সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরীরা কি উৎসব ভাতা ও নববর্ষ ভাতা পান?
হ্যাঁ। ২০২৬ সালের ১১ জুন তারিখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি সরকারি পত্র জারি করেছে, যেখানে দপ্তরী কাম প্রহরীদের উৎসব ভাতা ও নববর্ষ ভাতা প্রদানের বিষয়ে অর্থ বিভাগের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী এই কর্মীরা বছরে দুটি উৎসব ভাতা (প্রতিটি মাসিক সেবামূল্যের ৫০%) এবং একটি বৈশাখী/নববর্ষ ভাতা (মাসিক সেবামূল্যের ২০%) পাওয়ার যোগ্য।
বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত দপ্তরী কাম প্রহরীরা বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা রক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মীরা ন্যায্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
২০২৬ সালের জুন মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় (mopme.gov.bd) থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পত্র জারি হয়েছে, যা এই কর্মীদের ভাতা প্রাপ্তির বিষয়টিকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে।
সরকারি পত্রের মূল বিষয়: ১১ জুন ২০২৬
পত্রটি কী বলছে?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট ও অডিট শাখা থেকে স্মারক নম্বর: ৩৮.০০.০০০০.০০০.০০৬.০২.০০০১.২৫-১৮৮ তারিখ ১১ জুন ২০২৬ (২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩) জারি করা হয়েছে।
পত্রটিতে প্রধানত নিচের বিষয়গুলোতে অর্থ বিভাগের কাছে স্পষ্টীকরণ চাওয়া হয়েছে:
- ২০১৯ সালের নীতিমালা প্রণয়নে অর্থ বিভাগের সাথে পরামর্শ হয়েছিল কিনা
- বর্তমানে মোট কতজন দপ্তরী কাম প্রহরী নিয়োজিত আছেন এবং তাদের নিয়োগের সময়কাল
- আউটসোর্সিং নীতিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অর্থ বিভাগের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল কিনা
- পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ ও বিধিমালা, ২০০৮ অনুসরণ করা হয়েছে কিনা
- সাকুলা বেতন কোড থেকে সেবামূল্য পরিশোধের যৌক্তিকতা
- উৎসব ও নববর্ষ ভাতা প্রদানের বৈধতা ও ভিত্তি
পত্রটিতে স্বাক্ষর করেছেন মোঃ জাকির হোসেন খান, সিনিয়র সহকারী সচিব (বাউজ)।
দপ্তরী কাম প্রহরী পদের আইনি মর্যাদা: সরকারি না আউটসোর্সিং?
এই প্রশ্নটি নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে।
পরিষ্কার উত্তর: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর স্পষ্ট জানিয়েছে যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরী পদটি সরকারি বেতনধারী পদ নয়। এটি আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় জনবল সংগ্রহের পদ।
প্রাসঙ্গিক নীতিমালাগুলো:
- আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০১৮
- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম প্রহরী পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক জনবল সংগ্রহের সংশোধিত নীতিমালা, ২০১৯
- আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫
উৎসব ভাতা ও নববর্ষ ভাতা: কতটুকু পাবেন?
আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী ভাতার হার
১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে নতুন আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ জারি করা হয়। এই নীতিমালায় দপ্তরী কাম প্রহরীসহ সকল আউটসোর্সিং কর্মীদের জন্য নিচের সুবিধাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে:
| ভাতার ধরন | হার | কখন পাবেন |
|---|---|---|
| উৎসব ভাতা (১ম) | মাসিক সেবামূল্যের ৫০% | ঈদুল ফিতরের আগে |
| উৎসব ভাতা (২য়) | মাসিক সেবামূল্যের ৫০% | ঈদুল আযহার আগে |
| বৈশাখী/নববর্ষ ভাতা | মাসিক সেবামূল্যের ২০% | পহেলা বৈশাখের আগে |
| বার্ষিক ছুটি | ১৫ দিন (সবেতন) | বছরে একবার |
| মাতৃত্বকালীন ছুটি | ৪৫ দিন | নারী কর্মীদের জন্য |
আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৬: সর্বশেষ আপডেট
২০২৬ সালে জারি করা নতুন নীতিমালায় সেবামূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং মূল বেতনের সমান হারে উৎসব ভাতার সুবিধা দেওয়ার দিকে যাওয়া হচ্ছে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াধীন।
দীর্ঘদিনের সংগ্রাম: কেন এই ভাতা নিয়ে বিতর্ক?
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরীরা বহু বছর ধরে উৎসব ভাতার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। তাদের মূল অভিযোগ ছিল:
- দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখে উৎসব ভাতা পেলেও তারা পান না
- ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করা সত্ত্বেও ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত
- পদটি জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘদিন থেকে উপেক্ষিত
তবে ২০২৫ সালের নীতিমালা এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করেছে, যদিও পদ জাতীয়করণের দাবি এখনও বিবেচনাধীন।
মন্ত্রণালয়ের পত্রে যে প্রশ্নগুলো তোলা হয়েছে
জুন ২০২৬-এর পত্রটি মূলত অর্থ বিভাগের কাছে ৬টি বিষয়ে তথ্য চেয়েছে। এগুলো বোঝা জরুরি, কারণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতে দপ্তরীরা নিয়মিতভাবে ভাতা পাবেন কিনা:
প্রশ্ন ক: ২০১৯ সালে নীতিমালা প্রণয়নের আগে অর্থ বিভাগের সাথে পরামর্শ করা হয়েছিল কিনা। না হয়ে থাকলে Rules of Business, 1996 অনুযায়ী যৌক্তিক কারণ কী?
প্রশ্ন খ: বর্তমানে কতজন দপ্তরী কাম প্রহরী কর্মরত আছেন এবং কখন থেকে?
প্রশ্ন গ: আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০১৮ অনুযায়ী অর্থ বিভাগের সম্মতি ছাড়া কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কিনা?
প্রশ্ন ঘ: পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কিনা?
প্রশ্ন ঙ: সাকুলা বেতন কোড থেকে দপ্তরীদের সেবামূল্য পরিশোধের আইনি ভিত্তি কী?
প্রশ্ন চ: নীতিমালার নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে ভাতা পরিশোধের যৌক্তিকতা কী?
বর্তমানে কীভাবে ভাতা পাওয়া যাবে?
ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া
ধাপ ১: নিশ্চিত করুন আপনার নিয়োগ আউটসোর্সিং নীতিমালা, ২০১৯/২০২৫ অনুযায়ী হয়েছে কিনা।
ধাপ ২: আপনার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে উপজেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করুন।
ধাপ ৩: উপজেলা থেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ভাতার তালিকা পাঠানো হয়।
ধাপ ৪: জেলা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) অনুমোদন দেয়।
ধাপ ৫: অর্থ বিভাগের ছাড়পত্রের পর সেবামূল্য ও ভাতা ব্যাংক হিসাবে জমা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ: যদি ভাতা না পান, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে (mirpur-2, dhaka) লিখিত অভিযোগ করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন ১: দপ্তরী কাম প্রহরীরা কি সরকারি কর্মচারী?
না। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের স্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী, এই পদটি আউটসোর্সিং পদ, সরকারি বেতনধারী পদ নয়। তবে তারা সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এবং আউটসোর্সিং নীতিমালার সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
প্রশ্ন ২: উৎসব ভাতা কত টাকা পাবেন?
আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, প্রতিটি উৎসব ভাতা হবে মাসিক সেবামূল্যের ৫০%। মাসিক সেবামূল্য এলাকাভেদে (ঢাকা/সিটি কর্পোরেশন/অন্যান্য) ভিন্ন হয়। সঠিক পরিমাণ জানতে আপনার জেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করুন।
প্রশ্ন ৩: নববর্ষ/বৈশাখী ভাতা কখন পাবেন?
পহেলা বৈশাখের আগে মাসিক সেবামূল্যের ২০% হারে বৈশাখী প্রণোদনা পাওয়ার কথা। ২০২৬ সালের পহেলা বৈশাখ ছিল ১৪ এপ্রিল।
প্রশ্ন ৪: দপ্তরী কাম প্রহরীদের চাকরি কি জাতীয়করণ হবে?
এই দাবিটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানা গেছে।
প্রশ্ন ৫: আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ কি দপ্তরীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?
হ্যাঁ। আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫ সকল সরকারি দপ্তরের আউটসোর্সিং কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরীরাও অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্ন ৬: দপ্তরী কাম প্রহরী নিয়োগ ২০২৬-এ কীভাবে আবেদন করবেন?
নিয়োগ উপজেলা পর্যায়ে পরিচালিত হয়। আউটসোর্সিং নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বা সরাসরি উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। বর্তমান শূন্যপদের তালিকার জন্য dpe.gov.bd ওয়েবসাইট দেখুন।
প্রশ্ন ৭: ভাতা না পেলে কোথায় অভিযোগ করবেন?
- প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর: mirpur-2, Dhaka
- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়: www.mopme.gov.bd
- অর্থ বিভাগ: www.mof.gov.bd
- জাতীয় হেল্পলাইন: ৩৩৩ (সরকারি সেবা সংক্রান্ত অভিযোগ)
বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
২০২৬ সালের জুন মাসে জারি করা সরকারি পত্রটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সরকার দপ্তরীদের ভাতা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে। অর্থ বিভাগের উত্তরের উপর নির্ভর করে আগামীতে:
- নিয়মিত ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা পাকাপাকি হতে পারে
- সেবামূল্য বৃদ্ধি আরও গতি পাবে
- পদ জাতীয়করণের প্রশ্নে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে
দপ্তরী কাম প্রহরীদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক সংকেত।
শেষকথা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা রাখেন। আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী তারা উৎসব ভাতা (৫০%) ও নববর্ষ ভাতা (২০%) পাওয়ার আইনি অধিকার রাখেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পত্র (জুন ২০২৬) এই বিষয়টি নিষ্পত্তির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
যদি আপনি এই পদে কর্মরত থাকেন বা পরিচিত কেউ থাকেন, তাহলে আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং যেকোনো ভাতা-সংক্রান্ত জটিলতায় সরাসরি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করুন।
বিশ্বাসযোগ্য সূত্র:
- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়: www.mopme.gov.bd
- প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর: www.dpe.gov.bd
- অর্থ মন্ত্রণালয়: www.mof.gov.bd
- আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ (অর্থ বিভাগ গেজেট, ১৫ এপ্রিল ২০২৫)
এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক এবং সরকারি পত্র ও নীতিমালার আলোকে তৈরি। ব্যক্তিগত আইনি পরামর্শের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।