৯ম পে স্কেল বেতন কত?

প্রস্তাবিত ৯ম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০,০০০ টাকা (গ্রেড ২০) এবং সর্বোচ্চ বেতন ১,৬০,০০০ টাকা (গ্রেড ১) নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করেনি।

৯ম পে স্কেল কী এবং এটি কেন দরকার?

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয় জাতীয় বেতন স্কেলের মাধ্যমে। ১৯৭৩ সালে প্রথম বেতন স্কেল জারির পর থেকে এ পর্যন্ত মোট আটটি বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পর নতুন স্কেল আসার কথা। কিন্তু করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ৯ম পে স্কেল দীর্ঘায়িত হয়। ২০১৫ থেকে ২০২৬ এই ১১ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে, অথচ সরকারি কর্মচারীদের বেতন একই জায়গায় থমকে ছিল। এই বাস্তবতাতেই ৯ম পে স্কেলের দাবি এবং প্রাসঙ্গিকতা।

৯ম পে স্কেলে গ্রেড অনুযায়ী বেতন কত হবে?

নিচে প্রস্তাবিত ৯ম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর গ্রেড-ভিত্তিক তালিকা দেওয়া হলো। এটি দৈনিক যুগান্তরসহ একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। তবে সরকারি গেজেট প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত এটি চূড়ান্ত নয়।

গ্রেডমূল বেতন (প্রস্তাবিত)পদের ধরন (সাধারণত)
গ্রেড ১১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত)সিনিয়র সচিব, সচিব
গ্রেড ২১,৩২,০০০ – ১,৫৩,০০০অতিরিক্ত সচিব
গ্রেড ৩১,১৩,০০০ – ১,৪৮,৮০০যুগ্মসচিব
গ্রেড ৪১,০০,০০০ – ১,৪২,৪০০উপসচিব
গ্রেড ৫৮৬,০০০ – ১,৩৯,৭০০সিনিয়র সহকারী সচিব
গ্রেড ৬৭১,০০০ – ১,৩৪,০০০সহকারী সচিব
গ্রেড ৭৫৮,০০০ – ১,২৬,৮০০সিনিয়র সহকারী কমিশনার
গ্রেড ৮৪৭,২০০ – ১,১৩,৭০০সহকারী কমিশনার
গ্রেড ৯৪৫,১০০ – ১,০৮,৮০০সিনিয়র সহকারী পরিচালক
গ্রেড ১০৩২,০০০ – ৭৭,৩০০প্রধান শিক্ষক, উচ্চমান সহকারী
গ্রেড ১১২৫,০০০ – ৬০,৫০০সহকারী শিক্ষক (উচ্চ বিদ্যালয়)
গ্রেড ১২২৪,৩০০ – ৫৮,৭০০সহকারী শিক্ষক
গ্রেড ১৩২৪,০০০ – ৫৮,০০০অফিস সহকারী (সিনিয়র)
গ্রেড ১৪২৩,৫০০ – ৫৬,৮০০অফিস সহকারী
গ্রেড ১৫২২,৮০০ – ৫৫,২০০নিম্নমান সহকারী
গ্রেড ১৬২১,৯০০ – ৫২,৯০০ডেটা এন্ট্রি অপারেটর
গ্রেড ১৭২১,৪০০ – ৫১,৯০০অফিস সহায়ক (সিনিয়র)
গ্রেড ১৮২১,০০০ – ৫০,৯০০অফিস সহায়ক
গ্রেড ১৯২০,৫০০ – ৪৯,৬০০পিয়ন, দফতরি
গ্রেড ২০২০,০০০ – ৪৮,৪০০চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী

৮ম ও ৯ম পে স্কেলের তুলনা

অষ্টম বেতন স্কেল (২০১৫) অনুযায়ী সর্বনিম্ন বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ছিল ৭৮,০০০ টাকা। প্রস্তাবিত ৯ম পে স্কেলে এই বেতন যথাক্রমে ২০,০০০ টাকা ও ১,৬০,০০০ টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

  • সর্বনিম্ন বেতন বৃদ্ধি: প্রায় ১৪২%
  • সর্বোচ্চ বেতন বৃদ্ধি: প্রায় ১০৫%
  • বর্তমান প্রস্তাবে গ্রেড সংখ্যা ২০টিই বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে
  • বেতন বৈষম্য অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮ করার প্রস্তাব রয়েছে

৯ম পে স্কেলে ভাতা কত হবে?

শুধু মূল বেতন নয়, সরকারি কর্মচারীরা বেশ কিছু ভাতাও পেয়ে থাকেন। প্রস্তাবিত স্কেলে নিচের ভাতাগুলোতেও পরিবর্তন আসতে পারে:

  • বাড়ি ভাড়া ভাতা: মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ (ঢাকায় সর্বোচ্চ, জেলা পর্যায়ে কম)
  • চিকিৎসা ভাতা: মাসিক নির্দিষ্ট হারে (বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে)
  • উৎসব ভাতা (ঈদ বোনাস): মূল বেতনের সমান দুটি উৎসব ভাতা
  • বৈশাখী ভাতা: মূল বেতনের ২০% হারে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে
  • টিফিন ভাতা: বর্তমানের চেয়ে বৃদ্ধির প্রস্তাব

একজন ১০ম গ্রেডের শিক্ষক উদাহরণ হিসেবে দেখলে — বর্তমানে মূল বেতন ১৬,০০০ টাকায় সব মিলিয়ে প্রায় ২২,০০০ টাকা পান। নতুন স্কেলে মূল বেতন ৩২,০০০ টাকা হলে মোট প্রাপ্তি ৪০,০০০ টাকার উপরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

৯ম পে স্কেল কবে কার্যকর হবে?

এটি এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী:

  • জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তা হয়নি।
  • ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ২২,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
  • পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বার্ষিক ৭০,০০০ থেকে ৮০,০০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
  • ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
  • ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে (জুন ২০২৬) নতুন পে স্কেল সংক্রান্ত ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ: সরকারিভাবে এখনও গেজেট প্রকাশিত হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা করতে হবে।

পেনশন ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসছে?

৯ম পে কমিশনের সুপারিশে শুধু বেতন নয়, পেনশন ব্যবস্থায়ও সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে:

  • পেনশন সংস্কার: বিদ্যমান পেনশন কাঠামো পুনর্গঠনের প্রস্তাব
  • সার্ভিস কমিশন গঠন: কর্মচারী সেবা উন্নয়নে আলাদা কমিশন
  • কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন: কল্যাণমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে
  • স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত: এই দুই খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ভাতা পর্যালোচনার জন্য আলাদা কমিটি গঠনের প্রস্তাব

প্রাথমিক শিক্ষক, নার্স ও অন্যান্য পেশায় বেতন কত হবে?

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক: সাধারণত ১৩তম গ্রেডভুক্ত। প্রস্তাবিত স্কেলে ১৩তম গ্রেডে মূল বেতন শুরু হবে ২৪,০০০ টাকা থেকে।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক: ১১তম গ্রেড — প্রস্তাবিত মূল বেতন ২৫,০০০ টাকা থেকে শুরু।

হাসপাতাল নার্স ও প্যারামেডিকস: পদ অনুযায়ী ৮ম থেকে ১৪তম গ্রেডে থাকেন। নতুন স্কেলে উল্লেখযোগ্য বেতন বৃদ্ধি পাবেন।

পুলিশ কনস্টেবল: সাধারণত ১৬তম গ্রেডে — প্রস্তাবিত মূল বেতন ২১,৯০০ টাকা থেকে শুরু।

কর্মচারীদের দাবি কী?

সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন ৯ম পে স্কেলে নিচের দাবিগুলো জানিয়েছে:

  • সর্বনিম্ন মূল বেতন কমপক্ষে ৩০,০০০ টাকা করা
  • মূল বেতনে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি (অনেক সংগঠনের দাবি)
  • বাড়ি ভাড়া ভাতা যৌক্তিক হারে বৃদ্ধি
  • চিকিৎসা ভাতা ও শিক্ষা ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো
  • গ্রেড বৈষম্য কমিয়ে আনা

সচরাচর জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন: ৯ম পে স্কেল কি এখনও চালু হয়নি? উত্তর: না, জুন ২০২৬ পর্যন্ত সরকারিভাবে ৯ম পে স্কেলের গেজেট জারি হয়নি। তবে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে।

প্রশ্ন: ৯ম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন কত? উত্তর: প্রস্তাবিত তালিকা অনুযায়ী ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা। তবে কর্মচারীদের দাবি ৩০,০০০ টাকা।

প্রশ্ন: ৯ম পে স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন কত? উত্তর: প্রস্তাবিত ১ম গ্রেডে নির্ধারিত মূল বেতন ১,৬০,০০০ টাকা।

প্রশ্ন: কোন গ্রেডে কত বেতন পাব, কীভাবে জানব? উত্তর: উপরের টেবিলে আপনার গ্রেড নম্বর মিলিয়ে দেখুন। বেতন ফিক্সেশন হওয়ার পর iBAS++ (Integrated Budget and Accounting System) এ লগইন করে নিজের বেতন স্লিপ দেখতে পারবেন।

প্রশ্ন: ৯ম পে স্কেল কি বেসরকারি স্কুল শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? উত্তর: না, সরাসরি নয়। তবে সরকারি পে স্কেলের ভিত্তিতে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতনও পরবর্তীতে সমন্বয় করা হতে পারে।

প্রশ্ন: ৯ম পে স্কেল কি অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনেও প্রভাব ফেলবে? উত্তর: হ্যাঁ। সাধারণত নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে পেনশনভোগীদের পেনশনও নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুনঃনির্ধারণ করা হয়। তবে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের বিষয়ে আলাদা সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

প্রশ্ন: নতুন পে স্কেলে বেতন বৃদ্ধির অ্যারিয়ার কি পাওয়া যাবে? উত্তর: পূর্ববর্তী পে স্কেলের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সাধারণত কার্যকর তারিখ থেকে অ্যারিয়ার প্রদান করা হয়। তবে এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপনেই চূড়ান্ত নির্দেশনা থাকবে।

৯ম পে স্কেল নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক

কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও গেজেট জারি না হওয়া নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। কর্মচারী সংগঠনগুলো গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

অন্যদিকে সিপিডি (Centre for Policy Dialogue) সহ কিছু অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় সতর্কতার সাথে পে স্কেল বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে। এর প্রতিবাদে কর্মচারী ঐক্য পরিষদ তীব্র সমালোচনা করেছে।

শেষকথা

৯ম পে স্কেল বাংলাদেশের ১৫ লক্ষেরও বেশি সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জীবনমানে বড় প্রভাব ফেলবে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ থেকে ২০,০০০ টাকায় উন্নীত হবে — এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে হবে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে।

এই পৃষ্ঠাটি আপডেটেড রাখা হচ্ছে। গেজেট জারি হওয়ামাত্র সর্বশেষ তথ্য এখানে প্রকাশ করা হবে।

তথ্যসূত্র:

  • বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় (mof.gov.bd)
  • দৈনিক যুগান্তর (অক্টোবর ২০২৫)
  • bdservicerules.info (মে-জুন ২০২৬)
  • bdgovtnotice.com (জুন ২০২৬)
  • ekhon.tv (জানুয়ারি ২০২৬)

Leave a Comment