকে, কিন্তু পরবর্তী কোনো এমপিও শিটে ভুল আসে, তবে তা সহজেই সংশোধনযোগ্য।
আবেদন নামঞ্জুর হলে করণীয় কী?
যাচাই-বাছাই শেষে যদি কোনো কারণে আপনার আবেদনটি মহাপরিচালক কর্তৃক নামঞ্জুর (Reject) হয়, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী ২ (দুই) মাসের মধ্যে আপনি সচিব, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ বরাবর পুনরায় আপিল করতে পারবেন।
সতর্কতা: সঠিক জন্মতারিখ প্রমাণের নামে ভুল তথ্য দাখিল করলে বা প্রতারণার আশ্রয় নিলে বিধি মোতাবেক কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: বয়স সংশোধনের ফলে চাকরি কাল বৃদ্ধি পেলে কি বকেয়া বেতন পাওয়া যাবে?
উত্তর: না। সংশোধনের ফলে যদি চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি পায়, তবে আপনি বর্ধিত সময়ের জন্য কোনো বকেয়া বেতন-ভাতা বা আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারবেন না। আবেদনের সাথেই ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে এই মর্মে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
প্রশ্ন: অবসরের ঠিক আগে কি জন্মতারিখ সংশোধন করা যায়?
উত্তর: না। সংশোধিত নীতিমালা-২০২৬ অনুযায়ী, অবসরে যাওয়ার কমপক্ষে এক বছর আগে সংশোধনের আবেদন করতে হবে।
প্রশ্ন: কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এই নিয়ম কি সবার জন্য প্রযোজ্য?
উত্তর: এই প্রজ্ঞাপনটি মূলত কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনস্থ শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য জারি করা হয়েছে। তবে মাউশি (DSHE) বা সাধারণ শিক্ষা অধিদপ্তরের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরণের নিয়ম অনুসরণ করা হয়।
আশা করি এই গাইডলাইনটি আপনার এমপিও শিটের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করবে। শিক্ষা বিষয়ক আরও আপডেটেড তথ্যের জন্য আমাদের সাইটের সাথেই থাকুন।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।