সরকারি চাকরিতে একজন কর্মচারীকে কখনো কখনো নিজের মূল দপ্তরের বাইরে অন্য কোনো দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজ করতে পাঠানো হয়। এ ব্যবস্থাকে সাধারণভাবে প্রেষণ (Deputation) বলা হয়। এ সময় তাঁর বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে, কোন দপ্তরের বেতন বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং পে-ফিক্সেশনের সময় কী বিষয় খেয়াল রাখতে হবে—এসব নিয়ে অনেকের প্রশ্ন থাকে।
এই লেখায় প্রেষণে কর্মরত সরকারি কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের বিষয়টি সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, বেতন নির্ধারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ, প্রযোজ্য বিধি এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল।
প্রেষণ (ডেপুটেশন) কী?
প্রেষণ হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো সরকারি কর্মচারীকে তাঁর নিজ দপ্তরের বাইরে অন্য কোনো দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য সাময়িকভাবে নিয়োগ বা পদায়ন করা হয়। সাধারণত এ ক্ষেত্রে কর্মচারীর মূল দপ্তরের সঙ্গে তাঁর চাকরির সম্পর্ক বজায় থাকে, তবে প্রেষণ আদেশে নির্ধারিত শর্তগুলো অনুসরণ করতে হয়।
প্রেষণে কর্মরত কর্মচারীর বেতন কোন ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়?
প্রেষণে থাকা কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর মূল পদ, প্রাপ্য বেতন, প্রেষণ পদের বেতনস্কেল এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশ গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে কর্মচারী প্রেষণে না গেলে মূল দপ্তরে যে বেতন পাওয়ার অধিকারী হতেন, সেটিও বেতন নির্ধারণের বিবেচ্য ভিত্তি হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রেষণ আদেশে বেতন সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পদের জন্য কোন বেতনস্কেল প্রযোজ্য এবং কর্মচারীর জন্য কোনো বিকল্প বা বিশেষ শর্ত আছে কি না—এসব যাচাই করে বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে বেতন নির্ধারণের বিষয়টি
প্রেষণে কর্মরত কর্মচারী প্রেষণে না থাকলে মূল অফিসে যে মূল বেতন পাওয়ার কথা, সেই বেতনের ভিত্তিতে জাতীয় বেতনস্কেল–২০২৬ অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ: বাস্তবে কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে এই তারিখ ও পদ্ধতি প্রয়োগ করার আগে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন বা আদেশ, কর্মচারীর প্রেষণ আদেশ এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের নির্দেশনা মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি দেখে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ করা উচিত নয়।
জাতীয় বেতনস্কেল–২০২৬ সম্পর্কিত সরকারি তথ্য অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে দেখা যেতে পারে: অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়।
বেতন নির্ধারণের আগে যেসব তথ্য যাচাই করবেন
- মূল পদ ও মূল দপ্তর: কর্মচারী মূল দপ্তরে কোন পদে কর্মরত এবং তাঁর অনুমোদিত বেতনস্কেল কী, তা যাচাই করুন।
- মূল বেতনের তথ্য: প্রযোজ্য তারিখে কর্মচারী মূল দপ্তরে কর্মরত থাকলে যে মূল বেতন পাওয়ার কথা, তা সার্ভিস বুক, বেতন বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট নথি থেকে নিশ্চিত করুন।
- প্রেষণ আদেশ: প্রেষণ আদেশে বেতন, ভাতা, পদমর্যাদা ও অন্যান্য শর্ত সম্পর্কে কী বলা আছে, তা ভালোভাবে পড়ুন।
- প্রযোজ্য বেতনস্কেল ও কার্যকর তারিখ: সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশে কোন বেতনস্কেল এবং কোন তারিখ থেকে তা কার্যকর বলা হয়েছে, তা যাচাই করুন।
- ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য প্রাপ্যতা: বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত বেতন বা অন্য কোনো সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা বিধি ও নথি অনুযায়ী নির্ধারণ করুন।
- হিসাবরক্ষণ অফিসের নির্দেশনা: কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশনা নিন।
পে-ফিক্সেশনের সময় যেসব সাধারণ ভুল এড়াবেন
- প্রেষণ আদেশের শর্ত না পড়ে অন্য কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি অনুসরণ করা।
- মূল বেতন ও মোট বেতনকে একই মনে করা।
- কার্যকর তারিখ যাচাই না করে ভুল তারিখ থেকে বেতন নির্ধারণ করা।
- সার্ভিস বুক বা অনুমোদিত বেতন বিবরণীর সঙ্গে তথ্য না মিলিয়ে হিসাব করা।
- সরকারি আদেশ যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া।
এ ধরনের ভুল হলে বেতন পুনর্নির্ধারণ, বিল সংশোধন বা অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
একটি সহজ উদাহরণ
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী প্রেষণে অন্য দপ্তরে কর্মরত আছেন। তাঁর মূল দপ্তরের বেতনসংক্রান্ত নথি, প্রেষণ আদেশ এবং প্রযোজ্য নতুন বেতনস্কেল দেখে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বেতন নির্ধারণ করবেন। প্রথমে সংশ্লিষ্ট তারিখে মূল দপ্তরে তাঁর প্রাপ্য মূল বেতন কত হতো, তা যাচাই করা হবে। এরপর প্রেষণ আদেশ ও সরকারি বিধিতে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করা হবে।
এটি শুধু বোঝানোর জন্য একটি সাধারণ উদাহরণ; বাস্তব বেতন নির্ধারণে নির্দিষ্ট অঙ্ক জানতে কর্মচারীর গ্রেড, বেতনধাপ, ইনক্রিমেন্টের তথ্য ও প্রযোজ্য আদেশ প্রয়োজন।
প্রেষণে বেতন নির্ধারণ নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
প্রেষণে থাকলে কি মূল দপ্তরের বেতনই সব সময় বিবেচনা করা হয়?
সব ক্ষেত্রে একই উত্তর দেওয়া যায় না। মূল দপ্তরের বেতন গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত পদ্ধতি প্রেষণ আদেশ ও প্রযোজ্য বিধির ওপর নির্ভর করে।
জাতীয় বেতনস্কেল–২০২৬ অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কি সবার বেতন নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে?
এ সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশের আওতা ও শর্তের ওপর নির্ভরশীল। আপনার দেওয়া ছবিতে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ উল্লেখ আছে; নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে অর্থ বিভাগের মূল আদেশ যাচাই করুন।
পে-ফিক্সেশনে ভুল হলে কী করবেন?
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক শাখা ও হিসাবরক্ষণ অফিসে প্রয়োজনীয় নথিসহ যোগাযোগ করুন। প্রয়োজন হলে সংশোধিত বেতন নির্ধারণের জন্য লিখিতভাবে আবেদন করুন।
কোন কোন নথি কাজে লাগতে পারে?
সাধারণত প্রেষণ আদেশ, যোগদানপত্র, সার্ভিস বুক, সর্বশেষ বেতন বিবরণী, ইনক্রিমেন্টের তথ্য এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশ কাজে লাগে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথি চাইতে পারে।
শেষ কথা
প্রেষণে কর্মরত সরকারি কর্মচারীর বেতন নির্ধারণে মূল দপ্তরের বেতনসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সঠিক পদ্ধতি নির্ভর করে প্রেষণ আদেশ, প্রযোজ্য বেতনস্কেল এবং সরকারি বিধি বা নির্দেশনার ওপর। তাই বেতন নির্ধারণের আগে নথিপত্র যাচাই করুন এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের পরামর্শ নিন।
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতার জন্য লেখা। এটি কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের চূড়ান্ত নির্দেশনা নয়। ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে প্রযোজ্য নিয়ম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আদেশ অনুসরণ করুন।
সরকারি তথ্যসূত্র

আমি একজন অডিটর এবং বিগত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, আর্থিক নিয়মাবলী ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত চর্চা ও লেখালেখি করছি। হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী এবং সরকারি চাকুরির সুবাদে প্রশাসনিক নিয়ামাবলী খুব গভীরভাবে বোঝার সুযোগ হয়েছে। আমার লক্ষ্য হলো এই জটিল বিষয়গুলোকে সাধারণের কাছে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করা।