রোজা রাখার দোয়া ও রোজার ফজিলত

রোজা রাখার নিয়তের দোয়া হলো: “نَوَيْتُ أَنْ أَصُوْمَ غَدًا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّلْ مِنِّيْ إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْم”

বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা গাদান মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি ফারদান লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আন্তাস সামিউল আলিম।

বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজান মাসে তোমার পক্ষ থেকে ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। তুমি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বরকতময় মাস। এই মাসে রোজা রাখা ফরজ ইবাদত। কিন্তু অনেকেই জানতে চান রোজার নিয়তের সঠিক দোয়া কী? ইফতারের দোয়া কোনটি? রোজার ফজিলত কতটুকু? এই আর্টিকেলে আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সবকিছু বিস্তারিত আলোচন করব।

রোজা রাখার দোয়া ও নিয়ত (আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ)

রোজার নিয়ত মুখে বলা সুন্নাহ, তবে মনে মনে নিয়ত করাই মূল। ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন, প্রতিটি ফরজ রোজার জন্য পৃথক নিয়ত করা আবশ্যক। নিচে সহুরের সময় পড়ার নিয়তের দোয়া দেওয়া হলো:

রোজার নিয়তের দোয়া (আরবি)

نَوَيْتُ أَنْ أَصُوْمَ غَدًا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّلْ مِنِّيْ إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْم

উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা গাদান মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি ফারদান লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আন্তাস সামিউল আলিম।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল তোমার সন্তুষ্টির জন্য পবিত্র রমজান মাসের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। তুমি আমার রোজা কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

নিয়ত কি অবশ্যই আরবিতে করতে হবে?

না। ইসলামি শরিয়তে নিয়ত মানে অন্তরের সংকল্প। আরবিতে দোয়া পড়া সুন্নাহসম্মত, কিন্তু বাংলায়ও নিয়ত করা শুদ্ধ। মূল বিষয় হলো মনে মনে এই সংকল্প করা যে — “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রমজানের ফরজ রোজা রাখছি।”

ইফতারের দোয়া

ইফতারের সময় নিচের দোয়াটি পড়া সুন্নাহ। এটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত:

اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্যই রোজা রেখেছি এবং তোমার দেওয়া রিজিক দ্বারা ইফতার করলাম।

📌 সূত্র: আবু দাউদ: ২৩৫৮, সনদ হাসান।

ইফতারের আরেকটি দোয়া

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

উচ্চারণ: জাহাবাজ জামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশা-আল্লাহ।

অর্থ: পিপাসা দূর হয়ে গেল, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং ইনশাআল্লাহ সওয়াব প্রতিষ্ঠিত হলো।

📌 সূত্র: আবু দাউদ: ২৩৫৭, সনদ হাসান।

রোজার ফজিলত [কুরআন ও হাদিসের আলোকে]

রোজার ফজিলত বা মর্যাদা অত্যন্ত বিশাল। নিচে কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে রোজার ফজিলতের মূল পয়েন্টগুলো তুলে ধরা হলো:

কুরআনে রোজার ফজিলত

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর — যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” — সূরা আল-বাকারা: ১৮৩

হাদিসে রোজার ফজিলত

✦ রোজার পুরস্কার আল্লাহ নিজে দেবেন

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আদম সন্তানের প্রতিটি আমলের পুরস্কার বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকি দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত। কিন্তু আল্লাহ বলেন: রোজা এর ব্যতিক্রম, কারণ রোজা আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর পুরস্কার দেব।” — সহিহ বুখারি: ১৯০৪, সহিহ মুসলিম: ১১৫১

✦ রোজাদারের মুখের গন্ধ মিশকের চেয়েও উত্তম

নবী করিম (সা.) বলেছেন: “রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধের চেয়েও উত্তম।” — সহিহ বুখারি: ১৮৯৪

✦ রোজা জাহান্নাম থেকে ঢাল

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “রোজা হলো ঢালস্বরূপ। সুতরাং (রোজাদার) যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং মূর্খতার আচরণ না করে।” — সহিহ বুখারি: ১৮৯৪

✦ রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ

নবীজি (সা.) বলেছেন: “রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে: একটি ইফতারের সময় এবং অপরটি তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়।” — সহিহ বুখারি: ১৯০৪

✦ রমজানে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যখন রমজান মাস আসে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলে বেঁধে দেওয়া হয়।” — সহিহ বুখারি: ১৮৯৮

রোজা রাখার নিয়ম

রোজা সঠিকভাবে পালন করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

  1. সুবহে সাদিকের আগে (ফজরের আজানের আগে) সেহরি খান এবং রোজার নিয়ত করুন।
  2. সারাদিন পানাহার, যৌনক্রিয়া এবং রোজা ভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকুন।
  3. বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত, জিকির ও নফল নামাজ পড়ুন।
  4. সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতারের দোয়া পড়ে ইফতার শুরু করুন।
  5. তারাবির নামাজ পড়ুন — এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
  6. রমজানের শেষ দশ রাতে বেশি ইবাদত করুন এবং লাইলাতুল কদর তালাশ করুন।

রোজা ভঙ্গের কারণ ও মাকরুহ বিষয়সমূহ

যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায় (কাজা ওয়াজিব হয়):

  • ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা।
  • স্বামী-স্ত্রীর মিলন করা (এতে কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব)।
  • ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে।
  • নাকে বা কানে ওষুধ দেওয়া।

রোজার মাকরুহ কাজ:

  • অকারণে কোনো জিনিস চিবানো বা চাখা।
  • কুলি করার সময় অতিরিক্ত পানি ভেতরে নেওয়া।
  • রোজা রেখে ঝগড়া, গালিগালাজ বা অশ্লীল কথা বলা।
  • সারাদিন শুয়ে-বসে থাকা এবং ইবাদতে উদাসীন থাকা।

রমজান মাসের ফজিলত ও বিশেষ আমল

রমজান মাসে কিছু বিশেষ আমল রয়েছে যা বাকি মাসের তুলনায় বহুগুণ বেশি সওয়াব বহন করে:

  • তারাবির নামাজ: ২০ রাকাত সুন্নাত। এতে পুরো কুরআন খতম করা মুস্তাহাব।
  • লাইলাতুল কদর তালাশ: শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতে ইবাদত করুন।
  • ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে অবস্থান করা সুন্নাত।
  • দান-সদকা: রমজানে দান করলে সওয়াব ৭০ গুণ বৃদ্ধি পায়।
  • কুরআন তেলাওয়াত: প্রতিটি হরফে ১০ নেকি, রমজানে তা বহুগুণ বেশি।
  • ফিতরা আদায়: ঈদুল ফিতরের আগে গরিবদের ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব।

সেহরির গুরুত্ব ও দোয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।” — সহিহ বুখারি: ১৯২৩। সেহরি না খেলেও রোজা হবে, কিন্তু সেহরি ছাড়া রোজা রাখা মাকরুহ। সেহরির সময় শেষ হওয়ার আগে ফজরের আজান হলে খাওয়া বন্ধ করুন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: রোজার নিয়ত কখন করতে হয়?

রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগে (ফজরের আজানের আগে) করতে হবে। সর্বোত্তম হলো সেহরির পরে নিয়ত করা। তবে যদি কেউ ভুলে রাতে নিয়ত না করেন, তাহলে কেউ কেউ বলেছেন দুপুরের আগেও নিয়ত করা যাবে — তবে এটি নিয়ে মতভেদ আছে, তাই রাতেই নিয়ত করা উত্তম।

প্রশ্ন ২: ইনজেকশন নিলে কি রোজা ভাঙে?

সাধারণ ইনজেকশন (যেমন ইনসুলিন, অ্যান্টিবায়োটিক) নিলে অধিকাংশ ফুকাহার মতে রোজা ভাঙে না। তবে গ্লুকোজ বা পুষ্টিকর ইনজেকশন নিলে রোজা ভেঙে যাবে বলে অনেকে মত দিয়েছেন। যেকোনো সন্দেহে বিশ্বস্ত আলেমের কাছ থেকে ফতোয়া নেওয়া উত্তম।

প্রশ্ন ৩: অসুস্থ ব্যক্তি কি রোজা না রেখে পরে কাজা করতে পারবেন?

হ্যাঁ। আল্লাহ বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অসুস্থ থাকবে বা সফরে থাকবে, সে অন্য দিনগুলোতে এই সংখ্যা পূরণ করবে।” — সূরা আল-বাকারা: ১৮৪। দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় ফিদিয়া (প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাবার দেওয়া) দেওয়া যাবে।

প্রশ্ন ৪: মিথ্যা বললে কি রোজা ভাঙে?

না, মিথ্যা বললে রোজা ভাঙে না — কিন্তু রোজার সওয়াব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও তদানুযায়ী আমল ছাড়তে পারেনি, আল্লাহর কাছে তার পানাহার ত্যাগের কোনো প্রয়োজন নেই।” — সহিহ বুখারি: ১৯০৩।

প্রশ্ন ৫: গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মহিলার রোজার বিধান কী?

গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মহিলা নিজের বা শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে রোজা না রেখে পরে কাজা করতে পারবেন। অধিকাংশ আলেম বলেছেন, কাজার পাশাপাশি ফিদিয়া দেওয়া উচিত — তবে শুধু কাজাই যথেষ্ট বলেও মত আছে।

প্রশ্ন ৬: রোজার কাফফারা কী?

রমজান মাসে দিনের বেলায় ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামী-স্ত্রীর মিলনে কাফফারা ওয়াজিব হয়। কাফফারা হলো: (১) একজন দাস মুক্ত করা, অথবা (২) ক্রমাগত ৬০টি রোজা রাখা, অথবা (৩) ৬০ জন মিসকিনকে খাবার দেওয়া।

শেষকথা

রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি এবং এটি তাকওয়া অর্জনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। রোজার নিয়তের দোয়া সঠিকভাবে পড়া, ইফতারের সময় দোয়া পড়া এবং রমজান মাসজুড়ে বেশি বেশি ইবাদত করা — এই তিনটি জিনিস আপনার রমজানকে সত্যিকার অর্থে পরিপূর্ণ করবে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের রোজা কবুল করুন। আমিন।

📚 সূত্রসমূহ:

  • সহিহ আল-বুখারি — ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি
  • সহিহ মুসলিম — ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ
  • সুনান আবু দাউদ — ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানি
  • কুরআনুল কারিম — সূরা আল-বাকারা: ১৮৩-১৮৫

📅 প্রকাশকাল: রমজান ২০২৫  |  সর্বশেষ রিভিউ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫

Leave a Comment