একজন সরকারি কর্মচারী যখন দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে যান, তখন তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ও কৌতূহলের বিষয় থাকে পেনশন ও গ্রাচুইটি হিসাব। বর্তমানে সরকারি বিধিমালা এবং আধুনিক অনলাইন সিস্টেমের ফলে এই হিসাব করা এখন অনেক সহজ। আজকে আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করা করব কিভাবে নিজে নিজে পেনশন হিসাব করার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।
আনুতোষিক কি এবং এর অর্থ কি?
অনেকেই জানতে চান গ্রাচুইটি কি বা আনুতোষিক অর্থ কি? সহজ ভাষায়, একজন সরকারি কর্মচারী চাকরি শেষে এককালীন যে থোক বরাদ্দ বা অর্থ পান, তাকেই বলা হয় আনুতোষিক বা Anutoshik। এটি মূলত দীর্ঘকাল নিরবচ্ছিন্ন চাকরির পুরস্কার স্বরূপ সরকার কর্তৃক প্রদান করা হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী, মোট পেনশনের ৫০% বাধ্যতামূলকভাবে সমর্পণ করে এই এককালীন আনুতোষিক হিসাব করা হয়।
পেনশন হিসাব বের করার নিয়ম ও পদ্ধতি
পেনশন হিসাব পদ্ধতি মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: আপনার সর্বশেষ মূল বেতন (Basic Pay) এবং মোট চাকুরিকাল।
পেনশন হিসাব সূত্র:
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পেনশন হিসাব সূত্র হলো:
পেনশন হিসাব সূত্র:
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পেনশন হিসাব সূত্র হলো:
- মোট পেনশন = (সর্বশেষ মূল বেতন $\times$ চাকুরিকাল অনুযায়ী নির্ধারিত হার %)
- মাসিক নিট পেনশন = (মোট পেনশন $\div$ ২) + চিকিৎসা ভাতা + অন্যান্য।
- এককালীন পেনশন হিসাব (আনুতোষিক) = (মোট পেনশনের সমর্পণকৃত ৫০% $\times$ আনুতোষিক হার)।
সরকারি চাকরির আনুতোষিক (Gratuity) হিসাব করার চার্ট
পেনশন ও আনুতোষিক কত হবে তা মূলত নির্ভর করে আপনার পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ওপর। নিচে সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ৫ বছর থেকে শুরু করে ২৫ বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য পেনশন ও আনুতোষিক হিসাব করার পূর্ণাঙ্গ রেট চার্ট দেওয়া হলো:
| পেনশনযোগ্য চাকুরিকাল | পেনশনের হার (%) | ১ টাকার বিপরীতে আনুতোষিক (Anutoshik) |
| ৫ বছর | ২১% | ২৬৫ টাকা |
| ৬ বছর | ২৪% | ২৬৫ টাকা |
| ৭ বছর | ২৭% | ২৬৫ টাকা |
| ৮ বছর | ৩০% | ২৬৫ টাকা |
| ৯ বছর | ৩৩% | ২৬৫ টাকা |
| ১০ বছর | ৩৬% | ২৬০ টাকা |
| ১১ বছর | ৩৯% | ২৬০ টাকা |
| ১২ বছর | ৪৩% | ২৬০ টাকা |
| ১৩ বছর | ৪৭% | ২৬০ টাকা |
| ১৪ বছর | ৫১% | ২৬০ টাকা |
| ১৫ বছর | ৫৪% | ২৪৫ টাকা |
| ১৬ বছর | ৫৭% | ২৪৫ টাকা |
| ১৭ বছর | ৬৩% | ২৪৫ টাকা |
| ১৮ বছর | ৬৫% | ২৪৫ টাকা |
| ১৯ বছর | ৬৯% | ২৪৫ টাকা |
| ২০ বছর | ৭২% | ২৩০ টাকা |
| ২১ বছর | ৭৫% | ২৩০ টাকা |
| ২২ বছর | ৭৯% | ২৩০ টাকা |
| ২৩ বছর | ৮৩% | ২৩০ টাকা |
| ২৪ বছর | ৮৭% | ২৩০ টাকা |
| ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব | ৯০% | ২৩০ টাকা |
কিভাবে নিজে নিজে পেনশন হিসাব করবেন?
আপনি কোনো পেনশন হিসাব ক্যালকুলেটর ব্যবহার না করেই সহজে নিচের উদাহরণটি দেখে নিজের হিসাব মেলাতে পারেন।
ধরা যাক, একজন কর্মচারীর অবসরের সময় মূল বেতন ছিল ৫০,০০০ টাকা এবং তার চাকুরিকাল ২৫ বছর।
১. মোট পেনশন: ৫০,০০০ এর ৯০% = ৪৫,০০০ টাকা।
২. নিট মাসিক পেনশন: ৪৫,০০০ এর ৫০% = ২২,৫০০ টাকা। (বাকি ৫০% সরকার আপনাকে গ্রাচুইটি হিসেবে দিবে)।
৩. আনুতোষিক হিসাব করার নিয়ম: সমর্পণকৃত ২২,৫০০ $\times$ ২৩০ = ৫১,৭৫,০০০ টাকা।
অর্থাৎ, তিনি এককালীন ৫১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা পাবেন এবং প্রতি মাসে ২২,৫০০ টাকা (সাথে চিকিৎসা ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট) পেনশন পাবেন। এটিই হলো বর্তমানের জনপ্রিয় পেনশন ও আনুতোষিক পদ্ধতি।
পেনশনের সাথে বাড়তি কি কি পাওয়া যায়?
পেনশন ও গ্রাচুইটি হিসাব করার সময় চিকিৎসা ভাতা ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কথা মাথায় রাখতে হবে।
- চিকিৎসা ভাতা: ৬৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ১,৫০০ টাকা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ২,৫০০ টাকা।
- বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট: প্রতি বছরের ১লা জুলাই মূল পেনশনের ওপর ৫% হারে ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়।
সাধারণ প্রশ্ন
প্রশ্ন: পেনশন হিসাব 2026-এ কি কোনো পরিবর্তন আসবে?
উত্তর: এখন পর্যন্ত নতুন কোনো পে-স্কেলের ঘোষণা আসেনি। তাই বর্তমান নিয়মেই পেনশন হিসাব সূত্র কার্যকর থাকবে।
প্রশ্ন: চাকুরিকাল যদি ২৪ বছর ৮ মাস হয়, তবে কি হবে?
উত্তর: সরকারি বিধি মোতাবেক ৬ মাসের বেশি সময়কে পূর্ণ ১ বছর হিসেবে ধরা হয়। ফলে আপনার চাকুরিকাল ২৫ বছর হিসেবেই গণ্য হবে।
প্রশ্ন: গ্রাচুইটির টাকা কি ট্যাক্স ফ্রি?
উত্তর: হ্যাঁ, সরকারি চাকরিজীবীদের এককালীন প্রাপ্ত আনুতোষিক বা গ্রাচুইটির টাকা আয়কর মুক্ত।
উপসংহার
পেনশন হিসাব বের করার নিয়ম জানা থাকলে অবসরের পর আর্থিক পরিকল্পনা করা সহজ হয়। এই গাইডলাইনটি মূলত পেনশন ম্যানুয়াল ও সরকারি গেজেট অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। আপনি যদি আপনার নির্দিষ্ট বেতন ও চাকুরিকাল দিয়ে নির্ভুল হিসাব পেতে চান, তবে আপনার দপ্তরের সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে যোগাযোগ করুন।
সর্বশেষ আপডেট: ডিসেম্বর ২০২৫।
উৎস: অর্থ মন্ত্রণালয় ও সিজিএ (CGA) বাংলাদেশ।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।