ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৬

বাংলাদেশ সরকার ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় স্বচ্ছতা আনতে এবং যাত্রীদের হয়রানি বন্ধ করতে “ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬” জারি করেছে। এই নতুন আইনে অনলাইন ও অফলাইন এজেন্সির জন্য আলাদা ব্যাংক গ্যারান্টি, টিকিটের কৃত্রিম সংকট বা ‘ফলস বুকিং’ রোধে কঠোর শাস্তি এবং লাইসেন্স নবায়নের নিয়মে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে

আপনি যদি একজন ট্রাভেল এজেন্সি মালিক, উদ্যোক্তা বা বিদেশগামী যাত্রী হন, তবে এই আর্টিকেলে জেনে নিন নতুন আইনে আপনার জন্য কী কী পরিবর্তন এসেছে।

২০২৬ সালের অধ্যাদেশের মূল পরিবর্তনসমূহ

বিষয়আগের নিয়ম / সাধারণ ধারণানতুন নিয়ম (২০২৬)
লাইসেন্স নবায়নপ্রতি বছর (প্রচলিত)প্রতি ৩ (তিন) বছর পর পর
ব্যাংক গ্যারান্টি (অফলাইন)নির্দিষ্ট ছিল না/কম ছিল১০ (দশ) লক্ষ টাকা
ব্যাংক গ্যারান্টি (অনলাইন)নির্দিষ্ট ছিল না১ (এক) কোটি টাকা
শাস্তি/জরিমানাকম ছিল১ বছরের জেল বা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা

ট্রাভেল এজেন্সির নতুন সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিভাগ

২০১৩ সালের আইনটি সংশোধন করে সরকার এবার ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা যুক্ত করেছে।

অনলাইন বনাম অফলাইন এজেন্সি

এখন থেকে ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় অনলাইন এবং অফলাইন এই দুটি ক্যাটাগরি স্পষ্ট করা হয়েছে।

  • অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সি: যারা সশরীরে অফিস পরিচালনা করে সেবা দেয়। তাদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে ১০ লক্ষ টাকা
  • অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (OTA): যারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে টিকিট ও বুকিং সেবা দেয়। তাদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি ১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে ।

‘ফলস বুকিং’ বা বানোয়াট আসন সংরক্ষণ কী?

নতুন আইনের অন্যতম বড় সংযোজন হলো ‘ফলস বুকিং’-এর সংজ্ঞা। কোনো এজেন্সি যদি প্রকৃত যাত্রীর তথ্য না দিয়ে ভুয়া নাম ব্যবহার করে বিমানের সিট আটকে রাখে বা বাজারে টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তবে তাকে “ফলস বুকিং” বলা হবে এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ ।

টিকেট সিন্ডিকেট ও প্রতারণা রোধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা

যাত্রীদের, বিশেষ করে প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নিচের কাজগুলো এখন থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ:

  • সাব-এজেন্ট ব্যবসা বন্ধ: এক ট্রাভেল এজেন্সি অন্য ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না। অর্থাৎ, হাতবদল করে দাম বাড়ানো যাবে না ।
  • অতিরিক্ত অর্থ আদায়: আকাশপথে ভ্রমণের সুবিধার জন্য নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া যাবে না ।
  • মিথ্যা বিজ্ঞাপন: ডিসকাউন্ট, ক্যাশব্যাক বা চটকদার প্রলোভন দেখিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না, যদি তার বাস্তবিক ভিত্তি না থাকে ।
  • GDS অপব্যবহার: গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (GDS) বা এয়ারলাইন্সের লগইন আইডি ও পাসওয়ার্ড অন্য কাউকে শেয়ার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ।

অভিবাসী কর্মী ও প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা

বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে কাজ করতে যান, তাদের টিকেট নিয়ে কারসাজি বন্ধে এই অধ্যাদেশে বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছে:

  • গ্রুপ বুকিং জালিয়াতি: টিকেট কনফার্ম হওয়ার পর যাত্রীর তথ্য (Passenger Information) পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থাৎ, কম দামে আগে বুক করে পরে বেশি দামে অন্য যাত্রীর কাছে বিক্রি করা যাবে না ।
  • পেমেন্ট নিয়ম: অভিবাসী কর্মীদের টিকেট কেনার সময় ‘একত্রে অর্থ পরিশোধ’ (Consolidated Payment) করা যাবে না। স্বচ্ছতার জন্য আলাদা ট্রানজেকশন হতে হবে ।

লাইসেন্স নবায়ন ও বাতিলের নিয়ম

ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাতে লাইসেন্স নবায়নের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

  • মেয়াদ: এখন থেকে প্রতি ৩ (তিন) বছর পর পর নিবন্ধন সনদ নবায়ন করা যাবে ।
  • শর্ত: তবে প্রতি বছর এজেন্সির আর্থিক বিবরণীসহ বার্ষিক প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিতে হবে ।
  • বাতিল: যদি কোনো এজেন্সি ঋণ খেলাপি হয় বা জনস্বার্থ বিরোধী কাজ করে, তবে সরকার শুনানি ছাড়াই লাইসেন্স স্থগিত করতে পারবে ।

অপরাধ ও শাস্তির বিধান

আইন অমান্য করলে শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

  • শাস্তি: এই অধ্যাদেশের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ১ (এক) বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন ।
  • ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: প্রতারণা বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে ট্রাভেল এজেন্সির মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১. ট্রাভেল এজেন্সি লাইসেন্স করতে কত টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি লাগে?

উত্তর: ২০২৬ সালের নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সির জন্য ১০ লক্ষ টাকা এবং অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির (OTA) জন্য ১ কোটি টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে

২. ফলস বুকিং করলে কী শাস্তি হবে?

উত্তর: টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি বা ফলস বুকিং করলে ১ বছরের জেল এবং ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে ।

৩. আমি কি অন্য এজেন্সি থেকে টিকেট কিনে কাস্টমারকে দিতে পারব?

উত্তর: না। নতুন আইনের ৫ ধারার সংশোধনী অনুযায়ী, অন্য কোনো ট্রাভেল এজেন্সির নিকট হতে টিকেট ক্রয়-বিক্রয় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আপনাকে সরাসরি এয়ারলাইন্স বা জিডিএস থেকে টিকেট ইস্যু করতে হবে ।

৪. ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স কত বছর পর পর নবায়ন করতে হয়?

উত্তর: নতুন নিয়মে প্রতি ৩ (তিন) বছর পর পর লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে, তবে প্রতি বছর অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক

শেষ কথা

ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৬ মূলত ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং যাত্রীদের অধিকার রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যারা সৎভাবে ব্যবসা করতে চান, তাদের জন্য ৩ বছরের নবায়ন সুবিধাটি স্বস্তিদায়ক। তবে যারা সিন্ডিকেট বা টিকেট ব্লকিংয়ের সাথে জড়িত, তাদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা।

আপনার কি নতুন নিয়ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন আছে? কমেন্ট করে জানান। আমরা সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করব।

ডিসক্লেইমার: এই আর্টিকেলটি ‘বাংলাদেশ গেজেট, ১ জানুয়ারি, ২০২৬’-এর ওপর ভিত্তি করে সচেতনতামূলক উদ্দেশ্যে লেখা। আইনি জটিলতায় মূল গেজেট অনুসরণ করুন বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

সোর্স:

  • বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ১ জানুয়ারি, ২০২৬ (অধ্যাদেশ নং ০৩, ২০২৬)।

Leave a Comment