সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার পর নতুন পে স্কেল বেতন কাঠামো (নবম পে-স্কেল) চূড়ান্ত সুপারিশের পর্যায়ে রয়েছে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের পে-কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন (২০তম গ্রেড) ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন (১ম গ্রেড) ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০,০০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন গ্রেডে গড়ে ১০০% থেকে ১৪০% পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে উচ্চ ও নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের বেতনের ব্যবধান ১:৮ অনুপাতে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল বেতন কাঠামো
পাঠকদের সহজে বোঝার জন্য মূল বেতনের তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
- সর্বনিম্ন মূল বেতন (২০তম গ্রেড): * বর্তমান: ৮,২৫০ টাকা
- প্রস্তাবিত: ২০,০০০ টাকা
- সর্বোচ্চ মূল বেতন (১ম গ্রেড): * বর্তমান: ৭৮,০০০ টাকা
- প্রস্তাবিত: ১,৬০,০০০ টাকা
- বেতন বৃদ্ধির হার: গ্রেডভেদে ১০০% থেকে ১৪০% পর্যন্ত
- মোট গ্রেড সংখ্যা: ২০টি (অপরিবর্তিত)
- সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত: * বর্তমান অনুপাত ১ : ৯.৪
- প্রস্তাবিত অনুপাত ১ : ৮
৯ম পে স্কেল কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ ও মূল পরিবর্তনসমূহ
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন গ্রেডভুক্ত অধিকাংশ সরকারি কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছেন। এই সমস্যার বাস্তব সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিশন।
এই কাঠামোর প্রধান ও যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মূল বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি
কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে চাকরিজীবীদের মূল বেতন বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে। সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারীর শুরুতেই মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
২. বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ
নতুন কাঠামোতে উচ্চপদস্থ ও নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে বেতনের ব্যবধান বা অনুপাত যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। আগে এই অনুপাত ছিল ১:৯.৪, যা বর্তমানে কমিয়ে ১:৮ করার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বড় এই পরিবর্তনের মধ্যেও বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।
৩. শীর্ষ পদস্থদের জন্য বিশেষ ধাপ
প্রচলিত ২০টি গ্রেডের বাইরে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা বা বিশেষ ধাপ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন:
- মন্ত্রিপরিষদ সচিব
- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব
- সিনিয়র সচিববৃন্দ
দ্রষ্টব্য: এই বিশেষ ধাপের বিস্তারিত পরবর্তীতে পৃথক প্রজ্ঞাপনের (Gazette) মাধ্যমে জানানো হবে।
সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ও বাজেট বরাদ্দ
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন।
- বর্তমান বার্ষিক ব্যয়: প্রায় ১ লাখ ৩১,০০০ কোটি টাকা।
- নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়: আরও প্রায় ১ লাখ ৬,০০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের রূপরেখা (৩ ধাপে বাস্তবায়ন)
বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও পৃথক বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। এই বিশাল বাজেট ও তিনটি প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির জন্য একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে।
বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও ধাপসমূহ:
- উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন: মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
- ধাপভিত্তিক রূপরেখা: দেশের বাজেটের ওপর যেন হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেজন্য একযোগে না করে তিন ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সুপারিশ করবে এই কমিটি।
- সম্ভাব্য সূচনা: অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকেই ধাপে ধাপে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
পে-কমিশন শুধু মূল বেতন নয়, বরং এলাকাভেদে (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য জেলা শহর) বাড়ি ভাড়া (House Rent Allowance), চিকিৎসা ভাতা (Medical Allowance) এবং যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও সময়োপযোগী পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। মূল বেতন বৃদ্ধির সাথে সাথে শতকরা হারে বাড়ি ভাড়াও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।
হ্যাঁ, সরকারি পে-স্কেল ঘোষণার সাথে সাথে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ভাতাও নতুন কাঠামোর সাথে সমন্বয় করা হয়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকদেরও আনুপাতিক হারে বেতন বৃদ্ধি পাবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন ১০ সদস্যের কমিটি বর্তমানে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে তিন ধাপের প্রথম ধাপটি আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
না, বেতন বৃদ্ধির ব্যাপক পরিবর্তনের পরও বিদ্যমান ২০টি গ্রেড আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০,০০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।