বাংলাদেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং ঝরে পড়া (Out-of-school) শিশুদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’ (BNFE) কাজ করে। আর উপজেলা পর্যায়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল নেতৃত্ব দেন উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
আপনি যদি এই পদে ক্যারিয়ার গড়তে চান বা সরকারি এই পদটির দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চান, তবে এই সম্পূর্ণ এবং আপডেটেড আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাজ কি?
উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তা মূলত উপজেলা পর্যায়ে সরকারের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম (যেমন: বয়স্ক শিক্ষা ও ঝরে পড়া শিশুদের শিখন কেন্দ্র) বাস্তবায়ন ও তদারকি করেন। তাঁর প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে এনজিও পরিচালিত স্কুল বা লার্নিং সেন্টারগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা, শিক্ষার মান যাচাই করা, অধীনস্থ কর্মচারীদের কাজ পরিচালনা করা এবং জেলা অফিসে মাসিক রিপোর্ট প্রদান করা।
বেতন ভাতাদি
উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদটি জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী একটি ১০ম গ্রেডের (বেসিক ১৬,০০০ – ৩৮,৬৪০ টাকা) গেজেটেড পদ। মূল বেতনের পাশাপাশি তারা নিয়ম অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পেয়ে থাকেন। অনেক সময় বিভিন্ন প্রজেক্ট ও সরকারি বরাদ্দের ওপর ভিত্তি করে ফিল্ড স্টাফ ও মূল কাঠামোর বেতন অনুপাত (Salary Ratio) ১:৮ হারে নির্ধারিত হয়ে থাকে। সম্প্রতি সরকারি নির্দেশনায় এই কর্মকর্তাদের নিজস্ব দপ্তরের জন্য আলাদা ডিডিও (DDO) ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা অফিসের বেতন-ভাতা ও কন্টিনজেন্সি ফান্ড পরিচালনা করেন।
উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাজ ও দায়িত্বসমূহ
একজন উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বকে কাজের ধরন অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে স্টেপ-বাই-স্টেপ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন ও মনিটরিং
এই পদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফিল্ড ওয়ার্ক বা মাঠ পর্যায়ের কাজ:
- শিখন কেন্দ্র পরিদর্শন: উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বা দুর্গম এলাকায় স্থাপিত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রগুলো নিয়মিত ভিজিট করা।
- মান নিয়ন্ত্রণ: কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো বই-খাতা পাচ্ছে কি না, এবং শিক্ষকরা সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকছেন কি না তা যাচাই করা।
- অনিয়ম রোধ: অনেক সময় বাস্তবায়নকারী সংস্থা বা এনজিওরা কাগজে-কলমে কেন্দ্র দেখালেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকে না। সরেজমিনে গিয়ে এই অনিয়ম শনাক্ত করা তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ।
২. প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ
উপজেলা অফিসের প্রধান হিসেবে তাঁকে বেশ কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়:
- অফিস ব্যবস্থাপনা: উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো কার্যালয়ের নথিপত্র, ডাটাবেজ এবং আসবাবপত্র রক্ষণাবেক্ষণ।
- অধীনস্থদের তদারকি: অফিসের ‘অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ এবং ‘অফিস সহায়ক’-দের দৈনন্দিন কাজ তদারকি করা এবং তাদের ছুটির হিসাব রাখা।
- বাজেট ও অর্থায়ন: অফিসের যাবতীয় খরচের হিসাব রাখা এবং ডিডিও (DDO) হিসেবে বিল-ভাউচার পাশ করা।
৩. সমন্বয় ও রিপোর্টিং
- সমন্বয় সভা: উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO)-এর সাথে নিয়মিত সমন্বয় সভায় অংশগ্রহণ করে কাজের অগ্রগতি রিপোর্ট করা।
- রিপোর্ট প্রেরণ: প্রতি মাসে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলো এবং কতজন ঝরে পড়ল, তার সঠিক পরিসংখ্যান জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালকের (AD) কাছে পাঠানো।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার (TEO) বনাম উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তা
সাধারণ মানুষ অনেক সময় এই দুটি পদকে এক মনে করে ফেলেন। কিন্তু এদের কাজের ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন:
| পার্থক্যের বিষয় | উপজেলা শিক্ষা অফিসার (TEO) | উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তা |
| নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তর | প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) | উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (BNFE) |
| শিক্ষার্থীর ধরন | সাধারণ ছাত্রছাত্রী (১ম-৫ম শ্রেণি) | ঝরে পড়া শিশু (৮-১৪ বছর) ও বয়স্করা |
| কর্মক্ষেত্র | সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় | এনজিও পরিচালিত লার্নিং সেন্টার |
গুরুত্বপূর্ণ নোট: অনেক উপজেলায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকলে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (UAPEO)-গণকে এই পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব (প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতাসহ) প্রদান করা হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তা কি সরাসরি এনজিও নিয়ন্ত্রণ করেন?
না, তারা সরাসরি এনজিও নিয়ন্ত্রণ করেন না। তবে সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ বাস্তবায়নকারী এনজিওগুলো প্রজেক্টের কাজ ঠিকমতো করছে কি না, তা তদারকি করার পূর্ণ আইনি ক্ষমতা তাঁর আছে।
২. এই পদে নিয়োগ কীভাবে হয়?
এই পদে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (BPSC)-এর মাধ্যমে নন-ক্যাডার (১০ম গ্রেড) হিসেবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়। এর জন্য প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
৩. উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তার চাকরিতে চ্যালেঞ্জ কী কী?
মাঠ পর্যায়ে প্রচুর যাতায়াত করতে হয়, যা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেশ কষ্টসাধ্য হতে পারে। এছাড়া অনেক সময় জনবল সংকট থাকায় কর্মকর্তাকে একাই অনেক দাপ্তরিক কাজ সামলাতে হয়।
আশা করি, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি সম্পর্কে আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন। সঠিক ও আপডেটেড তথ্যের জন্য সবসময় সরকারি ওয়েবসাইট ভিজিট করার অনুরোধ রইল।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।