আপনার গাড়িটির কি ‘ইকোনমিক লাইফ’ শেষ হয়ে গেছে? বা ফিটনেসবিহীন অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে আছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আপনার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের নতুন নির্দেশনা। পরিবেশ দূষণ কমাতে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার “মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬” জারি করেছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এই নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের পর গাড়ি স্ক্র্যাপ বা ধ্বংস করা বাধ্যতামূলক। আর এই কাজটি করলে গাড়ির মালিকরা পাবেন নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশনে বিশেষ আর্থিক সুবিধা।
কোন গাড়িগুলো স্ক্র্যাপ করতে হবে, কীভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন এবং এর ফলে গাড়ির মালিক হিসেবে আপনি কী কী সুবিধা পাবেন।
মোটরযান স্ক্র্যাপ নীতিমালার মূল বিষয়
| বিষয় | বিবরণ |
| কার্যকর হওয়ার তারিখ | ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (অবিলম্বে কার্যকর) |
| স্ক্র্যাপযোগ্য গাড়ি | ইকোনমিক লাইফ অতিক্রান্ত, ফিটনেসবিহীন, অকেজো বা দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি। |
| মূল সুবিধা | পুরনো গাড়ি স্ক্র্যাপ করলে নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশনে আর্থিক প্রণোদনা। |
| বাধ্যবাধকতা | মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি স্ক্র্যাপ না করলে নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যাবে না। |
| শাস্তি | নীতিমালা অমান্য করলে সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ব্যবস্থা। |
কোন গাড়িগুলো ‘স্ক্র্যাপ’ বা বাতিল করতে হবে?
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সব গাড়ি বাতিল করতে হবে না। শুধুমাত্র নিচের শর্তে পড়া গাড়িগুলো স্ক্র্যাপযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে:
- মেয়াদোত্তীর্ণ (Economic Life Expired): সরকার নির্ধারিত ইকোনমিক লাইফ বা আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে এমন গাড়ি।
- ফিটনেসবিহীন: কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ১ বছরের বেশি সময় ধরে ফিটনেস নবায়ন করা হয়নি।
- পরিবেশ দূষণকারী: কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় এক মাসের মধ্যে তিনবার পরিবেশ দূষণকারী (মাত্রাতিরিক্ত কালো ধোঁয়া নিঃসরণ) হিসেবে প্রমাণিত হলে।
- দুর্ঘটনা কবলিত: আগুন, দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত যা মেরামত করা আর্থিকভাবে লাভজনক নয়।
- অকেজো ঘোষিত: সরকারি, আধা-সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অকেজো ঘোষিত গাড়ি।
গাড়ি স্ক্র্যাপ করলে মালিকের লাভ কী?
সরকার শুধু কড়াকড়ি আরোপ করেনি, গাড়ির মালিকদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থাও রেখেছে। আপনি যদি নিয়ম মেনে পুরনো গাড়ি স্ক্র্যাপ করেন, তবে:
- নতুন গাড়িতে ছাড়: পুরনো গাড়ির ‘স্ক্র্যাপ সার্টিফিকেট’ দেখালে নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সময় সরকার বিশেষ আর্থিক সুবিধা বা প্রণোদনা দেবে।
- ন্যায্য মূল্য: স্ক্র্যাপ করা গাড়ির যন্ত্রাংশ বা বডির মূল্য নির্ধারণ করে সেই টাকা সরাসরি মালিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। +1
- আইনি সুরক্ষা: মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তায় চললে যে মামলা বা জরিমানার ভয় থাকে, তা থেকে মুক্তি পাবেন।
গাড়ি স্ক্র্যাপ করার পদ্ধতি
গাড়ি স্ক্র্যাপ করার প্রক্রিয়াটি এখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ। ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- আবেদন: গাড়ির মালিক বিআরটিএ-এর নির্দিষ্ট ফর্মে অনলাইনে আবেদন করবেন। +1
- যাচাই-বাছাই: কর্তৃপক্ষ দেখবে গাড়ির নামে কোনো মামলা বা আইনি ঝামেলা আছে কি না।
- হস্তান্তর: সব ঠিক থাকলে গাড়িটি সরকার অনুমোদিত ‘স্ক্র্যাপ ভেন্ডর’-এর কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে।
- বিনষ্টকরণ: ভেন্ডর পরিবেশবান্ধব উপায়ে গাড়িটি এমনভাবে নষ্ট করবে যাতে চেসিস বা ইঞ্জিন অন্য গাড়িতে ব্যবহার করা না যায়।
- সার্টিফিকেট ও টাকা প্রাপ্তি: স্ক্র্যাপ শেষে ৩০ দিনের মধ্যে বিআরটিএ ‘ভেহিক্যাল স্ক্র্যাপিং সার্টিফিকেট’ দেবে এবং গাড়ির স্ক্র্যাপ মূল্য মালিকের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। +1
স্ক্র্যাপ না করলে নতুন রেজিস্ট্রেশন নেই!
নীতিমালার ৮.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন গাড়ির ইকোনমিক লাইফ শেষ হয়ে গেলে, সেই গাড়িটি স্ক্র্যাপ না করা পর্যন্ত তিনি নিজের নামে নতুন বা পুরাতন কোনো গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন না। অর্থাৎ, নতুন গাড়ি কিনতে হলে আগে পুরনো মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়িটি বৈধ উপায়ে বিদায় করতে হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: আমার গাড়িটি ১ বছর ধরে গ্যারেজে পড়ে আছে, ফিটনেস করা হয়নি। এটি কি বাতিল হয়ে যাবে?
উত্তর: যদি ১ বছরের বেশি সময় ধরে ফিটনেস নবায়ন না করেন এবং এর কোনো যৌক্তিক কারণ দর্শাতে না পারেন, তবে এটি স্ক্র্যাপযোগ্য গাড়ি হিসেবে গণ্য হবে।
প্রশ্ন: স্ক্র্যাপ ভেন্ডর কারা? আমি কি যেকোনো ভাঙ্গারি দোকানে গাড়ি বিক্রি করতে পারব? উত্তর: না। শুধুমাত্র বিআরটিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর অনুমোদিত নির্দিষ্ট ‘স্ক্র্যাপ ভেন্ডর’-এর কাছেই গাড়ি হস্তান্তর করতে হবে।
প্রশ্ন: স্ক্র্যাপ গাড়ির দাম কে ঠিক করবে?
উত্তর: বিআরটিএ-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গাড়ির ধরন ও অবস্থা অনুযায়ী এর মূল্য নির্ধারণ করে দেবে।
শেষকথা
নতুন এই নীতিমালা পরিবেশ রক্ষা এবং সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আপনার যদি কোনো অব্যবহৃত বা মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি থাকে, তবে সেটি ফেলে না রেখে সরকারি প্রক্রিয়ায় স্ক্র্যাপ করে ফেলুন। এতে আপনি একদিকে গাড়ির দাম পাবেন, অন্যদিকে নতুন গাড়ি কেনার সময় সরকারি ফি-তে ছাড় পাবেন। মনে রাখবেন, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তায় নামালে এখন শুধু জরিমানা নয়, গাড়িটি বাজেয়াপ্ত হয়ে বাধ্যতামূলক স্ক্র্যাপেও চলে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬; বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।