জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬: বেতন নির্ধারণের নিয়ম ও উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো অনুচ্ছেদ ৪, ৫ ও ৬ যেখানে একজন কর্মচারীর নতুন স্কেলে বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং কখন তিনি পদোন্নতি ছাড়াই “উচ্চতর গ্রেড” পাবেন, তা বিস্তারিতভাবে বলা আছে। নিচে এই তিনটি অনুচ্ছেদ উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করা হলো।

অনুচ্ছেদ ৪: জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর প্রাপ্যতা

নিয়মটি সহজ — ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বা তার আগে একজন কর্মচারী তাঁর পদে যে মূল স্কেল, উচ্চতর গ্রেড বা ভিন্ন কোনো গ্রেড/স্কেলে বেতন পেতেন (যে নামেই অভিহিত হোক না কেন), তিনি ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে সেই বেতনস্কেলের বিপরীতে প্রদর্শিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর অনুরূপ স্কেল পাওয়ার অধিকারী হবেন। অর্থাৎ, কেউ যদি আগে টাইম-স্কেল বা সিলেকশন গ্রেডের সুবিধা নিয়ে উচ্চতর কোনো স্কেলে থাকতেন, নতুন স্কেলেও তিনি সেই অনুরূপ (corresponding) স্কেলেই স্থান পাবেন — নিজের মূল পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নয়।

অনুচ্ছেদ ৫: বেতন নির্ধারণের মূল পদ্ধতি

মূলনীতি

  • (ক) বর্তমান স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন পেলে, নতুন স্কেলেরও প্রারম্ভিক ধাপেই বেতন নির্ধারিত হবে — সহজ, সরাসরি হিসাব।
  • (খ) যদি কারও মূল বেতন প্রারম্ভিক ধাপের চেয়ে বেশি (অর্থাৎ তিনি কয়েক ধাপ এগিয়ে আছেন) হয়, তাহলে তিন ধাপে হিসাব করতে হবে:
    1. পুরাতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ ও নিজের বর্তমান বেতনের পার্থক্য বের করা;
    2. এই পার্থক্য নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সাথে যোগ করা;
    3. এই যোগফল —
      • (অ) নতুন স্কেলের কোনো ধাপের সমান হলে, সেই ধাপেই বেতন নির্ধারিত হবে;
      • (আ) কোনো ধাপের সমান না হলে, তার পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারিত হবে (কখনোই নিচের দিকে নয়)।

উদাহরণ ১ (১১তম গ্রেড)

৩০ জুন ২০২৬ তারিখে একজন কর্মচারী ২০১৫ স্কেলের ৯,৩০০-২১,৪১০-২২,৪৯০ টাকা স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে, অর্থাৎ ৯,৩০০ টাকা মূল বেতন পেতেন।

যেহেতু তিনি প্রারম্ভিক ধাপেই ছিলেন, নিয়ম (ক) প্রযোজ্য — তাই ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তাঁর অনুরূপ নতুন স্কেল (২১,৯০০-৫২,৯০০ টাকা)-এর প্রারম্ভিক ধাপ, অর্থাৎ ২১,৯০০ টাকায় তাঁর মূল বেতন নির্ধারিত হবে।

উদাহরণ ২ (৭ম গ্রেড)

৩০ জুন ২০২৬ তারিখে একজন কর্মচারীর মূল বেতন ছিল ১২,৫০০-৩০,২৩০ টাকা স্কেলে ১৩,৭৯০ টাকা (অর্থাৎ প্রারম্ভিক ধাপে নন, দ্বিতীয় ধাপে)।

হিসাব:

ধাপহিসাবফলাফল
পুরাতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ—১২,৫০০ টাকা
বর্তমান বেতন—১৩,৭৯০ টাকা
পার্থক্য১৩,৭৯০ − ১২,৫০০১,২৯০ টাকা
নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ—২৫,০০০ টাকা
যোগফল২৫,০০০ + ১,২৯০২৬,২৯০ টাকা
নতুন স্কেলে ২৬,২৯০ টাকার সমান কোনো ধাপ নেই → পরবর্তী উচ্চতর ধাপ—২৬,৩০০ টাকা

অর্থাৎ তাঁর নতুন মূল বেতন নির্ধারিত হবে ২৬,৩০০ টাকা — কারণ ঠিক ২৬,২৯০ টাকার কোনো ধাপ স্কেলে নেই, তাই নিয়ম (আ) অনুযায়ী তার পরের ধাপে (২৬,৩০০) বেতন বসানো হয়েছে।

বিশেষ ব্যতিক্রম ও পরিস্থিতিভিত্তিক নিয়ম (অনুচ্ছেদ ৫ চলমান)

পরিস্থিতিনিয়ম
(গ) নির্ধারিত বেতনভুক্ত পদযাঁদের বেতন ইতিমধ্যে নির্ধারিত অঙ্কে বাঁধা — ১,৭২,০০০ (মন্ত্রিপরিষদ সচিব/মুখ্য সচিব), ১,৬৪,০০০ (সিনিয়র সচিব), বা ১,৫৬,০০০ (১ম গ্রেড) টাকা — তাঁদের ক্ষেত্রে উপরের (ক)/(খ) নিয়ম প্রযোজ্য হবে না, তাঁরা সরাসরি এই নির্ধারিত অঙ্কই পাবেন
(ঘ) পদোন্নতিপ্রাপ্তরা১ জুলাই ২০২৬ তারিখে যিনি উচ্চতর বেতনস্কেলের পদে পদোন্নতি পাবেন, তাঁর বেতন প্রথমে নিম্নপদে নির্ধারণ করে তারপর পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে
(ঙ) প্রেষণে কর্মরতপ্রেষণে থাকলে, প্রেষণে না থাকলে তিনি মূল অফিস/প্রতিষ্ঠানে যে বেতন পেতেন সেই ভিত্তিতে বেতন নির্ধারিত হবে
(চ) ছুটিতে থাকা কর্মচারী১ জুলাই ২০২৬-এ ছুটিতে থাকলে, বর্তমান বেতনের ভিত্তিতে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ হবে — তবে নতুন স্কেলের আর্থিক সুবিধা ছুটির সময়ের জন্য প্রাপ্য হবেন না
(ছ) সাময়িক বরখাস্তকৃত১ জুলাই ২০২৬-এ বরখাস্ত থাকলে ও পরে পুনর্বহাল/যোগদান না করলে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ হবে না; পুনর্বহাল হলে প্রথমে ৩০ জুন ২০২৬-এর বেতনস্কেলে নির্ধারণ করে তারপর নতুন স্কেলে রূপান্তর হবে
(জ) অবসর-উত্তর ছুটিতে (PRL)শুধু পেনশন নির্ধারণের জন্য নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারিত হবে; বর্ধিত বেতনের তারিখ থাকলে তা পেনশন নির্ধারণে যুক্ত হবে, তবে ছুটির প্রকৃত বেতন পুরাতন স্কেলেই পাবেন
(ঝ) ৩০ জুন ২০২৬-এ PRL শেষকারীযিনি ১ জুলাই ২০২৬-এ অবসরে যাচ্ছেন, তিনি নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের সুবিধা পাবেন না

অনুচ্ছেদ ৬: উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা (টাইম-স্কেল সুবিধা)

এটি মূলত পদোন্নতি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয় বেতন-বৃদ্ধির একটি ব্যবস্থা — বাংলাদেশ সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রচলিত “উচ্চতর গ্রেড” সুবিধার ধারাবাহিকতা।

মূল নিয়ম (উপ-অনুচ্ছেদ ১)

কোনো স্থায়ী কর্মচারী যদি একই পদে ৮ বছর চাকরি পূর্ণ করেন (পদোন্নতি ছাড়াই) এবং তাঁর চাকরি সন্তোষজনক হয়, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৯ম বছরে তিনি নিজের পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাবেন। এটিকে পদোন্নতি হিসেবে গণ্য করা হবে না — শুধু বেতন কাঠামোর সুবিধা।

বিশেষ শর্ত: যেসব স্থায়ী কর্মচারীর ১ জুলাই ২০২৬-এর আগেই চাকরির ৮ বছর পূর্ণ হয়েছে কিন্তু ১০ বছর হয়নি, তাঁরা সরাসরি ১ জুলাই ২০২৬ তারিখেই উচ্চতর গ্রেড পাবেন।

দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড (উপ-অনুচ্ছেদ ২)

প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পরও যদি একই পদে (পদোন্নতি ছাড়া) আরও ৬ বছর কর্মরত থাকেন, তাহলে প্রথম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৬ বছর পূর্তিতে এবং চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে, ৭ম বছরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাবেন।

সীমাবদ্ধতা ও শর্তাবলি

উপ-অনুচ্ছেদবিষয়বস্তু
(৩)এই সুবিধা শুধু ৪র্থ গ্রেড পর্যন্ত প্রযোজ্য — ৪র্থ গ্রেড বা তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মচারী এই সুবিধা নিয়ে ৩য় গ্রেড বা তদূর্ধ্বে যেতে পারবেন না
(৪)একই পদে একজন কর্মচারী এই সুবিধা দুইবারের বেশি পাবেন না; আগের স্কেলে ইতিমধ্যে দুই বা ততোধিক সিলেকশন গ্রেড/টাইম স্কেল/উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন স্কেলে আর উচ্চতর গ্রেড পাবেন না
(৫)একই পদে চাকরিকালীন ৩০ জুন ২০২৬ বা তার আগে যদি একটিমাত্র উচ্চতর স্কেল/গ্রেড পেয়ে থাকেন, তবে পরবর্তী ৬ বছর পূর্তিতে ৭ম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাবেন — কিন্তু এক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ বা তার আগের কোনো বকেয়া আর্থিক সুবিধা পাবেন না
(৬)ব্লকড (blocked) পদ — যেসব পদে পদোন্নতির কোনো বিধান নেই ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ব্লকড ঘোষিত, সেসব পদে কর্মরতরা দুইটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর সন্তোষজনক চাকরির শর্তে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৮ বছর পূর্তিতে ৯ম বছরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাবেন — তবে সমগ্র চাকরিজীবনে একই পদে সর্বোচ্চ তিনবারের বেশি নয়; এবং ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না

গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা (ব্যাখ্যা অংশ)

  • “সন্তোষজনক চাকরি” — পদোন্নতিসহ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিবিধানে যেভাবে বিবেচিত হয়, উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে।
  • “স্বয়ংক্রিয়” — বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি ছাড়াই মন্ত্রণালয়/বিভাগের সচিব বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে অফিস আদেশের মাধ্যমে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা বোঝাবে — অর্থাৎ পদোন্নতি কমিটির মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু প্রশাসনিক অনুমোদনেই এটি কার্যকর হয়।

পেনশন-সংক্রান্ত সংযুক্ত বিধান (Image ১-এর শুরুর অংশ)

Image ১-এর একদম শুরুতে থাকা অংশটি মূলত অনুচ্ছেদ ৮-এর পেনশন সংক্রান্ত একটি শর্তের বাকি অংশ — কোনো কর্মচারীর বর্ধিত বেতনের তারিখ থাকলে তা পেনশন নির্ধারণে যুক্ত হবে, তবে অবসর-উত্তর ছুটির সময়ের বেতন বর্তমান বেতনস্কেলের ভিত্তিতেই পাবেন। এবং যিনি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে PRL শেষ করছেন (অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৬-এ অবসরে যাচ্ছেন), তিনি নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের সুবিধা পাবেন না — এটি পূর্বের আলোচনায় থাকা পেনশনার বিষয়েরই ধারাবাহিকতা।

সংক্ষেপে — কী শিখলাম

১. বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি মূলত “পার্থক্য বের করে নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে যোগ করা” — এই সহজ সূত্রে চলে, তবে ফলাফল ঠিক কোনো ধাপে না পড়লে সবসময় উপরের দিকে রাউন্ড করা হয়, নিচের দিকে নয়।
২. নির্ধারিত বেতনভুক্ত শীর্ষ পদগুলো (সচিব পর্যায়) এই সাধারণ সূত্রের বাইরে — তাঁরা সরাসরি নির্ধারিত অঙ্ক পান।
৩. উচ্চতর গ্রেড একটি পদোন্নতি-নিরপেক্ষ সুবিধা — ৮ বছর ও পরবর্তীতে ৬ বছর অন্তর অন্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায়, তবে ৪র্থ গ্রেড পর্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং সাধারণত সর্বোচ্চ দুইবার (ব্লকড পদে তিনবার) প্রযোজ্য।
৪. ছুটি, প্রেষণ, বরখাস্তকরণ বা পদোন্নতির মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে বেতন নির্ধারণের জন্য আলাদা আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

চাইলে আমি এখন পর্যন্ত আলোচিত সবকিছু (বেতন স্কেল, নির্ধারণ পদ্ধতি, ভাতাদি, উচ্চতর গ্রেড, আইবাস++ প্রক্রিয়া) একত্র করে একটি সম্পূর্ণ, ইনডেক্সসহ গাইড ডকুমেন্ট (Word/PDF) তৈরি করে দিতে পারি — জানালেই করে দিচ্ছি।

Leave a Comment