আপনি কি কুমিল্লার বাসিন্দা? কিংবা কুমিল্লায় জমি কেনা বা বাড়ি করার পরিকল্পনা করছেন? তবে আপনার জন্য জরুরি খবর। সরকার কুমিল্লা ও এর আশপাশের এলাকাকে আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে “কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (CoDA)” প্রতিষ্ঠা করেছে । ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত “কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬” অনুযায়ী, এখন থেকে বাড়ি নির্মাণ, পুকুর খনন বা জমি ভরাটের জন্য কঠোর নিয়ম মানতে হবে। নিয়ম না মানলে জেল ও বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা জানব নতুন আইনে সাধারণ মানুষের জন্য কী কী নিয়ম করা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া কাজ করলে কী শাস্তি হবে এবং কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা কতটুকু।
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নতুন নিয়ম ও শাস্তি
| অপরাধের ধরণ | শাস্তির বিধান (সর্বোচ্চ) |
| অনুমতি ছাড়া ইমারত নির্মাণ বা পুকুর খনন | ২ বছর জেল বা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড । |
| মহাপরিকল্পনার বাইরে জমি ব্যবহার | ১ বছর জেল বা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড । |
| জলাশয় ভরাট বা পানি প্রবাহে বাধা | প্রথমবার: ২ বছর জেল বা ২ লক্ষ টাকা জরিমানা। পুনরাবৃত্তি: ১০ বছর জেল বা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা । |
| অননুমোদিত নির্মাণ বা উচ্ছেদ নির্দেশ অমান্য | ২ বছর জেল বা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড । |
| কর্তৃপক্ষের সীমানা প্রাচীর/বাতি অপসারণ | ১ বছর জেল বা ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড । |
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (CoDA) কেন গঠন করা হলো?
কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এবং এর সন্নিহিত এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলাই এই কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য। অপরিকল্পিত নগরায়ন রোধ, পরিবেশ রক্ষা, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে এই কর্তৃপক্ষ কাজ করবে।
এর প্রধান কাজগুলো হলো:
- মহাপরিকল্পনা (Master Plan) তৈরি ও বাস্তবায়ন।
- ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং ইমারত নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া।
- রাস্তাঘাট প্রশস্তকরণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পার্ক নির্মাণ।
বাড়ি নির্মাণ ও পুকুর খননে নতুন কড়াকড়ি
অধ্যাদেশের ৩৪ ধারা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কুমিল্লায় এখন আর ইচ্ছেমতো কিছু করা যাবে না।
- ইমারত নির্মাণ: নতুন বাড়ি বা স্থাপনা তৈরি বা পুনর্নির্মাণ করতে হলে অবশ্যই কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
- জলাধার ও উঁচু জমি: পুকুর খনন, পুনঃখনন অথবা টিলা বা উঁচু জমি কাটার জন্যও অনুমতির প্রয়োজন হবে।
- শর্ত ভঙ্গ: অনুমতির শর্ত না মানলে কর্তৃপক্ষ সেই অনুমতি বাতিল করতে পারবে এবং কাজ বন্ধ করে দিতে পারবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এতদিন যারা সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা থেকে প্ল্যান পাস করাতেন, এখন থেকে তাদেরও এই কর্তৃপক্ষের নিয়ম মানতে হবে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (যেমন সিটি কর্পোরেশন) এখন আর এককভাবে ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদন দিতে পারবে না।
জমি ভরাট ও জলাশয় রক্ষায় কঠোর আইন
পরিবেশ রক্ষায় এই অধ্যাদেশে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ৩৬ ধারা অনুযায়ী:
- কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো নিচু জমি ভরাট করা যাবে না।
- নদী, খাল, বিল বা প্রাকৃতিক জলাশয়ের পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না।
- এই নিয়ম ভাঙলে প্রথমবার ২ বছরের জেল এবং পরবর্তী সময়ে ১০ বছর পর্যন্ত জেলের বিধান রাখা হয়েছে।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও জরিমানা
যদি কেউ অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে বাড়ি বা স্থাপনা তৈরি করেন, তবে ৪২ ধারা অনুযায়ী:
- সেই স্থাপনা অবৈধ বলে গণ্য হবে।
- নির্মাণকারীকে ২ বছর জেল বা ২০ লক্ষ টাকা জরিমানা গুনতে হতে পারে।
- কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলতে পারবে এবং ভাঙার খরচ মালিকের কাছ থেকে আদায় করবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: আমি কি নিজের জমিতে ইচ্ছেমতো বাড়ি করতে পারব না?
উত্তর: না। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী আপনার জমি যে জোনে পড়েছে (যেমন- আবাসিক বা বাণিজ্যিক), সেই অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় ১ বছরের জেল বা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা হতে পারে ।
প্রশ্ন: চলমান বাড়ি নির্মাণের কী হবে?
উত্তর: যদি নির্মাণ কাজ অনুমোদিত নকশা মেনে হয়, তবে সমস্যা নেই। কিন্তু নকশার বাইরে কিছু করলে কর্তৃপক্ষ কাজ বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে ।
প্রশ্ন: ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে কি?
উত্তর: যদি উন্নয়নের প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ আপনার জমি অধিগ্রহণ করে, তবে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে । কিন্তু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে না ।
শেষকথা
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের সচেতন হতে হবে। জমি কেনার আগে সেই জমির ব্যবহারযোগ্যতা (Land Use) সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের অফিস থেকে জেনে নিন। বাড়ি করার সময় সঠিক নকশা অনুমোদন করিয়ে নিন। মনে রাখবেন, সামান্য অবহেলা বা আইন অমান্য করলে আপনার সারা জীবনের সঞ্চয়ে গড়া বাড়িটি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬; বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।