আইবাস++ এর মাধ্যমে অনলাইন বেতন নির্ধারণ: জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নের সর্বশেষ ধাপ

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ ঘোষণার পর এবার এর বাস্তবায়ন পর্যায় শুরু হয়েছে। অর্থ বিভাগ একটি জরুরি নোটিশের মাধ্যমে জানিয়েছে যে, “চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬” অনুযায়ী আইবাস++ (iBAS++) সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইনে বেতন নির্ধারণ (Pay Fixation) কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই নোটিশে যা বলা হয়েছে, তা আগে আলোচিত গেজেট ও বেতন নির্ধারণী বিবরণীর সাথে মিলিয়ে নিচে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।

নোটিশে কী বলা হয়েছে

১. আইবাস++ সিস্টেমে বেতন নির্ধারণ কার্যক্রম চালু হচ্ছে — চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের এখন থেকে অনলাইনে নিজ নিজ বেতন নির্ধারণ করতে হবে।

২. কারা এই আওতায় পড়বেন — সকল সরকারি কর্মচারী আইবাস++ সিস্টেমে প্রবেশ করে নিজেদের বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করবেন, তবে ব্যতিক্রম দুটি ক্ষেত্র:

  • বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস-এ নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ
  • প্রতিরক্ষা সার্ভিস-এ (Defence Service) নিয়োজিত কর্মচারীগণ

এই দুই শ্রেণির কর্মচারীরা আইবাস++-এর এই সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকছেন — সম্ভবত তাঁদের জন্য পৃথক পদ্ধতি বা পরবর্তী নির্দেশনা আসবে।

৩. সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বেতন এখনও পুরাতন স্কেলেই — অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য হলো, সেপ্টেম্বর-২০২৬ মাসের বেতন-ভাতা এখনও জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫ অনুযায়ী সাবমিট করতে হবে। অর্থাৎ নতুন স্কেল কার্যকর তারিখ (১ জুলাই ২০২৬) হলেও, প্রশাসনিক ও সিস্টেম-প্রস্তুতিজনিত কারণে বাস্তবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেতন বিল পুরাতন হারেই তৈরি হচ্ছে।

৪. বকেয়া সমন্বয়যোগ্য হবে — পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পর, জুলাই ২০২৬ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের জন্য যে বকেয়া আর্থিক সুবিধা (নতুন স্কেল অনুযায়ী প্রাপ্য টাকা বনাম ইতিমধ্যে প্রদত্ত পুরাতন হারের টাকার পার্থক্য) তৈরি হবে, তা পরবর্তীতে সমন্বয় করা হবে।

আগের আলোচনার সাথে এই নোটিশের সংযোগ

এই নোটিশটি মূলত গেজেটের অনুচ্ছেদ ৩২ (অনলাইনে বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি)-এর বাস্তব প্রয়োগ। সেই অনুচ্ছেদে বলা ছিল:

  • জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ জারি হওয়ার পর সরকারি কর্মচারীগণ www.ibas.finance.gov.bd-এ লগইন করে Pay Fixation অপশনে নিজ বেতন নির্ধারণ করবেন।
  • কোনো কর্মচারী পূর্বের www.payfixation.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রবেশ করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইবাস++ সিস্টেমের Pay Fixation অপশনে পৌঁছে যাবেন।
  • গেজেটেড কর্মচারীরা তাঁদের আইবাস++ লগইন আইডি-পাসওয়ার্ড দিয়ে এবং নন-গেজেটেড কর্মচারীরা জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে প্রবেশ করবেন।
  • ডিডিও (Drawing and Disbursing Officer) বরাবর সাবমিট করলে কর্মচারীর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে স্বয়ংক্রিয় এসএমএস যাবে।

আগে আমরা যে বেতন নির্ধারণী বিবরণী (১৬-ধাপের ফর্ম) নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, সেই একই হিসাব এখন কর্মচারীরা কাগজে নয়, বরং সরাসরি আইবাস++ সফটওয়্যারে অনলাইনে সম্পন্ন করবেন — সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রেড, বর্তমান ধাপ ও নতুন স্কেলের তথ্য মিলিয়ে ধাপ ০১-১৬ পর্যন্ত হিসাব করে দেবে।

সময়রেখা মিলিয়ে দেখা যাক

সময়কী ঘটছে
১ জুলাই ২০২৬নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ আইনগতভাবে কার্যকর (গেজেট অনুযায়ী)
জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬বাস্তবে বেতন বিল এখনও পুরাতন (২০১৫) স্কেলে তৈরি হচ্ছে, যেহেতু আইবাস++ পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়া তখনও চলমান
সেপ্টেম্বর ২০২৬বেতন-ভাতা এখনও ২০১৫ স্কেল অনুযায়ী সাবমিট করার নির্দেশনা (এই নোটিশ অনুযায়ী)
পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পরজুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়ের বকেয়া (নতুন হার − পুরাতন হার) সমন্বয় করে একযোগে প্রদান
১ জুলাই ২০২৬ – ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬কার্যকর হার: বৃদ্ধির ৪০% (গ্রেড ৯+) / ৫০% (গ্রেড ১০-২০)
১ জানুয়ারি ২০২৭ – ৩০ জুন ২০২৭কার্যকর হার: বৃদ্ধির ৭০% / ৭৫%
১ জুলাই ২০২৭ থেকেপূর্ণ (১০০%) নতুন স্কেল + বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট

অর্থাৎ, আইনি কার্যকারিতা (১ জুলাই ২০২৬) এবং প্রশাসনিক/সিস্টেম বাস্তবায়ন (যা কয়েক মাস দেরিতে হচ্ছে) — এই দুইয়ের মধ্যে একটি স্বাভাবিক ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা সরকারি বড় বেতন কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণ ঘটনা। এই ব্যবধানের কারণেই “বকেয়া” ধারণাটি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে — কর্মচারীরা প্রথমে পুরাতন হারে বেতন পাবেন, পরে একসাথে পার্থক্যের টাকা (arrear) পাবেন।

কর্মচারীদের জন্য বাস্তব করণীয়

১. অপেক্ষা করুন, তাড়াহুড়ো নয় — সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বেতন পুরাতন হারেই আসবে, এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ; উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।

২. আইবাস++ প্রবেশাধিকার প্রস্তুত রাখুন — গেজেটেড কর্মচারীরা লগইন আইডি-পাসওয়ার্ড, আর নন-গেজেটেড কর্মচারীরা এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ হাতের কাছে রাখুন, যাতে পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়া শুরু হলেই দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।

৩. জাতীয় পরিচয়পত্র হালনাগাদ রাখুন — গেজেট অনুযায়ী, এনআইডি না থাকলে বা এনআইডি-র জন্মতারিখ চাকরির রেকর্ডের সাথে না মিললে বেতন নির্ধারণের আগেই তা সংশোধন করতে হবে।

৪. জুডিসিয়াল ও প্রতিরক্ষা সার্ভিসের কর্মচারীরা — এই সাধারণ আইবাস++ প্রক্রিয়ার আওতায় পড়ছেন না বলে জানানো হয়েছে; তাঁদের জন্য পৃথক নির্দেশনার অপেক্ষা করা উচিত।

সংক্ষেপে

এই নোটিশটি প্রমাণ করে যে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এখন কাগজের গেজেট থেকে বাস্তব বাস্তবায়নের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মূল বেতন কাঠামো, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের হার এবং পে-ফিক্সেশন পদ্ধতি — সবকিছুই আগে থেকে নির্ধারিত থাকলেও, বাস্তবে তা কার্যকর করতে আইবাস++ সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে, এবং এই প্রক্রিয়াগত কারণেই সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বেতন পুরাতন হারে থাকছে ও পরবর্তীতে বকেয়া একযোগে সমন্বয় হবে।

Leave a Comment