বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬” সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক, টেকসই ও শতভাগ ই-জিপি (e-GP) নির্ভর করার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ । এই আইনের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে রিভার্স অকশন (Reverse Auction) এবং ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট-এর মতো নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে । এছাড়া, যেকোনো সরকারি আইটি (IT) সেবা আন্তর্জাতিকভাবে ক্রয়ের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে জয়েন্ট ভেঞ্চার হিসেবে যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । আইনটি ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে ।
বাংলাদেশ সরকারের যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজ বা সেবা ক্রয়ের প্রধান ভিত্তি হলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এবং সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সম্প্রতি “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬” পাস হয়েছে, যা ১০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে ।
একজন ঠিকাদার, সরবরাহকারী কিংবা সাধারণ সচেতন নাগরিক হিসেবে এই নতুন সংশোধনীগুলো আপনার জানা থাকা জরুরি। চলুন, এই আইনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলো কী কী জেনে নেই।
আইনের মূল উদ্দেশ্য ও দর্শনে পরিবর্তন
আগে এই আইনের মূল ফোকাস ছিল শুধুমাত্র “স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা” । কিন্তু ২০২৬ সালের সংশোধনীতে এর পরিধি আরও বাড়িয়ে “স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অর্থের সর্বোত্তম মূল্য, দক্ষতা, নৈতিকতা, গুণগতমান ও টেকসই ক্রয়” শব্দগুলো যুক্ত করা হয়েছে । অর্থাৎ, এখন শুধু কম দামে কাজ পেলেই হবে না, কাজের গুণগত মান এবং পরিবেশগত টেকসইতার দিকেও সরকার কড়া নজর দেবে ।
নতুন আইনে যুক্ত হওয়া যুগান্তকারী ফিচারসমূহ
- টেকসই সরকারি ক্রয় (Sustainable Public Procurement): এই প্রথম আইনে “টেকসই সরকারি ক্রয়” ধারণাটি যুক্ত করা হয়েছে । এর অর্থ হলো, এখন থেকে যেকোনো ক্রয়ের ক্ষেত্রে সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, পণ্যের মান, পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক অগ্রগতি এবং শিশু শ্রম নিষিদ্ধকরণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে ।
- রিভার্স অকশন বা বিপরীত নিলাম: সরকারি কেনাকাটায় খরচ কমানোর জন্য এই নতুন পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকরী হবে । এই পদ্ধতিতে, সম্ভাব্য সরবরাহকারীরা রিয়েল টাইমে (real time) ক্রমান্বয়ে কম দামে দরপত্র জমা দিয়ে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করবেন ।
- ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট (Framework Agreement): যেসব পণ্য বা সেবা সরকারের নিয়মিত বা বারবার প্রয়োজন হয়, সেগুলোর জন্য বারবার টেন্ডার না ডেকে এক বা একাধিক ঠিকাদারের সাথে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি করা যাবে । এতে সময় ও অর্থ উভয়েরই সাশ্রয় হবে।
- দেশীয় আইটি খাতের জন্য বড় সুখবর: সরকারের নিজস্ব অর্থে তথ্যপ্রযুক্তিগত (IT) সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে যদি আন্তর্জাতিকভাবে দরপত্র আহ্বান করতেই হয়, তবে সেখানে দেশীয় কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে যৌথ উদ্যোগের (joint venture) অংশীদার হিসেবে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । এটি দেশের আইটি কোম্পানিগুলোর জন্য এক বিশাল সুযোগ।
শতভাগ ই-জিপি (e-GP) নির্ভরতা
দরপত্র প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের অনিয়ম বন্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
- আইনের ৬৫ ধারার সংশোধনী অনুযায়ী, ই-জিপি পোর্টালে প্রক্রিয়াযোগ্য সকল সরকারি ক্রয় ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতেই সম্পন্ন করতে হবে ।
- অধিকন্তু, সরকারের সকল ক্রয় পরিকল্পনা আবশ্যিকভাবে ই-জিপি পোর্টালে প্রকাশ করতে হবে ।
- যদি কোনো বিশেষ কারণে কোনো ক্রয়কারী ই-জিপি ব্যবহারে অসমর্থ হন, তবে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর পূর্বানুমোদন নিতে হবে ।
বিদেশি মিশন ও দূতাবাসের জন্য বিশেষ নিয়ম
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস বা মিশনগুলোতে কেনাকাটার ক্ষেত্রে এতদিন নানা জটিলতা ছিল। নতুন আইনে বলা হয়েছে, ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে তারা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ক্রয় বিধি বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্থার বিধি অনুসরণ করতে পারবে । তবে এর জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির পূর্বানুমোদন নিতে হবে ।
সাধারন জিজ্ঞাসা
২. রিভার্স অকশন (Reverse Auction) কী?
এটি দরপত্র আহ্বানের এমন একটি সংগ্রহ পদ্ধতি, যেখানে সম্ভাব্য সরবরাহকারীরা একটি নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার জন্য প্রকৃত সময়ে (real time) ক্রমান্বয়ে কম দাম উল্লেখ করে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করেন ।
৩. টেকসই সরকারি ক্রয় বলতে কী বোঝায়?
টেকসই সরকারি ক্রয় হলো এমন একটি কৌশল যা পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক অগ্রগতি, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শিশু শ্রম নিষিদ্ধকরণের বিষয়গুলোকে একত্রিত করে ।
৪. অফলাইনে কি আর টেন্ডার জমা দেওয়া যাবে?
না। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, ই-জিপি পোর্টালে প্রক্রিয়াযোগ্য সকল সরকারি ক্রয় বাধ্যতামূলকভাবে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতেই সম্পন্ন করতে হবে ।
সর্বশেষ আপডেট: এপ্রিল ২০২৬ তথ্যের সূত্র: বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ১০ এপ্রিল ২০২৬

আমি একজন অডিটর। আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি বিধিবিধান, বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ৫ বছর ধরে লেখালেখি করছি। সরকারি চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে সব সময় স্টাডি করে থাকি। সরকারি সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র প্রায়শই পড়া হয়। তাই নিজের প্রাকটিক্যাল জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করি।