প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি?

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘প্রিজাইডিং অফিসার’ (Presiding Officer) শব্দটির সাথে আমরা পরিচিত। একটি ভোটকেন্দ্রের সামগ্রিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং ফলাফল ঘোষণার পূর্ণ দায়িত্ব থাকে তার কাঁধে। আপনি যদি এই দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বা এই পদের ক্ষমতা ও কাজ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হন, তবে আজকের এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য একটি কমপ্লিট গাইড।

প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি?

প্রিজাইডিং অফিসার হলেন একটি নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রের প্রধান প্রশাসনিক ও নির্বাহী কর্মকর্তা। তার প্রধান কাজ হলো ভোটকেন্দ্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা, ভোট গণনা করা এবং ফলাফল বিবরণী তৈরি করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেওয়া। সহজ কথায়, একটি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে তিনিই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।

প্রিজাইডিং অফিসারের বিস্তারিত দায়িত্ব

নির্বাচন কমিশনের (EC) নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রিজাইডিং অফিসারকে নির্বাচনের দুই দিন আগে থেকে ফলাফল জমা দেওয়া পর্যন্ত কয়েক ধরণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়।

১. নির্বাচনের আগের প্রস্তুতি (প্রাক-ভোটগ্রহণ)

  • সরঞ্জাম সংগ্রহ: রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, অমোচনীয় কালি এবং অন্যান্য নির্বাচনী সামগ্রী বুঝে নেওয়া।
  • কেন্দ্র পরিদর্শন: নির্বাচনের আগের দিন সশরীরে কেন্দ্রে গিয়ে সীমানা নির্ধারণ এবং বুথ বা ভোটকক্ষ সাজানো নিশ্চিত করা।
  • সমন্বয়: কেন্দ্রে নিয়োজিত পুলিশ, আনসার বা অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা করা।

২. ভোটগ্রহণের দিন (সকাল থেকে বিকাল ৪টা)

  • পোলিং এজেন্ট নিয়োগ: প্রার্থীদের এজেন্টদের পরিচয়পত্র যাচাই করে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া।
  • খালি ব্যালট বাক্স প্রদর্শন: ভোট শুরুর আগে পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে ব্যালট বাক্স খালি কি না তা নিশ্চিত করে সিলগালা করা।
  • ভোটগ্রহণ তদারকি: সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা ঠিকমতো কাজ করছেন কি না এবং ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারছেন কি না তা দেখা।
  • শৃঙ্খলা বজায় রাখা: কেন্দ্রের ভেতরে কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে প্রয়োজনে ভোটগ্রহণ সাময়িকভাবে বন্ধ করার ক্ষমতা তার আছে।

৩. ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা (ভোট পরবর্তী কাজ)

  • ব্যালট গণনা: ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর পোলিং এজেন্টদের সামনে ব্যালট বাক্স খোলা এবং গণনা করা।
  • ফলাফল বিবরণী (ফরম-১১ ও ১২): প্রতিটি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সঠিক হিসাব তৈরি করা এবং উপস্থিত পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর নিয়ে ফলাফল ঘোষণা করা।
  • সামগ্রী ফেরত: গণনা শেষে যাবতীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম ও ফলাফল বিবরণী অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সরাসরি রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেওয়া।

প্রিজাইডিং অফিসারের বিশেষ ক্ষমতা ও আইনি অধিকার

একজন প্রিজাইডিং অফিসার কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তাই নন, নির্বাচনের দিন তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মতো কিছু বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করেন:

  1. গ্রেপ্তারের নির্দেশ: যদি কেউ ভোটকেন্দ্রে আইন ভঙ্গ করে বা জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তিনি তাৎক্ষণিক তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন।
  2. ভোট বন্ধের ক্ষমতা: যদি কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তিনি রিটার্নিং অফিসারকে জানিয়ে ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে পারেন।

সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা

১. প্রিজাইডিং অফিসার পদে কারা নিয়োগ পান?

সাধারণত সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কলেজ শিক্ষক বা অভিজ্ঞ ব্যাংক কর্মকর্তারাও এই দায়িত্ব পান।

২. সহকারী প্রিজাইডিং ও প্রিজাইডিং অফিসারের পার্থক্য কী?

প্রিজাইডিং অফিসার পুরো কেন্দ্রের প্রধান। অন্যদিকে, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার একটি নির্দিষ্ট বুথ বা ভোটকক্ষের প্রধান হিসেবে কাজ করেন এবং প্রিজাইডিং অফিসারকে রিপোর্ট করেন।

৩. পোলিং এজেন্ট বের করে দিলে করণীয় কী?

যদি কোনো পোলিং এজেন্টকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়, তবে প্রিজাইডিং অফিসারকে সাথে সাথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তাকে পুনরায় কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।

নির্বাচনী কাজে সফল হওয়ার টিপস

নির্বাচন পরিচালনা একটি সংবেদনশীল কাজ। সফলভাবে এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:

  • ডায়েরি মেইনটেইন করুন: দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো লিখে রাখুন।
  • সিল ও স্বাক্ষর: প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ফরমে নিজের অফিশিয়াল সিল ও স্বাক্ষর নিশ্চিত করুন।
  • নিরপেক্ষতা: আপনার আচরণে যেন কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ না পায়।
  • যোগাযোগ: রিটার্নিং অফিসারের নম্বর সর্বদা হাতের কাছে রাখুন।
  • ধৈর্য: ভোটারদের ভিড় বা উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নিন।

তথ্যসূত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা (Sources)

এই নিবন্ধটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (Election Commission of Bangladesh) কর্তৃক প্রকাশিত ‘ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নির্দেশিকা’ এবং আরপিও (Representation of the People Order, 1972) এর আলোকে প্রণয়ন করা হয়েছে।

Leave a Comment