বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগ কর্তৃক জারি করা ‘বাজেট পরিপত্র-২’ হলো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নির্দেশিকা, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলন এবং ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের বাজেট প্রক্ষেপণ সঠিকভাবে প্রণয়ন করা । এই পরিপত্রের মাধ্যমে সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহকে তাদের রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা এবং ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে আগামী ২৪ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখের মধ্যে iBAS++ সফটওয়্যারে এন্ট্রি সম্পন্ন করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।
বাজেট পরিপত্র-২ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১ থেকে ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে জরুরিভিত্তিতে এই বাজেট পরিপত্র-২ (স্মারক নং-০৭.১০১.০২০.০০.০০.০১১.২০২৪-৬১৫) জারি করা হয় ।
একটি দেশের সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অপরিহার্য। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো (MTBF) পদ্ধতিতে বাজেট প্রণয়নের দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহকে ত্রিপক্ষীয় সভায় (অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) সম্মত হওয়া রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও ব্যয়সীমার আলোকে তাদের বিস্তারিত বাজেট প্রাক্কলন তৈরি করতে হয় । এই পরিপত্রটি মূলত সেই সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন হিসেবে কাজ করে।
আগামী বাজেটের মূল লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারসমূহ
বাজেট পরিপত্র-২ অনুযায়ী, রাজস্ব ও প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা এবং ব্যয়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার কিছু সুনির্দিষ্ট নীতি ও অনুমানের (Assumptions) ওপর ভিত্তি করে কাজ করেছে । এর মধ্যে প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:
- মৌলিক নীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: সরকারের মৌলিক নীতি নির্ধারণী দলিলসমূহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসৃজন এবং দারিদ্র্য নিরসনে সহায়ক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা ।
- সমতাভিত্তিক উন্নয়ন: নারী ও শিশু উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী, নারী ও শিশুদের প্রদেয় সেবার মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি করা ।
- জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা: জলবায়ুর বিরূপ অভিঘাত মোকাবেলা ও প্রশমনে সহায়ক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা ।
- অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা: জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির সামঞ্জস্য রাখা, যাতে বর্তমান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত না হয় ।
- সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার: কৌশলগত উদ্দেশ্য এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি বাজেট বরাদ্দের সর্বোত্তম ব্যবহার (Optimum Utilization) নিশ্চিত করা ।
বাজেট প্রণয়নে অবশ্য পালনীয় সময়সূচি
বাজেট প্রণয়নের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্ভুলভাবে শেষ করতে অর্থ বিভাগ পরিশিষ্ট-৩ এ একটি কঠোর সময়সূচি বা টাইমলাইন বেঁধে দিয়েছে । ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- ১৭ এপ্রিল, ২০২৫: মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যয়সীমা সংশোধন বা পুনর্নির্ধারণ করা এবং নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থাসমূহকে বাজেট প্রাক্কলন প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের অনুরোধ জ্ঞাপন করা ।
- ২০ এপ্রিল, ২০২৫: সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর/সংস্থা কর্তৃক বাজেট প্রাক্কলন ও প্রক্ষেপণ প্রস্তুত করে স্ব-স্ব বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা ।
- ২১ এপ্রিল, ২০২৫: মন্ত্রণালয়/বিভাগের বাজেট ওয়ার্কিং গ্রুপ কর্তৃক প্রাপ্ত বাজেট প্রাক্কলন পরীক্ষাকরণ এবং প্রকল্পভিত্তিক মতামতের জন্য তা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা ।
- ২২ এপ্রিল, ২০২৫: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দের ওপর তাদের মতামত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগে প্রেরণ করা ।
- ২৩ এপ্রিল, ২০২৫: বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক ওয়ার্কিং গ্রুপের সুপারিশ এবং অন্যান্য বিভাগের মতামত পরীক্ষা করে সামগ্রিক বাজেট প্রাক্কলন ও প্রক্ষেপণ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করা ।
- ২৪ এপ্রিল, ২০২৫ (চূড়ান্ত ডেডলাইন): চূড়ান্তকৃত বাজেট প্রাক্কলন (২০২৫-২৬) এবং প্রক্ষেপণসমূহ (২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮) বাজেট ডাটাবেজ (iBAS++)-এ এন্ট্রি করা এবং এর হার্ড কপি অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা ।
iBAS++ এন্ট্রির জন্য প্রয়োজনীয় ফরমসমূহ
বাজেট প্রস্তুতের সময় সকল তথ্য সুনির্দিষ্ট ফরমে iBAS++ (Integrated Budget and Accounting System) এ এন্ট্রি করতে হয়। পরিপত্র অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ফরম হলো:
- ফরম-১ ও ২: মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক যথাক্রমে অধিদপ্তর/পরিদপ্তরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং ব্যয়সীমা নির্ধারণের জন্য ।
- ফরম-৩ ও ৪: অধিদপ্তর কর্তৃক অধস্তন দপ্তরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং ব্যয়ের সীমা নির্ধারণের জন্য ।
- ফরম-৭: অর্থনৈতিক কোডভিত্তিক রাজস্ব ও প্রাপ্তির প্রাক্কলন এন্ট্রির জন্য ।
- ফরম-৮ (ক-১, ক-২, খ-১, খ-২): পরিচালন এবং উন্নয়ন ব্যয়ের (এডিপিভুক্ত এবং এডিপি বহির্ভূত) বিস্তারিত প্রাক্কলনের জন্য ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. বাজেট পরিপত্র-২ কবে জারি করা হয়েছে এবং এর মূল ফোকাস কী? বাজেট পরিপত্র-২ জারি করা হয়েছে ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে । এর মূল ফোকাস হলো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলন এবং পরবর্তী দুই বছরের (২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮) প্রক্ষেপণ সঠিকভাবে প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (২৪ এপ্রিল ২০২৫) দাখিল করা ।
২. থোক বরাদ্দ (Block Allocation) কি বাজেটে রাখা যাবে? না, বাজেট পরিপত্র অনুযায়ী কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়ক সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমের বিপরীতে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে এবং সাধারণভাবে বাজেটে কোনো প্রকার থোক বরাদ্দ প্রস্তাব করা যাবে না ।
৩. এডিপি (ADP) ব্যয়ের ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণের প্রাক্কলন কীভাবে হবে? উন্নয়ন ব্যয়ের বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রকল্প ঋণ/অনুদান (PL) এবং পুনর্ভরণযোগ্য প্রকল্প ঋণ/অনুদানের (RPL) প্রতিফলন বাজেটে নিশ্চিত করতে হবে ।
৪. কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে? বাজেট পরিপত্রে প্রদত্ত নীতিমালার বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে অর্থ বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত হেল্প ডেস্ক কর্মকর্তাদের (পরিশিষ্ট-৪ অনুযায়ী) সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে । যেমন, অর্থ বিভাগের বাজেট অধিশাখা-১ এর যুগ্মসচিব জনাব মোহাম্মদ ফারুক-উজ-জামান বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।