শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫” জারি করেছে (স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৭৪.০৩০.০০০১.২-৩৩৩)। এই নীতিমালা ২০২১ সালের পুরনো এমপিও নীতিমালা বাতিল করে বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের জনবল কাঠামো, নিয়োগ যোগ্যতা, বেতন স্কেল, পদোন্নতি এবং বেতন-ভাতার সরকারি অংশ (এমপিও) প্রাপ্তির শর্ত নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে। জারির দিন থেকেই এটি কার্যকর।
এমপিও নীতিমালা ২০২৫ কী এবং কেন এটি প্রয়োজন হলো
“এমপিও” মানে শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতার সরকারি অংশ (Monthly Pay Order)। দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজে কর্মরত প্রায় ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এই এমপিওর আওতায় বেতন পান। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার জন এমপিওভুক্ত।
পুরনো ২০২১ সালের নীতিমালায় কিছু অস্পষ্টতা ও সমন্বয়হীনতা ছিল বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করেছে। সে কারণেই—
- বেতন-ভাতার সরকারি অংশ সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের জন্য,
- প্রতিষ্ঠানভেদে উপযুক্ত জনবল কাঠামো নির্ধারণের জন্য, এবং
- বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পদ্ধতি যুগোপযোগী করার জন্য—
নতুন এমপিও নীতিমালা ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে।
নীতিমালা ২০২৫ কোন কোন প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য
দেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত নিম্নলিখিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই নীতিমালা প্রযোজ্য হবে:
- বিদ্যালয়: নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
- কলেজ: উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, স্নাতক (পাস) কলেজ, স্নাতক (সম্মান) কলেজ, স্নাতকোত্তর কলেজ
- বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান: সংগীত কলেজ, শরীরচর্চা কলেজ, চারুকলা কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ ও বিকেএসপি—এগুলোকেও বিশেষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক এমপিও নীতিমালা বলবৎ আছে; এই নীতিমালা শুধু স্কুল ও কলেজের জন্য।
এমপিও নীতিমালা ২০২৫-এ নতুন কী এসেছে
আগের ২০২১ নীতিমালার তুলনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।
জমির মালিকানা এখন বাধ্যতামূলক
এমপিওর আবেদনের আগে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমির মালিকানা, নামজারি ও হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রমাণক থাকতে হবে। সংস্থা বা ট্রাস্ট পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংস্থা/ট্রাস্টের নামে বরাদ্দপত্র গ্রহণযোগ্য হবে। তবে ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠান এখন থেকে এমপিওভুক্ত হবে না।
একাধিক চাকরিতে থাকা সম্পূর্ণ নিষেধ
এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সাথে একাধিক চাকরি বা আর্থিক লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না। আর্থিক লাভজনক পদের সংজ্ঞায় সাংবাদিকতা ও আইন পেশাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিয়ম ভাঙলে এমপিও বাতিলসহ বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনবল কাঠামোয় রদবদল
প্রতিষ্ঠানভেদে পদসংখ্যা ও পদবি কিছুটা পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে—যেমন উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে “অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর” পদের একটি সংখ্যা কমানো হয়েছে। আগে এ পদে কর্মরতদের চাকরি অক্ষুণ্ণ থাকবে, কেবল নতুন নিয়োগের সময় এ পরিবর্তন প্রযোজ্য হবে।
শিফট ও ব্রাঞ্চ স্কুল খোলার নিয়ম স্পষ্ট
শিফট ও ব্রাঞ্চ/চেইন স্কুল-কলেজ খোলার শর্তাবলি আগের চেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে (বিস্তারিত নিচে দেখুন)।
আরও দেখুন: মাদ্রাসা এমপিও নীতিমালা ২০২৬। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কত? (২০২৬ সালের আপডেট স্কেল, গ্রেড ও সুযোগ-সুবিধা)।
জনবল কাঠামো ২০২৫: কোন প্রতিষ্ঠানে কত ধরনের পদ
নীতিমালার ৬ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের স্তরভেদে অনুমোদিত পদের ধরন নিম্নরূপ:
| প্রতিষ্ঠানের ধরন | শ্রেণি/স্তর | পদের ধরন সংখ্যা |
|---|---|---|
| নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় | ৬ষ্ঠ–৮ম | ১৯ ধরনের পদ |
| মাধ্যমিক বিদ্যালয় | ৬ষ্ঠ–১০ম | ২৬ ধরনের পদ |
| উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় | ৬ষ্ঠ–১২শ | ৩২ ধরনের পদ |
| উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ | ১১শ–১২শ | ১৬ ধরনের পদ |
| স্নাতক (পাস) কলেজ | ১১শ–১৫শ | ১৮ ধরনের পদ |
| স্নাতক (সম্মান) কলেজ | ১১শ–১৬শ | ১৮ ধরনের পদ |
| স্নাতকোত্তর কলেজ | ১১শ–১৭শ | ১৮ ধরনের পদ |
বিদ্যালয় পর্যায়ে সাধারণ পদের পাশাপাশি ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর, ট্রেড অ্যাসিস্ট্যান্ট, কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর, ল্যাব সহকারী, অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা কর্মী, নৈশ প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মতো সহায়ক পদও অন্তর্ভুক্ত আছে। কলেজ পর্যায়ে অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ থেকে শুরু করে প্রভাষক, প্রদর্শক, গ্রন্থাগার প্রভাষক ও অফিস সহায়ক পর্যন্ত সব পদ নির্দিষ্ট করা আছে।
এমপিওভুক্তির জন্য আবশ্যকীয় শর্তাবলি
বেতন-ভাতার সরকারি অংশ পেতে একটি প্রতিষ্ঠানকে নিচের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:
- একাডেমিক স্বীকৃতি/অধিভুক্তি — সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হালনাগাদ স্বীকৃতি/অধিভুক্তি থাকতে হবে।
- নিজস্ব জমি — মালিকানা, নামজারি ও খাজনা পরিশোধের প্রমাণক জমা দিতে হবে।
- জনবল কাঠামো অনুসরণ — অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে কোনো পদে নিয়োগ এমপিওযোগ্য হবে না।
- কাম্য শিক্ষার্থী সংখ্যা — পরিশিষ্ট-‘খ’ অনুযায়ী ন্যূনতম শিক্ষার্থী থাকতে হবে।
- কাম্য পরীক্ষার্থী ও পাসের হার — পরিশিষ্ট-‘গ’ অনুযায়ী পাবলিক পরীক্ষায় ন্যূনতম পরীক্ষার্থী ও পাসের হার অর্জন করতে হবে।
- নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি/এডহক কমিটি — অনুমোদিত কমিটি বলবৎ থাকতে হবে।
- এনটিআরসিএ সুপারিশ — পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য স্থানে এনটিআরসিএর নিবন্ধনধারী ও সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগ দিতে হবে।
শিক্ষক নিয়োগের ন্যূনতম যোগ্যতা ও বেতন স্কেল
পরিশিষ্ট-‘ঘ’ অনুযায়ী প্রতিটি পদের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়সসীমা ও জাতীয় বেতন স্কেল রয়েছে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদের উদাহরণ দেওয়া হলো (পূর্ণ তালিকা মূল গেজেটে দেখুন):
| পদের নাম | ন্যূনতম যোগ্যতা (সংক্ষেপে) | বয়সসীমা | বেতন গ্রেড |
|---|---|---|---|
| অধ্যক্ষ (উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়/কলেজ) | স্নাতকোত্তর/৪ বছরের সম্মান + নির্ধারিত অভিজ্ঞতা | প্রযোজ্য নয় (পদোন্নতি/অভিজ্ঞতাভিত্তিক) | গ্রেড-৫ (৪৩,০০০–৬৯,৮৫০) |
| প্রধান শিক্ষক (মাধ্যমিক বিদ্যালয়) | স্নাতক/বিএড + শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা | অভিজ্ঞতাভিত্তিক | গ্রেড-৭ (২৯,০০০–৬৩,৪১০) |
| প্রধান শিক্ষক (নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়) | স্নাতক/বিএড | অভিজ্ঞতাভিত্তিক | গ্রেড-৮ (২৩,০০০–৫৫,৪৭০) |
| প্রভাষক (সংশ্লিষ্ট বিষয়) | স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক/স্নাতকোত্তর | অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর | গ্রেড-৯ (২২,০০০–৫৩,০৬০) |
| সহকারী শিক্ষক (সাধারণ বিষয়) | স্নাতক ডিগ্রি (সংশ্লিষ্ট বিষয়ে) | অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর | গ্রেড-১১ (১২,৫০০–৩০,২৩০) |
| সহকারী শিক্ষক (আইসিটি/কৃষি/শারীরিক শিক্ষা) | স্নাতক/ডিপ্লোমা (নির্দিষ্ট শর্তে) | অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর | গ্রেড-১০ (১৬,০০০–৩৮,৬৪০) |
| প্রদর্শক | সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক | অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর | গ্রেড-১০ (১৬,০০০–৩৮,৬৪০) |
| হিসাব সহকারী / অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর | এইচএসসি + প্রাসঙ্গিক ডিপ্লোমা | ১৮–৩৫ বছর | গ্রেড-১৬ (৯,৩০০–২২,৪৯০) |
| নিরাপত্তা কর্মী / আয়া / নৈশ প্রহরী / পরিচ্ছন্নতা কর্মী | এসএসসি/দাখিল বা সমমান | ১৮–৩৫ বছর | গ্রেড-২০ (৮,২৫০–২০,০১০) |
মনে রাখবেন: সমগ্র শিক্ষাজীবনে একটির বেশি তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণি/সমমান জিপিএ থাকলে অধিকাংশ পদেই তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পদোন্নতির নিয়ম
সহকারী শিক্ষক থেকে সিনিয়র শিক্ষক
- এমপিওভুক্তির ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্ণ হলে গ্রেড ১০ থেকে ৯-এ উন্নীত হয়ে পদবি “সিনিয়র শিক্ষক” হবে।
- পরবর্তী ৬ বছর পর আরেকটি উচ্চতর গ্রেড পাবেন।
- সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে।
- বিভাগীয় মামলা চলমান থাকলে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবেন না।
প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক
প্রভাষক পদে পদোন্নতির দুটি পথ রয়েছে:
- প্যাটার্নভুক্ত পদের ৫০% (নম্বরভিত্তিক মূল্যায়ন): এমপিওভুক্তির ৮ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্তিতে ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন সূচকের ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি।
- অন্যান্য প্রভাষক: এমপিওভুক্তির ১০ বছর পর গ্রেড ৯ থেকে ৮-এ উন্নীত হবেন এবং পরবর্তী ৬ বছরে (মোট ১৬ বছর) “সহকারী অধ্যাপক” পদে পদোন্নতি পাবেন।
সহকারী অধ্যাপক পদোন্নতির ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন সূচক
| মূল্যায়নের ক্ষেত্র | নম্বর |
|---|---|
| এমপিও প্রাপ্তি থেকে জ্যেষ্ঠতা | ৩৫ |
| একাডেমিক পরীক্ষার ফলাফল | ১৫ |
| ক্লাসে উপস্থিতি/পাঠদান কার্যক্রম | ২০ |
| নেতিবাচক মন্তব্য/বিরূপ রেকর্ড না থাকা | ৫ |
| ফৌজদারি মামলা না থাকা | ৫ |
| প্রতিষ্ঠানে অনুকরণীয়/সৃজনশীল দৃষ্টান্ত | ৫ |
| ভার্চুয়াল ক্লাস নেওয়ার দক্ষতা | ৫ |
| উচ্চতর ডিগ্রি (এমফিল/পিএইচডি) | ৫ |
| গবেষণা কর্ম/স্বীকৃত জার্নালে প্রবন্ধ | ৫ |
এই মূল্যায়ন একটি জেলা পর্যায়ের কমিটি করে, যার আহ্বায়ক থাকেন জেলা প্রশাসক। মূল্যায়ন সূচকের ন্যূনতম ৭০% নম্বর না পেলে পদোন্নতির সুপারিশ করা হবে না।
কাম্য শিক্ষার্থী সংখ্যা ও পাসের হারের শর্ত
প্রতিষ্ঠান শহরে না মফস্বলে, তার ভিত্তিতে ন্যূনতম শিক্ষার্থী সংখ্যা ও পাসের হারের শর্ত আলাদা। কয়েকটি উদাহরণ:
| প্রতিষ্ঠানের ধরন | এলাকা | ন্যূনতম শিক্ষার্থী | এসএসসি/এইচএসসি পাসের ন্যূনতম হার |
|---|---|---|---|
| নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় | শহর | ১২০ জন | ৭০% (সিটি কর্পোরেশন) |
| মাধ্যমিক বিদ্যালয় | শহর | ২০০ জন | ৭০% (সিটি কর্পোরেশন) |
| মাধ্যমিক বিদ্যালয় | মফস্বল | ১৫০ জন | ৫৫% |
| উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) | মফস্বল | ১৯০–৩৯০ জন (বিভাগ সংখ্যা অনুসারে) | ৫০% |
বিস্তারিত হিসাব নীতিমালার পরিশিষ্ট-‘খ’ ও পরিশিষ্ট-‘গ’ তে এলাকা ও প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী আলাদাভাবে দেওয়া আছে।
এমপিও আবেদন প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে
- প্রতিষ্ঠান প্রধান প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য নিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক/কর্মচারীর এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করেন।
- উপজেলা/থানা পর্যায়ের কমিটি প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে যাচাই করে।
- জেলা পর্যায়ের কমিটি প্রাপ্ত আবেদন নিজ স্তরে যাচাই করে।
- অঞ্চল পর্যায়ের কমিটি (উপপরিচালক/পরিচালকের নেতৃত্বে) যাচাই সম্পন্ন করে।
- মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর সব আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত আবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মাউশির এমপিও ছাড়করণ কমিটির সভায় অনুমোদন নেয়।
- অনুমোদিত হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এমপিওর অফিস আদেশ (জিও) জারি করে এবং অধিদপ্তর এমপিও কোড প্রদান করে।
প্রতিটি স্তরে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা আছে—স্কুলের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে ৫ দিন, জেলা পর্যায়ে ৭ দিন এবং উপপরিচালক/পরিচালক পর্যায়ে ১০ দিনের মধ্যে।
এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
নতুন এমপিওর জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধান কর্তৃক প্রত্যয়িত যে কাগজপত্র লাগবে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো:
- প্রতিষ্ঠানের প্যাডে সভাপতি ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের স্বাক্ষরসহ আবেদন
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সনদ
- এনটিআরসিএ নিবন্ধন সনদ ও সুপারিশপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- নিয়োগপত্র ও যোগদানপত্র
- নিয়োগ ও যোগদান অনুমোদনের কমিটির রেজুলেশন
- হালনাগাদ একাডেমিক স্বীকৃতি/অধিভুক্তির কপি
- শিক্ষক-কর্মচারীর তালিকা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা সংক্রান্ত তালিকা
- শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যাংক হিসাব নম্বর (ইএফটির জন্য)
- জাতীয় পরিচয়পত্র
পূর্ণ তালিকা নীতিমালার পরিশিষ্ট-‘ঙ’ তে দেওয়া আছে।
বেতন-ভাতা কখন স্থগিত বা বাতিল হতে পারে
নিচের পরিস্থিতিতে শিক্ষক-কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠানের এমপিও সাময়িক বন্ধ, আংশিক বা সম্পূর্ণ কর্তন এমনকি বাতিল হতে পারে:
- এমপিওভুক্তির আবশ্যকীয় শর্ত (যেমন একাডেমিক স্বীকৃতি) পূরণ না হলে বা শর্ত ভঙ্গ প্রমাণিত হলে
- মিথ্যা তথ্য, ভুয়া সনদ বা জাল কাগজপত্র দাখিল করলে
- অবৈধ শিক্ষক নিয়োগ, ভুয়া শাখা/মিথ্যা শিক্ষার্থী প্রদর্শন বা পাবলিক পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করলে
- কাম্য শিক্ষার্থী বা পাসের হার ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখতে না পারলে
- একই সাথে একাধিক চাকরি বা আর্থিক লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকলে
- নৈতিক স্খলন, ফৌজদারি মামলা বা বিভাগীয় শাস্তির ক্ষেত্রে
এমপিও স্থগিত হলে প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে মহাপরিচালক বরাবর পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন।
অবসর, বয়সসীমা ও চাকরির অন্যান্য শর্ত
- নিয়োগে প্রথম প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর (প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদের ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য)।
- শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতার সরকারি অংশ ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রদেয়; ৬০ বছর পূর্তিতে বাধ্যতামূলক অবসর।
- জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হয় এমপিওভুক্তির তারিখ অনুসারে; তারিখ একই হলে যোগদানের তারিখ এবং তাও একই হলে জন্মতারিখ বিবেচনায় আসে।
সাম্প্রতিক সংশোধনী ও আপডেট
ডিসেম্বর ২০২৫-এ জারি হওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় মার্চ ২০২৬-এ এই নীতিমালার কয়েকটি অনুচ্ছেদে সংশোধনী জারি করেছে (“জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৫ এর কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধন”)। সংশোধনীর বিস্তারিত বিষয়বস্তু এখনও সব সরকারি ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত নয়, তাই নির্দিষ্ট কোনো অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের দাবি না করে আমরা পাঠকদের পরামর্শ দিচ্ছি—এমপিও আবেদনের আগে shed.gov.bd বা dshe.gov.bd-এর “Moedu নীতি” বিভাগ থেকে সর্বশেষ সংশোধিত পূর্ণ কপিটি একবার যাচাই করে নিন। নিয়মিত নিয়োগ ও এমপিও বিল সংক্রান্ত নোটিশও এই দুটি ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
এমপিও নীতিমালা ২০২৫ কখন জারি হয়েছে? ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এই নীতিমালা জারি করে এবং জারির দিন থেকেই এটি কার্যকর হয়েছে।
এমপিও নীতিমালা ২০২৫ কোন আগের নীতিমালা বাতিল করেছে? এটি ২০২১ সালের “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এম.পি.ও. নীতিমালা-২০২১” এবং এ সংক্রান্ত পূর্ববর্তী সব পরিপত্র/আদেশের সংশ্লিষ্ট অংশ রহিত করেছে।
ভাড়া বাড়িতে চলমান স্কুল বা কলেজ কি এমপিওভুক্ত হতে পারবে? না। নতুন নীতিমালায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমির মালিকানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে; ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হবে না।
একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক কি একই সাথে অন্য চাকরি বা ব্যবসা করতে পারবেন? না। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী একই সাথে একাধিক চাকরি বা আর্থিক লাভজনক পদে (সাংবাদিকতা ও আইন পেশাসহ) নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। প্রমাণিত হলে এমপিও বাতিল হতে পারে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর অবসরের বয়সসীমা কত? ৬০ বছর। এই বয়স পূর্ণ হওয়ার পর শিক্ষক-কর্মচারীকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর নিতে হয় এবং বেতন-ভাতার সরকারি অংশ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে কত বছর লাগে? প্যাটার্নভুক্ত পদের ৫০% ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন সূচকে ৭০% বা তার বেশি নম্বর পেয়ে ৮ বছরেই পদোন্নতি সম্ভব। বাকি প্রভাষকদের ক্ষেত্রে মোট ১৬ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি হয়।
এমপিও আবেদন কোথায় ও কীভাবে করতে হয়? প্রতিষ্ঠান প্রধান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্ধারিত অনলাইন পদ্ধতিতে আবেদন করেন, যা উপজেলা, জেলা ও অঞ্চল পর্যায়ের কমিটি যাচাই করে অধিদপ্তরে প্রেরণ করে।
নতুন নীতিমালায় কাম্য শিক্ষার্থী সংখ্যার শর্ত কি বদলেছে? হ্যাঁ, প্রতিষ্ঠানের ধরন ও এলাকা (শহর/মফস্বল) অনুযায়ী ন্যূনতম শিক্ষার্থী সংখ্যা পরিশিষ্ট-‘খ’ তে নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে; এটি প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন ভিন্ন।
শিফট খোলার শর্ত কী? একটি শিফট চলমান রাখতে প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। দ্বিতীয় শিফট খুলতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের পূর্বানুমতি লাগবে এবং দিবা ও প্রভাতি শিফটের তথ্য কোনোভাবেই মিশ্রিত করা যাবে না।
এমপিও নীতিমালা ২০২৫-এ কোনো সংশোধনী এসেছে কি? হ্যাঁ, মার্চ ২০২৬-এ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নীতিমালার কয়েকটি অনুচ্ছেদে সংশোধনী জারি করেছে। এমপিও আবেদনের আগে সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ হালনাগাদ কপি যাচাই করে নেওয়া উত্তম।
শেষকথা
এমপিও নীতিমালা ২০২৫ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি কাঠামোবদ্ধ ও স্বচ্ছ করেছে। জমির মালিকানা বাধ্যতামূলক করা, একাধিক চাকরিতে থাকার নিষেধাজ্ঞা এবং নম্বরভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থা—এই তিনটি পরিবর্তন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও শিক্ষকতার পেশাগত উৎকর্ষে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। প্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষক ও কর্মচারীদের উচিত নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো ভালোভাবে বুঝে নেওয়া, যাতে এমপিও আবেদন বা পদোন্নতির সময় কোনো জটিলতায় না পড়তে হয়।
তথ্যসূত্র
- বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ (স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৭৪.০৩০.০০০১.২-৩৩৩, তারিখ ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫)
- shed.gov.bd — মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, Moedu নীতি বিভাগ
- dshe.gov.bd — মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর
- ntrca.gov.bd — বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ
এই নিবন্ধটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মূল প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচনা করে একটি শিক্ষানীতি-বিষয়ক সম্পাদকীয় দল কর্তৃক প্রস্তুত ও যাচাই করা হয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: জুন ২০২৬। নীতিমালা সময়ে সময়ে সংশোধিত হতে পারে বিধায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে সরকারি ওয়েবসাইটের মূল কপি যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।