শবে কদর ২০২৬ কত তারিখে?

বাংলাদেশে শবে কদর ২০২৬ পালিত হবে ১৬ মার্চ, সোমবার দিবাগত রাতে। এটি ১৪৪৭ হিজরি সনের ২৭শে রমজানের রাত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। ধর্মীয়ভাবে সত্যিকারের ফজিলত পেতে রমজানের শেষ ১০ রাত ইবাদতে কাটাতে হবে।

মূল তথ্য এক নজরে:

  • শবে কদর ২০২৬ তারিখ: ১৬ মার্চ, সোমবার দিবাগত রাত
  • হিজরি তারিখ: ২৭শে রমজান ১৪৪৭
  • রমজান শুরু হয়েছে: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)
  • ঘোষণাকারী সংস্থা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

শবে কদর কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

শবে কদর আরবিতে “লাইলাতুল কদর” নামে পরিচিত। এর অর্থ “মর্যাদার রাত” বা “ভাগ্য নির্ধারণের রাত”। ইসলামে এই রাতটিকে বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সুরা কদর (৯৭ নম্বর সুরা)-তে এই রাত সম্পর্কে বলেছেন যে, এই রাতটি এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতেই হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর প্রথমবার পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছিল। ফেরেশতারা এবং জিবরাইল (আ.) এই রাতে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং ফজর পর্যন্ত শান্তি বিরাজ করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় শবে কদরে ইবাদত করল, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি: ২০১৪)

২০২৬ সালে বাংলাদেশে শবে কদর কবে?

কীভাবে তারিখ নির্ধারিত হলো?

বাংলাদেশে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দেশের বিভিন্ন স্থানে রমজান মাসের চাঁদ দেখা যায়। বায়তুল মুকাররম সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) থেকে রমজান মাস শুরু হবে। সেই হিসাবে ২৭শে রমজান পড়েছে ১৬ মার্চ, সোমবার। বাংলাদেশে প্রতিবছর ২৭শে রমজানের রাতকে (অর্থাৎ ২৬ রমজান দিবাগত রাত) শবে কদর হিসেবে পালন করা হয়।

২০২৬ সালে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো

ইসলামিক দিবসবাংলাদেশ তারিখদিন
রমজান শুরু (১ম রোজা)১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬বৃহস্পতিবার
শবে কদর (২৭শে রমজান)১৬ মার্চ ২০২৬ দিবাগত রাতসোমবার
জুমাতুল বিদা১৩ মার্চ ২০২৬শুক্রবার
ঈদুল ফিতর (সম্ভাব্য)২১ মার্চ ২০২৬শনিবার

শবে কদর কি শুধু একটি রাত, নাকি একাধিক রাতে হতে পারে?

এটি অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। সহিহ হাদিস অনুযায়ী, শবে কদর রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে খোঁজ করতে বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর সন্ধান করো।” (সহিহ মুসলিম)

এই রাতগুলো হলো — ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯শে রমজান।

২০২৬ সালে শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলো

  • ২১শে রমজান: ১০ মার্চ দিবাগত রাত (মঙ্গলবার)
  • ২৩শে রমজান: ১২ মার্চ দিবাগত রাত (বৃহস্পতিবার)
  • ২৫শে রমজান: ১৪ মার্চ দিবাগত রাত (শনিবার)
  • ২৭শে রমজান: ১৬ মার্চ দিবাগত রাত (সোমবার) — বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক শবে কদর
  • ২৯শে রমজান: ১৮ মার্চ দিবাগত রাত (বুধবার)

অনেক আলেম বলেন, শুধু ২৭শে রমজানের রাতে নির্ভর না করে পুরো শেষ দশকেই বেশি বেশি ইবাদত করা উচিত।

শবে কদরের রাতে কী কী আমল করবেন?

শবে কদরের রাতে বিশেষ কিছু ইবাদত করার সুযোগ রয়েছে। নিচে ধাপে ধাপে আমলের তালিকা দেওয়া হলো:

১. বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া এ রাতে তারাবির নামাজ ছাড়াও অতিরিক্ত নফল নামাজ আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। দুই রাকাত করে যতটুকু সম্ভব পড়া উচিত।

২. কুরআন তিলাওয়াত করা এ রাতে কুরআন নাজিল হয়েছিল, তাই কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে রাত অতিবাহিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. বিশেষ দোয়া পড়া হজরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শবে কদরে কী দোয়া পড়ব? তিনি বললেন, পড়ো:

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি। অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা পছন্দ করো, আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিজি: ৩৫১৩)

৪. জিকির ও ইস্তিগফার করা “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” ও “আস্তাগফিরুল্লাহ” বারবার পড়তে থাকা।

৫. ইতিকাফ করা যারা সম্ভব হলে মসজিদে শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতে পারেন — এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।

৬. দোয়া ও মুনাজাত নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, মুসলিম উম্মাহর জন্য বিশেষভাবে দোয়া করা।

শবে কদরের ফজিলত

কুরআনের দলিল

আল্লাহ তাআলা সুরা কদরে বলেছেন:

  • এই রাতটি এক হাজার মাস (৮৩ বছরের বেশি) থেকেও উত্তম।
  • এ রাতে ফেরেশতারা ও রুহ (জিবরাইল আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করেন।
  • ফজর পর্যন্ত এই রাতে শান্তি ও কল্যাণ বিরাজ করে।

হাদিসের দলিল

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে প্রকৃতপক্ষে সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত। একমাত্র দুর্ভাগাই এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়।” (ইবনে মাজাহ: ১৬৪৪)

শবে কদরের রাতে কী কী এড়িয়ে চলবেন?

এ রাতটি ইবাদতের রাত। তাই কিছু বিষয় এড়িয়ে চলা জরুরি:

  • অহেতুক আড্ডা ও সময় নষ্ট না করা
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় না দেওয়া
  • ইবাদতে অমনোযোগী না হওয়া
  • ঘুমিয়ে পুরো রাত কাটিয়ে না দেওয়া

শবে কদর ও ইতিকাফ

রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশ দিন সবসময় ইতিকাফ করতেন, মূলত শবে কদর তালাশের উদ্দেশ্যে। ইতিকাফের সময় মসজিদে অবস্থান করে একাগ্রচিত্তে ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া যায়।

বাংলাদেশে যারা ইতিকাফ করতে চান, তাদের জন্য ২০২৬ সালে শেষ দশক শুরু হয়েছে ১১ মার্চ থেকে।

শবে কদরের প্রস্তুতি কীভাবে নেবেন?

অনেকে শুধু শবে কদরের রাতে জেগে থাকার চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রস্তুতি আরও আগে থেকে শুরু হওয়া উচিত।

এক সপ্তাহ আগে থেকে:

  • ঘুমের রুটিন ঠিক করা, যাতে রাতে জেগে ইবাদত করতে পারেন
  • কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস বাড়ানো
  • মনকে ইবাদতমুখী করতে অহেতুক বিনোদন কমানো

শেষ দশকের শুরু থেকে:

  • প্রতি রাতেই অন্তত কিছু সময় নফল নামাজ ও দোয়ায় কাটানো
  • পরিবারের সদস্যদেরও উৎসাহিত করা
  • শবে কদরের বিশেষ দোয়া মুখস্থ রাখা

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহ

শবে কদর ২০২৬ কত তারিখে বাংলাদেশে?

বাংলাদেশে ২০২৬ সালে শবে কদর পালিত হবে ১৬ মার্চ, সোমবার দিবাগত রাতে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই তারিখ ঘোষণা করেছে।

লাইলাতুল কদর ২০২৬ কোন রমজানের রাতে?

লাইলাতুল কদর ২০২৬ সালে ২৭শে রমজানের রাতে পালিত হবে, যা ইংরেজি ক্যালেন্ডারে ১৬ মার্চ ২০২৬।

শবে কদর কি শুধু ২৭শে রমজানে?

না, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী শবে কদর রমজানের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতে হতে পারে। তবে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৭শে রমজানের রাতে পালন করা হয়।

শবে কদরের রাতে কোন দোয়া পড়তে হয়?

শবে কদরের বিশেষ দোয়া হলো — “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।” হজরত আয়েশা (রা.) এই দোয়াটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে শিখেছিলেন।

শবে কদরের রাতে নামাজ কত রাকাত পড়তে হয়?

শবে কদরের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রাকাত সংখ্যা নেই। যত বেশি সম্ভব নফল নামাজ পড়া উচিত — দুই রাকাত করে নিয়ত করে যতটুকু সাধ্যে কুলায়।

শবে কদরে কি রোজা রাখতে হয়?

না, শবে কদরের দিনে আলাদা রোজার বিধান নেই। তবে রমজানে রোজা চলমান থাকে।

শবে কদরের রাত কীভাবে চেনা যায়?

কিছু হাদিসে বলা হয়েছে, শবে কদরের পরের দিন সূর্য উদয় হয় তেজহীনভাবে কিরণ ছাড়াই। তবে এই রাত নিশ্চিতভাবে চেনার কোনো উপায় জানানো হয়নি, কারণ আল্লাহ এই রহস্য গোপন রেখেছেন, যাতে মানুষ বেশি বেশি ইবাদত করে।

২০২৬ সালে ঈদুল ফিতর কত তারিখে?

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ঈদুল ফিতর সম্ভবত ২১ মার্চ (শনিবার) পালিত হবে, তবে এটি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল।

শেষ কথা

শবে কদর ইসলামের এক অপার্থিব অনুগ্রহ। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে এই মহিমান্বিত রাতটি পালিত হচ্ছে ১৬ মার্চ, সোমবার দিবাগত রাতে। কিন্তু শুধু ওই এক রাতের অপেক্ষায় না থেকে রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি বেজোড় রাতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এই রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে, ইবাদতে মশগুল থাকলে এবং আন্তরিকভাবে দোয়া করলে — হাজার মাসের সমপরিমাণ সওয়াব অর্জনের সুযোগ মেলে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শবে কদরের ফজিলত নসিব করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  • ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (islamicfoundation.gov.bd)
  • বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) — ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ
  • জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি বাংলাদেশ

Leave a Comment