নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা

বাংলাদেশ সরকার ৯ম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ ঘোষণা করেছে, যেখানে সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করা হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তিন ধাপে এই বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

৯ম পে স্কেল ২০২৬ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে বহুল প্রতীক্ষিত সংবাদটি হলো ৯ম জাতীয় বেতন স্কেল। ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ ১১ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ সরকারি কর্মীদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

২০২৬ সালে এসে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, পে কমিশন এবং সচিব কমিটির ধারাবাহিক বৈঠক শেষে নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।

নতুন পে স্কেল ২০২৬-এর সর্বশেষ আপডেট (জুন ২০২৬)

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী:

  • ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তিন ধাপে নতুন পে স্কেল কার্যকর হবে বলে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
  • প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন।
  • অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি জুন মাসে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
  • সচিব কমিটির সভা শেষ হয়েছে এবং সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পুরো পে স্কেল একবারে না দিয়ে তিনটি অর্থবছরে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে:

  • প্রথম ধাপ (১ জুলাই ২০২৬): প্রস্তাবিত বর্ধিত মূল বেতনের ৫০% কার্যকর হবে।
  • দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২০২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি অংশ সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় হবে।
  • তৃতীয় ধাপ: ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর হবে।

৯ম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ — সম্পূর্ণ গ্রেড তালিকা

নিচে পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাবিত ২০টি গ্রেডের মূল বেতন (নতুন স্কেল) দেওয়া হলো। এই তালিকাটি আপলোড করা ৯ম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ চার্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে:

গ্রেডনতুন মূল বেতন (টাকা)অষ্টম স্কেলের বেতন (টাকা)আনুমানিক বৃদ্ধি
১,৬০,০০০ (নির্ধারিত)৭৮,০০০~১০৫%
১,৩২,০০০৬৬,০০০~১০০%
১,১৩,০০০৫৬,৫০০~১০০%
১,০০,০০০৫০,০০০~১০০%
৮৬,০০০৪৩,০০০~১০০%
৭৫,০০০৩৫,৫০০~১১১%
৬৮,০০০২৯,০০০~১৩৪%
৪৯,২০০২৩,০০০~১১৪%
৪৬,৫০০২২,০০০~১১১%
১০৩২,০০০১৬,০০০~১০০%
১১২৫,০০০১২,৫০০~১০০%
১২২৪,৩০০১১,০০০~১২১%
১৩২৪,০০০১১,০০০~১১৮%
১৪২৩,৩০০১০,২০০~১২৮%
১৫২২,৮০০৯,৭০০~১৩৫%
১৬২১,৯০০৯,৩০০~১৩৫%
১৭২১,৮০০৯,০০০~১৪২%
১৮২১,০০০৮,৮০০~১৩৯%
১৯২০,৫০০৮,৫০০~১৪১%
২০২০,০০০৮,২৫০~১৪২%

দ্রষ্টব্য: উপরের তালিকা পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী। চূড়ান্ত গেজেটে সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।

বেতন স্কেলের ধাপ ও দক্ষতার সিঁড়ি (ইনক্রিমেন্ট) কীভাবে কাজ করে?

৯ম পে স্কেলে প্রতিটি গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৮টি ধাপ (ইনক্রিমেন্ট) রয়েছে। প্রতি বছর বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে একজন কর্মীর বেতন ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে।

উদাহরণ হিসেবে গ্রেড ৯ (সর্বনিম্ন বেতন ৪৬,৫০০ টাকা):

  • ধাপ-১: ৪৮,৯৬০ টাকা
  • ধাপ-২: ৪৯,৩০ টাকা
  • …ক্রমে বাড়তে থাকবে।

ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতিতে পূর্ববর্তী বেতন থেকে নির্দিষ্ট হারে (সাধারণত ৫%) বৃদ্ধি পায়।

অষ্টম ও নবম পে স্কেল: মূল পার্থক্য কী?

বিষয়অষ্টম পে স্কেল (২০১৫)নবম পে স্কেল (২০২৬ প্রস্তাবিত)
সর্বনিম্ন বেতন৮,২৫০ টাকা২০,০০০ টাকা
সর্বোচ্চ বেতন৭৮,০০০ টাকা১,৬০,০০০ টাকা
গ্রেড সংখ্যা২০টি২০টি (বহাল)
গড় বেতন বৃদ্ধিপ্রায় ১০৫%
নিম্ন গ্রেডে বৃদ্ধি১৪০% পর্যন্ত
বিশেষ ভাতা১০% ও ১৫% আলাদানতুন স্কেলে সমন্বয় হবে

কারা এই পে স্কেলের আওতায় পড়বেন?

প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল নিচের শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য:

  • সকল সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী
  • আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা
  • স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা
  • বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা
  • সরকারি পেনশনভোগীরা (পেনশন প্রায় ১০০% বৃদ্ধির সুপারিশ)

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন কেন?

এবারের পে স্কেলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের জন্য বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ। ১১ থেকে ২০ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ১৪০% পর্যন্ত হতে পারে।

কারণগুলো হলো:

  • দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে
  • মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
  • সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সচিব কমিটির বিশেষ সুপারিশ

পে স্কেলের ইতিহাস: বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কতটি পে স্কেল হয়েছে?

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে মোট ৯টি জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা হয়েছে বা প্রক্রিয়াধীন:

১. ১ম পে স্কেল: ১৯৭৩ ২. ২য় পে স্কেল: ১৯৭৭ ৩. ৩য় পে স্কেল: ১৯৮২ ৪. ৪র্থ পে স্কেল: ১৯৮৫ ৫. ৫ম পে স্কেল: ১৯৯১ ৬. ৬ষ্ঠ পে স্কেল: ১৯৯৭ ৭. ৭ম পে স্কেল: ২০০৫ ৮. ৮ম পে স্কেল: ২০১৫ ৯. ৯ম পে স্কেল: ২০২৬ (প্রস্তাবিত, জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা)

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৫ বছরে একবার নতুন পে স্কেল আসার কথা। কিন্তু কোভিড মহামারি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ৯ম পে স্কেল বিলম্বিত হয়েছিল।

বর্তমান ১০% ও ১৫% বিশেষ ভাতা কী হবে?

২০২০ ও ২০২৩ সালে সরকার সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতনের ওপর যথাক্রমে ১০% ও ১৫% বিশেষ ভাতা দেওয়া শুরু করেছিল। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে এই বিশেষ ভাতাগুলো নতুন কাঠামোয় সমন্বয় করা হবে, আলাদাভাবে আর দেওয়া হবে না।

পেনশনভোগীরা কতটুকু সুবিধা পাবেন?

সচিব কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, সরকারি পেনশনভোগীদের পেনশন প্রায় ১০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের জন্য একটি বড় সুখবর।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

৯ম পে স্কেল কবে কার্যকর হবে?

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তিন ধাপে নতুন পে স্কেল কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০% পাওয়া যাবে।

নতুন পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন কত?

প্রস্তাবিত ৯ম পে স্কেলে সর্বনিম্ন (২০তম গ্রেড) মূল বেতন হবে ২০,০০০ টাকা, যা বর্তমানের ৮,২৫০ টাকা থেকে প্রায় ১৪২% বেশি।

সর্বোচ্চ বেতন কত হবে?

সর্বোচ্চ (১ম গ্রেড) মূল বেতন হবে ১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত), যা বর্তমান ৭৮,০০০ টাকার দ্বিগুণেরও বেশি।

৯ম পে স্কেলে গড়ে কত শতাংশ বেতন বাড়বে?

পে কমিশনের সুপারিশে গড়ে প্রায় ১০৫% বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। তবে নিম্ন গ্রেডে এই বৃদ্ধি ১৪০% পর্যন্ত হতে পারে।

গ্রেড কি পরিবর্তন হবে?

প্রস্তাবিত স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

নতুন পে স্কেলের গেজেট কখন প্রকাশ পাবে?

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী জুন ২০২৬ মাসে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এরপর ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে।

পে ফিক্সেশন কীভাবে হবে?

নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতিতে পুরনো বেতন থেকে নতুন গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করা হবে। এটি অর্থ মন্ত্রণালয় পরিপত্রে বিস্তারিত নির্দেশনা দেবে।

বেসরকারি চাকরিজীবীরা কি এই পে স্কেলের সুবিধা পাবেন?

না। ৯ম জাতীয় পে স্কেল শুধুমাত্র সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলে এই স্কেল অনুসরণ করতে পারবে।

শিক্ষকরা কি পে স্কেলের আওতায় পড়বেন?

সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরাসরি এই স্কেলের আওতায় পড়বেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আলাদা নির্দেশনা জারি হতে পারে।

কীভাবে নতুন বেতন হিসাব করবেন?

নতুন পে স্কেল চালু হলে আপনার মোট বেতন হবে:

মোট বেতন = মূল বেতন + বাড়িভাড়া ভাতা + চিকিৎসা ভাতা + যাতায়াত ভাতা + অন্যান্য ভাতা

উদাহরণ (গ্রেড ১০, ধাপ-১):

  • মূল বেতন: ৩২,০০০ টাকা
  • বাড়িভাড়া ভাতা: সাধারণত মূল বেতনের ৫০-৬৫%
  • চিকিৎসা ভাতা: সাধারণত ১,৫০০ টাকা (নতুন স্কেলে পরিবর্তিত হতে পারে)

ভাতার চূড়ান্ত হার গেজেট প্রকাশের পর নিশ্চিত হবে।

নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব কী হবে?

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের বার্ষিক বাড়তি ব্যয় হবে বলে অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন। এই কারণেই সরকার একসাথে না দিয়ে তিন ধাপে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।

অর্থনীতিতে এর প্রভাব:

  • ভোক্তা ব্যয় বাড়বে — অর্থনীতিতে গতি আসবে
  • আভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পাবে
  • নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মীদের জীবনমান উন্নত হবে
  • মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা চাপ পড়তে পারে (স্বল্পমেয়াদে)

সূত্র ও রেফারেন্স

এই আর্টিকেলের তথ্য নিচের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে:

  • বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ও সংবাদ সম্মেলন (মে-জুন ২০২৬)
  • দৈনিক ইত্তেফাক (ittefaq.com.bd) — মে ২০২৬
  • ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা (bangla.dhakatribune.com) — মে ২০২৬
  • banglakathan.com — জুন ২০২৬
  • bdgovtnotice.com — জুন ২০২৬
  • teachers.gov.bd — জুন ২০২৬

Leave a Comment