বাংলাদেশ সরকার গত ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে নতুন “সামাজিক বনায়ন বিধিমালা, ২০২৬” প্রকাশ করেছে । এই নতুন বিধিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বনায়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং লভ্যাংশ বন্টনের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করা। আপনি যদি সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে সরকারি বা নিজস্ব জমিতে গাছ লাগিয়ে লাভবান হতে চান, তবে এই নতুন নিয়মগুলো জানা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
নিচে সহজ ভাষায় নতুন বিধিমালার খুঁটিনাটি তুলে ধরা হলো।
এক নজরে: সামাজিক বনায়ন কী?
সহজ কথায়, সামাজিক বনায়ন হলো স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে পরিচালিত বনায়ন কার্যক্রম । এটি মূলত সরকারি বনভূমি, রাস্তার ধার, বাঁধ বা রেলপথের পাশে এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে করা হয়। এই কার্যক্রমের মূল আকর্ষণ হলো, গাছ বড় হওয়ার পর তা বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তার একটি বড় অংশ স্থানীয় সুবিধাভোগীরা (অংশীজন) পান।
কারা ‘সুবিধাভোগী’ হিসেবে নির্বাচিত হতে পারবেন?
সামাজিক বনায়নের মূল লক্ষ্য হলো দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সহায়তা করা। নতুন বিধিমালা ২০২৬ অনুযায়ী, বনায়ন এলাকার ১ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য থেকে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে:
- ভূমিহীন বা স্বল্প জমির মালিক: যাদের কোনো জমি নেই বা ৫০ শতাংশের কম জমি আছে ।
- নারী: বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা বা দুঃস্থ নারী ।
- ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী: ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দুঃস্থ সদস্যরা ।
- প্রতিবন্ধী: অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ ।
- অনগ্রসর গোষ্ঠী: সমাজের অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: মোট নির্বাচিত সুবিধাভোগীদের মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ (৩৩%) নারী হতে হবে । এছাড়া, একজন ব্যক্তি কেবল একটি সামাজিক বনায়ন চুক্তিতেই অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন ।
গাছ বিক্রির টাকা বা লভ্যাংশ বন্টন
এটিই মানুষের সবচেয়ে বড় জানার বিষয়। গাছ কাটার পর টাকার ভাগ কে কত পাবে? বিধিমালা ২০২৬ অনুযায়ী লভ্যাংশ বন্টনের হার নিচে দেওয়া হলো:
১. বন বিভাগের জমিতে
যদি বন বিভাগের নির্ধারিত জোনে বাগান করা হয়, তবে টাকার ভাগ হবে নিম্নরূপ:
- স্থানীয় সুবিধাভোগী (আপনি): ৪৫%
- বন অধিদপ্তর: ৪৫%
- বৃক্ষরোপণ তহবিল: ১০%
২. সরকারি বা অন্য সংস্থার জমিতে ‘স্ট্রিপ বাগান’ (রাস্তা/বাঁধ/রেলপথ)
রাস্তা, বাঁধ বা রেলপথের ধারে যে বাগান (স্ট্রিপ বাগান) করা হয়, সেখানে সুবিধাভোগীরা সবচেয়ে বেশি লাভ পাবেন:
- স্থানীয় সুবিধাভোগী (আপনি): ৫৫%
- বন অধিদপ্তর: ১০%
- ভূমির মালিক সংস্থা: ২০%
- স্থানীয় পরিষদ (ইউনিয়ন/পৌরসভা): ৫%
- বৃক্ষরোপণ তহবিল: ১০%
৩. ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে
যদি আপনি নিজের জমিতে সামাজিক বনায়ন করেন, তবে হিসাবটি খুব সহজ:
- জমির মালিক: ৫০%
- স্থানীয় অংশীজন: ৫০%
সুবিধাভোগীর দায়িত্ব ও কর্তব্য
টাকার ভাগ পেতে হলে আপনাকে কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে। চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর আপনার প্রধান কাজগুলো হলো: ১. বাগান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করা । ২. চারা রোপণ এবং নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করা । ৩. গাছের ডালপালা ছাঁটাই (pruning) এবং জঙ্গল পরিষ্কার রাখা । ৪. কেউ যেন অবৈধভাবে গাছ কাটতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা এবং বন বিভাগকে জানানো ।
আবেদন করবেন কীভাবে?
সামাজিক বনায়নে যুক্ত হতে চাইলে আপনাকে স্থানীয় বন বিভাগের অফিস বা সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে হবে। সাধারণত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (মেম্বার/চেয়ারম্যান) এবং বন বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি সুবিধাভোগী নির্বাচন করে থাকে ।
প্রয়োজনীয় তথ্য:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)।
- স্থায়ী বাসিন্দার প্রমাণপত্র।
- দুঃস্থ বা ভূমিহীন হওয়ার স্বপক্ষে সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
শেষকথা: সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০২৬ বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আয়ের একটি দারুণ সুযোগ। বিশেষ করে রাস্তার ধারের স্ট্রিপ বাগানে ৫৫% লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আপনিও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন। আজই আপনার নিকটস্থ বন অফিসে খোঁজ নিন।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।