স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) আইন ২০২৬: ই-রিক্সা ও প্রশাসক নিয়োগের নতুন নিয়ম

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬ হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি নতুন সংশোধিত আইন, যা মূলত সিটি কর্পোরেশন এলাকায় শ্লথগতির যানবাহন বা ই-রিক্সা চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন পরিচালনায় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছে । এই আইনের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিক্সার (ই-রিক্সা) সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লাইসেন্স ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । পাশাপাশি, জনস্বার্থে সরকার চাইলে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বা কাউন্সিলরদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে ।

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬ কী?

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত এবং ১০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতিপ্রাপ্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ । এই আইনটি মূলত ২০০৯ সালের মূল আইনের (২০০৯ সনের ৬০ নং আইন) কিছু ধারা সংশোধন, বিলুপ্তি ও নতুন ধারা সন্নিবেশিত করে অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে

এই সংশোধনীতে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ই-রিক্সা ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

ই-রিক্সা ও শ্লথগতির যানবাহনের নতুন নিয়মাবলি

সিটি কর্পোরেশন এলাকায় যানজট ও দুর্ঘটনা এড়াতে নতুন আইনে শ্লথগতির যানবাহন এবং ই-রিক্সার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে:

  • সংজ্ঞা ও গতিসীমা: মানবচালিত, পশুচালিত, প্যাডেলচালিত অথবা ৩ (তিন) চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিক্সাকে (ই-রিক্সা) শ্লথগতির যানবাহন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে । কাঠামোগত নকশা অনুযায়ী এসব যানের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩০ (ত্রিশ) কিলোমিটার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে হবে ।
  • নিবন্ধন বাধ্যতামূলক: সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক প্রদত্ত লাইসেন্স এবং নিবন্ধন ছাড়া নগরীতে কোনো শ্লথগতির সাধারণ যানবাহন রাখা, ভাড়া দেওয়া বা চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে ।
  • শাস্তিযোগ্য অপরাধ: লাইসেন্স ছাড়া যান চালানো, অনুমোদিত গতিসীমা অতিক্রম করা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বা অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ ।
  • বিপজ্জনক আচরণ: মোটর বা কাঠামো পরিবর্তন, নিষিদ্ধ এলাকায় বা বিপজ্জনকভাবে চালানো, যাত্রী ছাড়া মালামাল পরিবহন, সিগন্যাল অমান্য করা এবং দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার মতো কাজগুলো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ।

ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সুরক্ষা

পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ই-রিক্সার ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা যোগ করা হয়েছে:

  • নির্ধারিত স্থানেই ই-রিক্সায় ব্যবহৃত ব্যাটারি রিচার্জ করতে হবে ।
  • ব্যবহৃত ব্যাটারি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে বিনষ্ট বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য (Recycle) করার ব্যবস্থা থাকতে হবে ।
  • বাস চলাচলের রুটে ই-রিক্সা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে এবং কর্পোরেশন অনুমোদিত অঞ্চলেই এর চলাচল সীমাবদ্ধ করা হবে ।

মেয়র অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগে সরকারের নতুন ক্ষমতা

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এই আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সাহায্য করবে:

  • মেয়র ও কাউন্সিলর অপসারণ: কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যাবশ্যক বিবেচনা করলে বা বৃহত্তর জনস্বার্থে, সরকার যে কোনো বা সকল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলরগণকে তাদের পদ থেকে অপসারণ করতে পারবে ।
  • প্রশাসক নিয়োগ: সিটি কর্পোরেশনের কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য সরকার একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত উপযুক্ত কর্মকর্তাকে পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ‘প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করতে পারবে ।
  • সহায়ক কমিটি গঠন: প্রশাসকের কাজকে আরও গতিশীল করতে সরকার প্রয়োজনবোধে নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে পারবে ।
  • ক্ষমতা প্রয়োগ: নিযুক্ত প্রশাসক এবং কমিটির সদস্যবৃন্দ যথাক্রমে মেয়র ও কাউন্সিলরের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন ।

রহিতকরণ ও অন্যান্য বিধান

এই আইন পাসের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) সম্পর্কিত ২০২৪ সনের ৪ নং অধ্যাদেশসহ পূর্ববর্তী কয়েকটি অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে । তবে, রহিত হওয়া সত্ত্বেও ওই অধ্যাদেশগুলোর অধীনে ইতোপূর্বে সম্পন্ন হওয়া কাজগুলো এই নতুন আইনের অধীনেই বৈধ বলে গণ্য হবে

সাধারন জিজ্ঞাসা

নতুন আইন অনুযায়ী ই-রিক্সার সর্বোচ্চ গতিসীমা কত?

নতুন আইন অনুযায়ী, ই-রিক্সা বা ৩ চাকার ব্যাটারিচালিত রিক্সার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ (ত্রিশ) কিলোমিটার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে ।

সরকার কি চাইলেই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করতে পারে?

হ্যাঁ, সংশোধিত আইনের ১৩ক ধারা অনুযায়ী, বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যাবশ্যক বিবেচনা করলে বা জনস্বার্থে সরকার মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করতে পারবে ।

ই-রিক্সা চালানোর জন্য কি লাইসেন্স দরকার?

হ্যাঁ, সিটি কর্পোরেশনের দেওয়া লাইসেন্স এবং নিবন্ধন ছাড়া কোনোভাবেই ই-রিক্সা বা শ্লথগতির যানবাহন রাস্তায় চালানো, ভাড়া দেওয়া বা রাখা যাবে না ।

মূল রাস্তায় বা বাস রুটে কি ই-রিক্সা চলতে পারবে?

না, নতুন আইনের সংশোধনী অনুযায়ী বাস চলাচলের রুটে ই-রিক্সা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এটি কেবল কর্পোরেশনের অনুমোদিত স্থানেই চলতে পারবে ।

Leave a Comment