বিদেশ থেকে মোবাইল আনার নিয়ম ২০২৬: ট্যাক্স ছাড়া কয়টি ফোন আনা যাবে?

২০২৬ সালের নতুন ব্যাগেজ রুলস এবং সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিদেশ থেকে দেশে আসার সময় বিএমইটি (BMET) কার্ডধারী প্রবাসীরা কোনো প্রকার শুল্ক বা ট্যাক্স ছাড়া মোট ৩টি মোবাইল ফোন (নিজের ব্যবহৃত ১টি এবং সম্পূর্ণ নতুন ২টি) আনতে পারবেন। অন্যদিকে, সাধারণ যাত্রী বা যাদের বিএমইটি কার্ড নেই, তারা শুল্ক ছাড়া মোট ২টি ফোন (নিজের ব্যবহৃত ১টি এবং নতুন ১টি) আনতে পারবেন। দেশে আসার পর এই ফোনগুলো প্রথম ৬০ দিন কোনো ধরনের রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই ব্যবহার করা যাবে। এর চেয়ে বেশি ফোন আনলে কাস্টমস ডিউটি দিতে হবে।

আপনি কি প্রবাস থেকে দেশে ফিরছেন এবং সাথে করে আত্মীয়-স্বজন বা নিজের জন্য নতুন মোবাইল আনার কথা ভাবছেন? তাহলে দেশে ফেরার আগে অবশ্যই আপনার “বিদেশ থেকে মোবাইল আনার নিয়ম ২০২৬” সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা উচিত। কারণ, এয়ারপোর্টে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা বা কাস্টমসের জরিমানা এড়াতে আপডেটেড নিয়মটি জানা অত্যন্ত জরুরি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার, এনবিআর (NBR), বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি (BTRC) প্রবাসীদের সুবিধার্থে ব্যাগেজ রুলে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। চলুন, এই নির্দেশিকা থেকে জেনে নিই একজন যাত্রী ঠিক কয়টি ফোন আনতে পারবেন এবং এর পেছনের আইনি প্রক্রিয়াগুলো কী কী। এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সরকারি নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

বিএমইটি (BMET) কার্ডধারী প্রবাসীদের জন্য মোবাইল আনার নিয়ম

সরকার দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিশেষ সম্মান জানিয়ে তাদের জন্য মোবাইল আনার ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা প্রদান করেছে:

  • বিনা শুল্কে ৩টি ফোন: যেসব প্রবাসীর বৈধ BMET রেজিস্ট্রেশন কার্ড আছে, তারা শুল্ক বা ট্যাক্স ছাড়াই সর্বোচ্চ ৩টি স্মার্টফোন সাথে নিয়ে আসতে পারবেন।
  • হিসাবটি কেমন হবে? আপনি আপনার নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের ১টি পুরোনো ফোনের পাশাপাশি বক্সে থাকা সম্পূর্ণ নতুন আরও ২টি ফোন বিনামূল্যে দেশে আনতে পারবেন।
  • ৪র্থ ফোনের ক্ষেত্রে: যদি ৩টির বেশি অর্থাৎ ৪র্থ কোনো ফোন আনতে চান, তবে নিয়ম অনুযায়ী সেটির জন্য এয়ারপোর্টে নির্ধারিত ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে।

সাধারণ যাত্রী বা নন-বিএমইটি কার্ডধারীদের জন্য নিয়ম

যারা স্টুডেন্ট ভিসায়, টুরিস্ট ভিসায় ভ্রমণ করেছেন বা যেসব প্রবাসীর কাছে BMET কার্ড নেই, তাদের জন্যও চমৎকার সুবিধা রয়েছে:

  • বিনা শুল্কে ২টি ফোন: ব্যক্তিগত ব্যবহারের ১টি পুরোনো ফোনের সাথে নতুন আরও ১টি ফোন (সর্বমোট ২টি ফোন) কোনো ট্যাক্স ছাড়াই আনা যাবে।
  • অতিরিক্ত ফোনের শুল্ক: এর বাইরে ২টির বেশি নতুন ফোন আনলে অতিরিক্ত প্রতিটি ফোনের জন্য নির্দিষ্ট কাস্টমস শুল্ক দিতে হবে।

ট্যাক্স দিয়ে সর্বোচ্চ কয়টি ফোন আনা যাবে?

অনেকেরই প্রশ্ন থাকে, শুল্ক দিয়ে সর্বোচ্চ কয়টি মোবাইল দেশে প্রবেশ করানো যায়।

  • সর্বোচ্চ লিমিট ৮টি ফোন: বিদ্যমান ব্যাগেজ রুলস অনুযায়ী একজন ব্যক্তি বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত কোটা এবং শুল্কযুক্ত কোটা মিলিয়ে মোট ৮টি মোবাইল ফোন আনতে পারবেন।
  • কাস্টমস ডিউটি (ট্যাক্স): বিনা শুল্কের কোটা পার হওয়ার পর বাকি ফোনগুলোর জন্য আনুমানিক ৫৯% থেকে ৬১% কাস্টমস শুল্ক বা ট্যাক্স দিতে হবে। উল্লেখ্য, সরকার দেশে মোবাইলের আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর লক্ষ্যে কাজ করছে।

কত দিন বিনা রেজিস্ট্রেশনে ফোন চালানো যাবে? (৬০ দিনের সুবিধা)

প্রবাসীদের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা হলো—বিদেশ থেকে আনা ফোন বাংলাদেশে কাজ করবে কি না।

  • ৬০ দিন ফ্রি ব্যবহার: দেশে আসার পর প্রবাসীরা প্রথম ৬০ দিন (২ মাস) পর্যন্ত কোনো ধরনের বিটিআরসি রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই যেকোনো লোকাল সিম দিয়ে স্মার্টফোনটি স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারবেন।
  • ৬০ দিনের পর করণীয়: ২ মাসের বেশি সময় দেশে অবস্থান করলে বা ফোনটি দেশে স্থায়ীভাবে কাউকে দিয়ে দিলে, ফোনটি বিটিআরসি (BTRC)-এর নিয়মানুযায়ী বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসার কপি আপলোড করে অনলাইনে নিজের নামে নিবন্ধন (NEIR) করে নিতে হবে।

বিমানবন্দরে কাস্টমস চেকিং-এর জন্য স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড

এয়ারপোর্টে যেকোনো ধরনের হয়রানি থেকে বাঁচতে এবং দ্রুত ইমিগ্রেশন পার হতে নিচের স্টেপগুলো ফলো করুন:

  1. ক্রয়ের বৈধ রশিদ সাথে রাখুন: আপনি বিদেশ থেকে যে নতুন ফোনগুলো কিনেছেন, তার লিগ্যাল মেমো বা ক্রয়ের আসল কাগজপত্র অবশ্যই নিজের সাথে রাখুন। চোরাচালান রোধ করতে এটি এখন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
  2. ডিক্লারেশন ফর্ম পূরণ করুন: শুল্কমুক্ত সীমার চেয়ে বেশি ফোন আনলে এয়ারপোর্টের কাস্টমসের ‘ব্যাগেজ ডিক্লারেশন ফর্মে’ অবশ্যই সঠিক তথ্য দিন। কোনো তথ্য লুকাবেন না।
  3. শুল্ক পরিশোধ করুন: অতিরিক্ত ফোন থাকলে বিমানবন্দরে নির্ধারিত কাস্টমস বুথে শুল্ক পরিশোধ করে ক্লিয়ারেন্স রসিদ সংগ্রহ করুন।
  4. জরিমানা থেকে সাবধান: স্ক্যানিং মেশিনে অতিরিক্ত ফোন ধরা পড়লে এবং আপনি ডিক্লারেশন না দিলে শুল্কের পাশাপাশি জরিমানাও হতে পারে। এমনকি ফোন সাময়িক বাজেয়াপ্ত করে ডিএম (Detention Memo) দেওয়া হতে পারে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন ১: আমি কি ইনটেক বক্সসহ নতুন মোবাইল আনতে পারব?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই বক্সসহ আনতে পারবেন। বিএমইটি কার্ড থাকলে সর্বোচ্চ ২টি নতুন ফোন এবং সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে ১টি নতুন ফোন বক্সসহ ট্যাক্স-ফ্রি আনা যাবে।

প্রশ্ন ২: বিদেশ থেকে আনা মোবাইলের ট্যাক্স বা কাস্টমস ডিউটি কত ২০২৬?

উত্তর: ট্যাক্স-ফ্রি লিমিট বা শুল্কমুক্ত সীমার পর প্রতিটি মোবাইলের জন্য ক্রয়মূল্যের ওপর আনুমানিক ৫৯%-৬১% কাস্টমস শুল্ক পরিশোধ করতে হয়।

প্রশ্ন ৩: প্রবাসীরা ট্যাক্স ছাড়া সর্বমোট কয়টি মোবাইল আনতে পারবেন?

উত্তর: বিএমইটি (BMET) কার্ডধারী প্রবাসীরা ট্যাক্স ছাড়া মোট ৩টি (১টি ব্যবহৃত + ২টি নতুন) এবং সাধারণ প্রবাসীরা মোট ২টি (১টি ব্যবহৃত + ১টি নতুন) ফোন আনতে পারবেন।

প্রশ্ন ৪: বিদেশ থেকে আনা ফোন বিটিআরসিতে কীভাবে নিবন্ধন করব?

উত্তর: বিটিআরসির অফিসিয়াল পোর্টাল neir.btrc.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে সাইন-আপ করুন। এরপর আপনার পাসপোর্ট, ভিসা বা ইমিগ্রেশন সিলের কপি এবং ফোনের আইএমইআই (IMEI) নম্বর দিয়ে সহজেই অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারবেন।

শেষকথা

আশা করি, বিদেশ থেকে মোবাইল আনার নিয়ম ২০২৬ সম্পর্কে আপনার আর কোনো দ্বিধা বা কনফিউশন নেই। সঠিক নিয়মনীতি জেনে এবং ক্রয়ের লিগ্যাল ডকুমেন্টস সাথে নিয়ে ভ্রমণ করলে বিমানবন্দরে আপনাকে কোনো ধরনের ভোগান্তি বা অর্থনৈতিক লোকসান পোহাতে হবে না। আপনার বিদেশ ভ্রমণ নিরাপদ ও আনন্দদায়ক হোক!

(বি.দ্র: সরকারি নিয়মাবলি পরিবর্তনশীল। তাই ভ্রমণের পূর্বে প্রয়োজনে সর্বশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপন বা কাস্টমস হেল্পডেস্ক থেকে আপডেটটি নিশ্চিত করে নিতে পারেন।)

তথ্যের উৎস: বিটিআরসি (BTRC), বাংলাদেশ কাস্টমস ব্যাগেজ রুলস এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)।

Leave a Comment