২০২৬ সালের নতুন নির্বাচনী নিয়মাবলী

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (Representation of the People Order, 1972) এর নতুন সংশোধিত বাংলা পাঠ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার মূল আইন হলো এই আরপিও (RPO)।

আসন্ন নির্বাচনগুলোতে যারা প্রার্থী হতে চান বা সাধারণ ভোটার হিসেবে নির্বাচনী আইন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য আজকে আমি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও নিয়মগুলো সহজভাবে তুলে ধরেছি।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (সংশোধিত ২০২৬)

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সংবিধানের ক্ষমতা বলে রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করেছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এই গেজেটে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা, নির্বাচনী ব্যয় এবং অপরাধের দণ্ডসহ বেশ কিছু বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা

সংসদ সদস্য হতে হলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যোগ্য হতে হবে। তবে আরপিও-র ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিম্নলিখিত ব্যক্তিরা প্রার্থী হতে পারবেন না:

  • ভোটার তালিকা: যদি তিনি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত না থাকেন।
  • ঋণ খেলাপি: মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণ বা কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে।
  • বিল খেলাপি: টেলিফোন, গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানির বিল মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন পর্যন্ত পরিশোধ না করলে।
  • সরকারি চাকরি: প্রজাতন্ত্রের বা কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে। চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসর গ্রহণের পর ৩ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত প্রার্থী হওয়া যাবে না।
  • ফৌজদারি অপরাধ: যদি তিনি কোনো নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন ২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তিলাভের পর ৫ বছর পার না হয়।
  • যুদ্ধাপরাধ: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে।

২০২৬ সালের নতুন নির্বাচনী নিয়মাবলী

সর্বশেষ সংশোধনীতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কিছু বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছে:

১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ভুয়া তথ্য প্রতিরোধ

আরপিও-র ৭৩ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে বা নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে মিথ্যা ছবি, ভিডিও বা অডিও তৈরি এবং প্রচার করা এখন দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ২ থেকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

২. জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি

সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য এখন জামানত হিসেবে ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা জমা দিতে হবে। আগে এই পরিমাণ কিছুটা কম ছিল।

৩. সর্বোচ্চ কতটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়?

একজন ব্যক্তি একই সময়ে সর্বোচ্চ ৩টি (তিনটি) নির্বাচনী এলাকার জন্য প্রার্থী হতে পারবেন। ৩টির বেশি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করলে তার সবগুলো মনোনয়নপত্রই বাতিল হয়ে যাবে।

৪. পোস্টাল ব্যালট ও প্রবাসী ভোটার

বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি ভোটাররা এখন নির্ধারিত পদ্ধতিতে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এছাড়াও জেলখানায় আটক ব্যক্তি বা নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারাও এই সুবিধা পাবেন।

নির্বাচনী আচরণবিধি ও দণ্ড

সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আরপিও-তে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে:

  • ভোট-পূর্ব অনিয়ম: নির্বাচন কমিশন ‘নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচার কমিটি’ গঠন করবে, যারা যেকোনো অনিয়ম তদন্ত করবে।
  • পেশিশক্তি ব্যবহার: কোনো ভোটকেন্দ্র বা বুথ বলপূর্বক দখল করলে বা কর্মকর্তাদের বাধা দিলে ৩ থেকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।
  • প্রচারণার সময়সীমা: ভোট গ্রহণ শুরুর পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টা এবং ভোট শেষ হওয়ার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কোনো জনসভা বা মিছিল করা নিষিদ্ধ।
  • রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন: প্রতিটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৩৩% নারী সদস্য রাখার লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের বিধান রাখা হয়েছে।

সাধারণ জিজ্ঞাস্যা

প্রশ্ন: একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতে কী প্রয়োজন?

উত্তর: স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ১% ভোটারের সমর্থন সংবলিত স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা জমা দিতে হবে। তবে আগে সংসদ সদস্য ছিলেন এমন প্রার্থীর ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন: মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে কি আপিল করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, রিটার্নিং অফিসারের আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা যাবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।

প্রশ্ন: নির্বাচনকালে কি কর্মকর্তাদের বদলি করা যায়?

উত্তর: তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ১৫ দিন পর পর্যন্ত বিভাগীয় কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার (DC), পুলিশ সুপার (SP) সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কমিশনের অনুমতি ছাড়া বদলি করা যাবে না।

সতর্কীকরণ: এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্যের জন্য তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচনের আইনি জটিলতার ক্ষেত্রে সর্বদা মূল গেজেট অনুসরণ করা উচিত।

মূল গেজেটটি দেখুন: RPO 2026

উৎস: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় গেজেট (০৭ জানুয়ারি ২০২৬)।

Leave a Comment