সরকারি কর্মচারী ও নাগরিকদের জন্য বিধি, অফিস আদেশ, পে-স্কেল, পেনশন ও চাকরিসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য

BD Service Rules

আপনার প্রশ্নের উত্তর খুঁজুন, সহজভাবে

চাকরির বিধি, বেতন-ভাতা, পে-ফিক্সেশন ও সরকারি সেবার প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজুন।

কওমি, আলিয়া ও মহিলা মাদ্রাসার ক্লাসের নাম, বিভাগ ও সিলেবাস

আপনার সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর কথা ভাবছেন? নাকি বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী? আমাদের দেশে মূলত দুই ধারার মাদ্রাসা প্রচলিত—কওমি এবং আলিয়া। এই দুই ধারার শিক্ষাক্রম, স্তর এবং ক্লাসের নামগুলো সাধারণ স্কুল-কলেজের চেয়ে বেশ আলাদা। বিশেষ করে কওমি ও মহিলা মাদ্রাসার জামাতের নামগুলো নিয়ে অভিভাবকরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়েন।

এই আর্টিকেলে আমরা কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ, মহিলা মাদ্রাসার জামাতের নাম, আলিয়া মাদ্রাসার স্তর, সিলেবাস এবং বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে একটি সম্পূর্ণ ও সঠিক গাইডলাইন তুলে ধরেছি। চলুন, শুরু করা যাক।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আলিয়া মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ সাধারণ শিক্ষার মতোই বিন্যস্ত: ইবতেদায়ী (প্রাথমিক), দাখিল (মাধ্যমিক/এসএসসি), আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক/এইচএসসি), ফাজিল (স্নাতক) এবং কামিল (স্নাতকোত্তর)। অন্যদিকে, কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ মূলত পঠিত কিতাবের (বই) নাম অনুসারে ‘জামাত’ হিসেবে পরিচিত। এর প্রধান স্তরগুলো হলো: ইবতেদাইয়্যাহ, মুতাওয়াসসিতাহ, সানাবিয়্যাহ, ফজিলাত এবং দাওরায়ে হাদিস বা তাকমিল (মাস্টার্স সমমান)। পাশাপাশি, মহিলা মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ প্রায় একই হলেও মেয়েদের জন্য কোর্সটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত ও ফিকহ (মাসয়ালা) ভিত্তিক করা হয়।

কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ (স্তর ও সমমান)

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিজস্ব বোর্ড (যেমন: বেফাক) দ্বারা পরিচালিত হয়। কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার স্তরকে ‘মারহালা’ এবং ক্লাসকে ‘জামাত’ বলা হয়। সাধারণ শিক্ষার সাথে তুলনা করে নিচে কওমি মাদ্রাসার স্তর ও ক্লাসের তালিকা দেওয়া হলো:

মারহালা (স্তর)সাধারণ শিক্ষার সমমানপ্রচলিত জামাতের নাম (কিতাব বা বইয়ের নাম অনুসারে)
ইবতেদাইয়্যাহপ্রাথমিক (১ম থেকে ৫ম শ্রেণি)মক্তব/নূরানি, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি
মুতাওয়াসসিতাহনিম্ন-মাধ্যমিক (৬ষ্ঠ থেকে ৮ম)জামাতে মিজান, জামাতে নাহবেমির, হেদায়াতুন্নাহু
সানাবিয়্যাহ আম্মাহমাধ্যমিক (এসএসসি সমমান)জামাতে কাফিয়া, শরহে জামী
সানাবিয়্যাহ খাসসাহউচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি সমমান)জামাতে শরহে বেকায়া, মুখতাসারুল মা’আনি
ফজিলাতস্নাতক বা ডিগ্রি সমমানজামাতে জালালাইন, জামাতে মিশকাত
তাকমিলস্নাতকোত্তর (মাস্টার্স সমমান)দাওরায়ে হাদিস (সিহাহ সিত্তাহ বা ৬টি মূল হাদিস গ্রন্থ)

(বিঃদ্রঃ ২০১৮ সালের আইন অনুযায়ী ‘দাওরায়ে হাদিস’-কে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান দেওয়া হয়েছে।)

কওমি মহিলা মাদ্রাসার জামাতের নাম সমূহ

মেয়েদের জন্য প্রতিষ্ঠিত কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সাধারণত ‘মাদরাসাতুল বানাত’ বা মহিলা মাদ্রাসা বলা হয়। ছেলেদের সিলেবাসের সাথে মেয়েদের সিলেবাসের মিল থাকলেও, মেয়েদের জন্য কোর্সটি সাধারণত ৫-৬ বছরে (হিফজ বাদে) শেষ করার জন্য কিছুটা পরিমার্জন করা হয়। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ মেয়েদের ক্ষেত্রে কীভাবে ধাপে ধাপে সাজানো হয়েছে, তা নিচে দেওয়া হলো:

মহিলা মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ (ক্রম অনুযায়ী):

  1. ইবতেদাইয়্যাহ (প্রাথমিক স্তর): আরবি রিডিং, তাজবিদ এবং দৈনন্দিন মাসনুন দোয়া।
  2. জামাতে ইদাদিয়াহ: এটি আরবি ভাষা শেখার প্রাথমিক ও প্রস্তুতিমূলক ক্লাস।
  3. জামাতে নাহবেমির / তাইসীর: আরবি ব্যাকরণ (নাহু ও সরফ) শেখার মূল স্তর।
  4. জামাতে কাফিয়া / শরহে বেকায়া: ফিকহ (ইসলামি আইন) ও উন্নত আরবি ব্যাকরণ। (মহিলা মাদ্রাসায় মেয়েদের বিশেষ মাসয়ালা-মাসায়েল খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়)।
  5. জামাতে জালালাইন: পবিত্র কোরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যার ক্লাস।
  6. জামাতে মিশকাত (ফজিলাত স্তর): হাদিসের প্রাথমিক ও মধ্যম স্তরের কিতাবসমূহ।
  7. দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স স্তর): বোখারী, মুসলিম, তিরমিজি সহ মূল হাদিস গ্রন্থের পাঠ।

আলিয়া মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ

আলিয়া মাদ্রাসা সরকারি ‘বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড’ দ্বারা পরিচালিত। এখানে ইসলামিক বিষয়ের পাশাপাশি সাধারণ স্কুলের বিজ্ঞান, গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তি পড়ানো হয়।

এর স্তর ও ক্লাসগুলো হলো:

  • ইবতেদায়ী: ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি (প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমমান)।
  • জেডিসি (JDC) স্তর: ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি (জুনিয়র স্কুল বা অষ্টম শ্রেণির সমমান)।
  • দাখিল: ৯ম ও ১০ম শ্রেণি (এসএসসি বা মাধ্যমিক সমমান)।
  • আলিম: ১১শ ও ১২শ শ্রেণি (এইচএসসি বা উচ্চ মাধ্যমিক সমমান)।
  • ফাজিল: ৩ বা ৪ বছর মেয়াদি কোর্স (স্নাতক বা অনার্স সমমান)।
  • কামিল: ১ বা ২ বছর মেয়াদি কোর্স (স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স সমমান)।

কওমি মাদ্রাসার বিভাগসমূহ

একটি পূর্ণাঙ্গ কওমি মাদ্রাসায় শুধু ক্লাসভিত্তিক কিতাবই পড়ানো হয় না, বরং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী করে তুলতে আলাদা বিভাগ থাকে। প্রধান কওমি মাদ্রাসার বিভাগসমূহ হলো:

  • নূরানি ও মক্তব বিভাগ: শিশুদের আরবি অক্ষর জ্ঞান ও প্রাথমিক ইসলামি শিক্ষা।
  • হিফজুল কোরআন বিভাগ: পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করার বিশেষায়িত বিভাগ।
  • কিরাত বা নাজেরা বিভাগ: কোরআন সঠিক উচ্চারণে (তাজবিদ) পড়ার প্রশিক্ষণ।
  • কিতাব বিভাগ (দরসে নিজামী): প্রাথমিক থেকে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত মূল কারিকুলাম।
  • ইফতা বিভাগ (দারুল ইফতা): দাওরায়ে হাদিস পাসের পর ফতোয়া গবেষণার উচ্চতর কোর্স (মুফতি হওয়ার কোর্স)।
  • তাফসির ও আদব বিভাগ: যথাক্রমে কোরআনের তাফসির এবং আরবি সাহিত্য নিয়ে উচ্চতর গবেষণার বিভাগ।

কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস (দরসে নিজামী)

ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের শতবর্ষী ‘দরসে নিজামী’ কারিকুলামের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। মোল্লা নিজামুদ্দিন সিহালভি (রহ.) এই যুগান্তকারী সিলেবাস প্রণয়ন করেন।

এই সিলেবাসের মূল লক্ষ্য হলো একজন শিক্ষার্থীকে কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ (ইসলামি আইন), আরবি সাহিত্য, এবং মানতিক (যুক্তিবিদ্যা)-এ গভীরভাবে পারদর্শী করে তোলা। পাশাপাশি ফার্সি ও উর্দু ভাষাও শেখানো হয়। তবে আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বেফাক (BEFAQ) বর্তমানে প্রাথমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক স্তরে বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বাধ্যতামূলক করেছে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর

কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

কওমি মাদ্রাসা মূলত জনগণের দানে পরিচালিত হয় এবং এখানে কোরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। অন্যদিকে, আলিয়া মাদ্রাসা সরকারি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়, যেখানে ইসলামিক শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ স্কুলের বিজ্ঞান ও আইসিটি বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়।

কওমি মহিলা মাদ্রাসায় কি হিফজ পড়ানো হয়?

হ্যাঁ, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি কওমি মহিলা মাদ্রাসায় মেয়েদের কোরআন মুখস্থ করার জন্য আলাদা ‘হিফজুল কোরআন’ বিভাগ রয়েছে।

দাওরায়ে হাদিস পাস করলে কি সরকারি চাকরি করা যায়?

হ্যাঁ। বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী কওমি মাদ্রাসার ‘দাওরায়ে হাদিস’ মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান হওয়ায়, এই সনদ দিয়ে বিসিএস (BCS) সহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়।

আশা করি এই লেখাটি কওমি এবং আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার যাবতীয় প্রশ্নের সহজ সমাধান দিতে পেরেছে।

আপনার কি নির্দিষ্ট কোনো মাদ্রাসার ভর্তি প্রক্রিয়া, অথবা হিফজ বিভাগের বয়সসীমা সম্পর্কে কোনো তথ্য জানার প্রয়োজন আছে? আমাকে জানালে আমি সঠিক তথ্য দিয়ে আপনাকে সাহায্য করতে পারব।

তথ্যসূত্র: বেফাক (BEFAQ), আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।

Leave a Comment