অর্থ বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত “চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬” (এস. আর. ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬, তারিখ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) শুধু কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের বেতনই নয়, বরং অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছে। নিচে গেজেটে থাকা পেনশনারদের সংশ্লিষ্ট সব বিধান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
কারা এই সুবিধা পাবেন
গেজেটে দুই শ্রেণির ব্যক্তিকে “পেনশনভোগী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে —
- অবসরভোগী (যিনি নিজে চাকরি শেষে পেনশন পাচ্ছেন)
- আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগী (মৃত কর্মচারী/পেনশনভোগীর পরিবারের সদস্য, যিনি আজীবনের জন্য পারিবারিক পেনশন পাচ্ছেন)
আদেশে “মূল পেনশনভোগী” বলতে বোঝানো হয়েছে সেই কর্মচারীকে, যাঁর চাকরিকালের ভিত্তিতে পেনশনটি মূলত অর্জিত হয়েছিল (অনুচ্ছেদ ২)।
নিট পেনশন বৃদ্ধি — ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
বেতনের মতোই পেনশনও একবারে পুরোপুরি বাড়ছে না, বরং তিনটি ধাপে কার্যকর হবে (অনুচ্ছেদ ১(৩))। বৃদ্ধির হার নির্ভর করছে বিদ্যমান নিট পেনশনের পরিমাণের ওপর:
| সময়কাল | নিট পেনশন ২০,০০১ টাকা ও তদূর্ধ্ব | নিট পেনশন ১–২০,০০০ টাকা |
|---|---|---|
| ১ জুলাই ২০২৬ – ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ | বৃদ্ধির ৪০% | বৃদ্ধির ৫০% |
| ১ জানুয়ারি ২০২৭ – ৩০ জুন ২০২৭ | বৃদ্ধির ৭০% | বৃদ্ধির ৭৫% |
| ১ জুলাই ২০২৭ থেকে | ১০০% (বার্ষিক বৃদ্ধিসহ) | ১০০% |
এখানে “বৃদ্ধি” বলতে বোঝানো হয়েছে — জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী নির্ধারিত নতুন নিট পেনশন এবং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আহরিত পুরাতন নিট পেনশনের মধ্যকার পার্থক্য। এই পার্থক্যের নির্দিষ্ট শতাংশ প্রতি ধাপে পুরাতন পেনশনের সাথে যোগ হয়ে নতুন নিট পেনশন নির্ধারিত হবে।
উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা (গেজেটের ব্যাখ্যা অনুচ্ছেদ অনুযায়ী)
- যদি কারও নিট পেনশন স্ল্যাব ২০,০০১ টাকা বা তার বেশি হয়, তাহলে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত পেনশনের সাথে বৃদ্ধির ৪০% যোগ হয়ে ১ জুলাই–৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাবেন; এরপর ৭০% যোগ হয়ে ১ জানুয়ারি–৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত পাবেন; এরপর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী পূর্ণ হারে নিট পেনশন পাবেন।
- যাঁদের নিট পেনশন স্ল্যাব ১ টাকা (সর্বনিম্ন) থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে হার হবে যথাক্রমে ৫০% ও ৭৫%, তারপর একইভাবে ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ হার।
নিট পেনশন বৃদ্ধির স্ল্যাব-ভিত্তিক সারণি
৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট বৃদ্ধির হার এবং সর্বনিম্ন-সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে:
| ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত নিট পেনশন | বৃদ্ধির হার | ন্যূনতম নিট পেনশন | সর্বোচ্চ নিট পেনশন |
|---|---|---|---|
| সর্বনিম্ন–৯,০০০ টাকা | ১০০% | ১০,০০০ টাকা | ১৮,০০০ টাকা |
| ৯,০০১–২০,০০০ টাকা | ৭৫% | ১৮,০০১ টাকা | ৩৫,০০০ টাকা |
| ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা | ৬৫% | ৩৫,০০১ টাকা | ৪৯,০০০ টাকা |
| ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা | ৬০% | ৪৯,০০১ টাকা | ৬২,০০০ টাকা |
| ৪০,০০১ ও তদূর্ধ্ব | ৫৫% | ৬২,০০১ টাকা | ৭০,২০০ টাকা |
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: যেসব পেনশনভোগী ইতিমধ্যেই মাসিক ৭০,২০০ টাকার অধিক নিট পেনশন পাচ্ছেন, তাঁরা পরবর্তী বার্ষিক বৃদ্ধি (১ জুলাই ২০২৭) কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান হারেই নিট পেনশন পেতে থাকবেন — অর্থাৎ তাঁদের জন্য এই সারণির সর্বোচ্চ সীমা তাৎক্ষণিকভাবে প্রযোজ্য হবে না।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিধান
বকেয়া পেনশন: অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীগণ ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে এই আদেশ জারির তারিখ (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) পর্যন্ত সময়ের নিট পেনশন বকেয়া হিসেবে একযোগে প্রাপ্য হবেন।
বিশেষ সুবিধা বিলুপ্তি: নিট পেনশনপ্রাপ্ত অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে পূর্বে প্রচলিত “বিশেষ সুবিধা” বিলুপ্ত হয়ে যাবে — অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় এটি আর আলাদাভাবে যোগ হবে না, নতুন হার নির্ধারণেই তা সমন্বিত হয়েছে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
প্রথম বার্ষিক বৃদ্ধি: অনুচ্ছেদ ১(৩), অনুচ্ছেদ ৭ ও অনুচ্ছেদ ৮(১) অনুযায়ী প্রথমে নিট পেনশন নির্ধারণ করে, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি বার্ষিক বৃদ্ধি (increment) প্রদান করা হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন অবসরে গমনকারীদের পেনশন: ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ তারিখের মধ্যে কোনো কর্মচারী অবসর-উত্তর ছুটি শেষে অবসরে গেলে, তাঁর গ্রস ও নিট পেনশন সরাসরি জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী নির্ধারিত হবে (পুরাতন স্কেলের ভিত্তিতে নয়)।
পারিবারিক পেনশন: ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে কর্মরত কোনো কর্মচারী (স্বামী বা স্ত্রী) মৃত্যুবরণ করলে, তাঁর পরিবার প্রচলিত পারিবারিক পেনশন বিধি অনুসরণ করে পেনশন, আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) ও ভাতাদি পাওয়ার অধিকারী হবেন।
ছুটি-সংক্রান্ত সুবিধা
বিদ্যমান ছুটি বিধান অনুযায়ী প্রাপ্য থাকলে একজন কর্মচারী —
- ১২ মাস পূর্ণ গড় বেতনে অবসর-উত্তর ছুটি ভোগ করার সুবিধা পাবেন; এবং
- ১৮ মাস পর্যন্ত ছুটি নগদায়নের (Leave Encashment) সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
উৎসব ভাতা — পেনশনারদের জন্য
- অর্থ বিভাগের ২৪ জুন ২০০৮ তারিখের পরিপত্র অনুযায়ী, অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীগণ তাঁদের নিট পেনশনের সমপরিমাণ হারে বছরে ২টি উৎসব ভাতা পাবেন — এই বিধান বলবৎ থাকবে।
- যাঁরা ১০০% পেনশন সমর্পণ করেছেন (Commutation), তাঁরা যদি ১০০% সমর্পণ না করতেন তাহলে যে পরিমাণ মাসিক নিট পেনশন পেতেন, সেই পরিমাণের ভিত্তিতে প্রতি অর্থবছরে ২টি উৎসব ভাতা হিসেবে প্রাপ্য হবেন।
- অন্যান্য সাধারণ ভাতাদির (উৎসব ভাতা, বাংলা নববর্ষ ভাতাসহ) ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য — ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত হারে অঙ্কে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত প্রদান করা হবে, এবং ১ জানুয়ারি ২০২৮ তারিখ থেকে নতুন নির্ধারিত হারে ভাতাদি প্রদেয় হবে।
পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও জিপিএফ সংক্রান্ত আইনি কাঠামো
পেনশন ও গ্র্যাচুইটি এবং সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (GPF) সংক্রান্ত বিষয়ে এই আদেশ কোনো নতুন নিয়ম তৈরি করেনি; বরং নিম্নোক্ত বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুসরণ করার কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে —
- অর্থ বিভাগের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের স্মারক
- General Provident Fund Rules, 1979
- The Pensions Act, 1871 (Act No. XXIII of 1871)
- Pension Rules and Retirement Benefits (সর্বশেষ সংশোধনীসহ)
- অর্থ মন্ত্রণালয়ের Memorandum No. 2566(40)-F, তারিখ ১৬ এপ্রিল ১৯৫৯
- সরকারি কর্মচারীগণের পেনশন সহজিকরণ আদেশ, ২০২০
সংক্ষেপে — পেনশনারদের জন্য মূল বার্তা
১. পেনশন বৃদ্ধিও বেতনের মতো তিন ধাপে (৪০–৫০% → ৭০–৭৫% → ১০০%) কার্যকর হবে, পুরোপুরি কার্যকর হবে ১ জুলাই ২০২৭ থেকে।
২. বিদ্যমান পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী বৃদ্ধির হার ভিন্ন — কম পেনশনভোগীরা (সর্বনিম্ন স্তর) সর্বোচ্চ ১০০% বৃদ্ধি পাবেন, বেশি পেনশনভোগীরা তুলনামূলক কম হারে (৫৫%) বৃদ্ধি পাবেন, সাথে একটি সর্বোচ্চ সীমা (ক্যাপ) রয়েছে।
৩. ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জারির তারিখ পর্যন্ত বকেয়া একযোগে পাবেন।
৪. উৎসব ভাতা (নিট পেনশনের সমপরিমাণ, বছরে ২টি) অপরিবর্তিত থাকছে।
৫. অবসর-উত্তর ছুটি ও ছুটি নগদায়নের সুবিধা আগের মতোই বহাল থাকছে।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।