আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬ হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্র যেটি মূলত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয় এবং অবিলম্বে কার্যকর করা হয়।
সহজ কথায়, এই আদেশের মাধ্যমে সরকারি কেনাকাটা (পণ্য, কার্য বা সেবা) করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের (মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত) আর্থিক ব্যয়ের ক্ষমতা বা সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সরকারি কাজ ও প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি করা, যাতে ছোটখাটো ক্রয়ের অনুমোদনের জন্য ফাইলের দীর্ঘসূত্রিতা কমে আসে।
কাদের জন্য এই আদেশ এবং ‘টায়ার’ (Tier) বলতে কী বোঝায়?
এই আদেশটি মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য যারা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বা সরকারি ক্রয়ের সাথে জড়িত। আদেশে কর্মকর্তাদের ক্ষমতার ভিত্তিতে ৬টি স্তরে বা ‘টায়ার’ (Tier)-এ ভাগ করা হয়েছে:
- টায়ার-১ (Tier-1): প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিব/সিনিয়র সচিব। (সর্বোচ্চ ক্ষমতা)।
- টায়ার-২ (Tier-2): অধিদপ্তরের প্রধান বা হেড অফ ডিপার্টমেন্ট (গ্রেড-১ বা তার ঊর্ধ্বে)।
- টায়ার-৩ (Tier-3): অধিদপ্তরের প্রধান (গ্রেড-২ এবং তার নিম্নে) / বিভাগীয় কমিশনার / অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার / অধস্তন অফিস প্রধান (গ্রেড-৩ বা তার ঊর্ধ্বে)।
- টায়ার-৪ (Tier-4): জেলা প্রশাসক (DC) / অধস্তন অফিস প্রধান (গ্রেড-৪ বা গ্রেড-৫ ভুক্ত)।
- টায়ার-৫ (Tier-5): উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) / অধস্তন অফিস প্রধান (গ্রেড-৬ বা তার নিম্নে)।
- টায়ার-৬ (Tier-6): প্রকল্প পরিচালক বা প্রজেক্ট ডিরেক্টর (PD)।
ক্রয়ের পদ্ধতি ও নতুন আর্থিক সীমা বিশ্লেষণ
এই আদেশের মূল অংশ হলো ক্রয়ের পদ্ধতি এবং বাজেট (রাজস্ব বনাম উন্নয়ন) অনুযায়ী আর্থিক সীমার তালিকা। এখানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) অনুযায়ী প্রধান তিনটি পদ্ধতি OTM, RFQ এবং DPM-এর সীমা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
(দ্রষ্টব্য: নিচের সকল টাকার অঙ্ক ‘লক্ষ টাকায়’ হিসাব করা হয়েছে)
উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বা OTM (Open Tendering Method)
এটি সবচেয়ে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি। বড় কেনাকাটার ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়।
- উন্নয়ন বাজেট (Development Budget):
- পণ্য ও কার্য (Goods & Works): টায়ার-১ (সচিব), টায়ার-২ ও টায়ার-৩ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য পূর্ণ ক্ষমতা (Full Power) দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, অনুমোদিত বাজেটের মধ্যে যেকোনো অংকের ক্রয় তারা অনুমোদন করতে পারবেন। টায়ার-৪ (DC পর্যায়) এর জন্য এই সীমা ৫০০ লক্ষ টাকা এবং টায়ার-৫ (UNO পর্যায়) এর জন্য ১০০ লক্ষ টাকা।
- সেবা (Services): সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে টায়ার-১ এর পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। টায়ার-৪ এর ক্ষমতা ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত।
- রাজস্ব বাজেট (Revenue Budget):
- রাজস্ব বাজেটের ক্ষেত্রে ক্ষমতা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। যেমন, টায়ার-১ এর পণ্য ক্রয়ের সীমা ৪০০০ লক্ষ টাকা, কিন্তু টায়ার-৪ এর জন্য তা ২০০ লক্ষ টাকা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকদের (টায়ার-৬) ক্ষমতা তাদের নিজ নিজ দাপ্তরিক পদমর্যাদা (টায়ার-১ থেকে ৫) অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
কোটেশন প্রদানের অনুরোধ বা RFQ (Request for Quotation)
তুলনামূলক কম মূল্যের এবং দ্রুত কেনাকাটার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এখানে ক্ষমতা বেশ সীমিত।
- সর্বোচ্চ সীমা: উন্নয়ন বাজেটে পণ্য বা কার্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে টায়ার-১, ২ এবং ৩-এর সর্বোচ্চ সীমা ২০ লক্ষ টাকা। টায়ার-৪ এর জন্য ১০ লক্ষ এবং টায়ার-৫ এর জন্য ৫ লক্ষ টাকা।
- সেবা ক্রয়: সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই সীমা আরও কম (যেমন: टায়ার-১ এর জন্য ১০ লক্ষ টাকা)।
- বার্ষিক সীমা: RFQ পদ্ধতিতে বছরে মোট কত টাকার কেনাকাটা করা যাবে, তারও একটি নির্দিষ্ট সীমা (Cap) আদেশে উল্লেখ আছে।
সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা DPM (Direct Procurement Method)
জরুরি প্রয়োজনে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন একটি মাত্র উৎস থেকে কেনাকাটা করতে হয়, তখন এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
- সীমিত ক্ষমতা: এই পদ্ধতিতে ক্ষমতা খুবই সীমিত। যেমন—উন্নয়ন বাজেটে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে টায়ার-১ থেকে টায়ার-৩ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা মাত্র ১০ লক্ষ টাকা।
- জরুরি পরিস্থিতি: তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি প্রয়োজনে PPR এর নির্দিষ্ট ধারা (76(1)(d)) মেনে টায়ার-১ ও টায়ার-২ কর্মকর্তারা উন্নয়ন বাজেটে ৫০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং রাজস্ব বাজেটে ২০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সরাসরি ক্রয় করতে পারবেন।
রাজস্ব বাজেট বনাম উন্নয়ন বাজেট
আদেশটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার উন্নয়নমূলক কাজকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
- উন্নয়ন বাজেট (Development Budget): প্রজেক্ট বা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যে বাজেট। এখানে কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ে, অনেক বেশি আর্থিক ক্ষমতা (অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ ক্ষমতা) দেওয়া হয়েছে যাতে প্রকল্পের কাজ দ্রুত আগায়।
- রাজস্ব বাজেট (Revenue Budget): সরকারের দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয়। এখানে খরচের লাগাম টানতে আর্থিক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়েছে।
অরিজিনাল ফাইলটি দেখুন: আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন : এই নতুন আদেশ কখন থেকে কার্যকর হয়েছে?
উত্তর: আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে।
প্রশ্ন : একজন জেলা প্রশাসক (DC) উন্নয়ন বাজেটে OTM পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ কত টাকার পণ্য কিনতে পারবেন?
উত্তর: এই আদেশ অনুযায়ী, একজন জেলা প্রশাসক (টায়ার-৪) উন্নয়ন বাজেটের আওতায় OTM পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ ৫০০ লক্ষ (৫ কোটি) টাকার পণ্য বা কার্য ক্রয়ের অনুমোদন দিতে পারবেন।
প্রশ্ন : প্রকল্প পরিচালকদের (PD) আর্থিক ক্ষমতা কতটুকু?
উত্তর: প্রকল্প পরিচালকদের (টায়ার-৬) আলাদা কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। তারা তাদের মূল পদে যে টায়ারে (Tier-1 থেকে 5) আছেন, সেই টায়ার অনুযায়ী আর্থিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
প্রশ্ন : জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয়ের (DPM) সর্বোচ্চ সীমা কত?
উত্তর: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে সচিব বা অধিদপ্তর প্রধানরা (টায়ার-১ ও ২) উন্নয়ন বাজেটে সর্বোচ্চ ৫০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সরাসরি ক্রয় করতে পারবেন।
প্রশ্ন : বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা (Intellectual Services) ক্রয়ের ক্ষেত্রে সচিবের ক্ষমতা কত?
উত্তর: উন্নয়ন বাজেটের আওতায় বুদ্ধিবৃত্তিক বা পেশাগত সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সচিবের (টায়ার-১) পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে।
শেষ কথা
‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ-২০২৬’ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আপনি যদি সরকারি দপ্তরে কর্মরত হন বা সরকারি টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদার হন, তবে আপনার টায়ার অনুযায়ী আর্থিক সীমাগুলো স্পষ্টভাবে জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই বিকেন্দ্রীকরণ সঠিক সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।
(সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র তথ্য উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে তৈরি। যেকোনো দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের জন্য মূল সরকারি পরিপত্রটি দেখে নেওয়ার অনুরোধ করা হলো।)

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।